রিজিক বৃদ্ধিতে কুরআন-হাদিসের ১০ আমল © সংগৃহীত
বর্তমান যান্ত্রিক ও প্রতিযোগিতাপূর্ণ সময়ে চাকরি না পাওয়া, ঋণের ভারী বোঝা, ব্যবসায় মন্দা কিংবা সংসারে টানাটানি যেন মানুষের নিত্যদিনের সঙ্গী। এই কঠিন বাস্তবতায় অনেকেই দিশাহারা হয়ে পড়েন। তবে ইসলাম শুধু ধৈর্য ধারণের শিক্ষাই দেয় না, বরং কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে নির্দিষ্ট কিছু দোয়া, জিকির ও আমলের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য চাওয়ার পথও বাতলে দেয়। মানুষের সব চেষ্টা যখন ব্যর্থ মনে হয়, তখনো আল্লাহর রহমতের দরজা বন্ধ হয় না। সংকটময় মুহূর্তে মুমিনের মনে আশা ও শক্তি জোগাতে পারে এমন ১০টি গুরুত্বপূর্ণ আমল ও দোয়া করা যেহে পারে।
১. চাকরি ও রিজিকের জন্য তাকওয়া বা আল্লাহভীতি
জীবিকার সন্ধান কিংবা চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে তাকওয়া বা আল্লাহভীতিকে অন্যতম মাধ্যম হিসেবে বলা হয়েছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা সূরা আত-তাকালের ২ ও ৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন, যে ব্যক্তি আমাকে ভয় করে, আমি তার জন্য সব সংকট থেকে উত্তরণের পথ সহজ করে দিই এবং এমন উৎস থেকে রিজিক দান করি যা সে কল্পনাই করতে পারেনি।
২. ঋণমুক্তির বিশেষ নববী দোয়া
ঋণের চাপে জর্জরিত ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ব্যক্তিদের জন্য প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) হযরত আলী (রা.)-কে একটি বিশেষ দোয়া শিখিয়েছিলেন। দোয়াটি হলো: উচ্চারণ: আল্লাহুম্মাকফিনী বিহালালিকা ‘আন হারামিকা, ওয়া আগনিনী বিফাদলিকা ‘আম্মান সিওয়াক।
অর্থ: ‘হে আল্লাহ! আপনার হালাল দ্বারা আমাকে হারাম থেকে রক্ষা করুন এবং আপনার অনুগ্রহের মাধ্যমে আমাকে আপনি ছাড়া অন্য সবার মুখাপেক্ষিতা থেকে মুক্ত করুন।’ (জামে আত-তিরমিযি, হাদিস নং ৩৫৬৩)
৩. জীবিকা ও ব্যবসায় বরকত লাভের দোয়া
ব্যবসা-বাণিজ্য কিংবা দৈনন্দিন উপার্জনে বরকত কামনায় নিয়মিত এই দোয়াটি পাঠ করা যেতে পারে:
উচ্চারণ: ওয়া বারিক লী ফীমা আ‘তাইত।
অর্থ: 'আপনি আমাকে যা দান করেছেন, তাতে বরকত দিন।'
(উল্লেখ্য, দোয়া কবুল হওয়া নিয়ে হতাশ না হয়ে মুমিনের উচিত পূর্ণ আস্থা রাখা। কারণ পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সূরা আল-বাকারার ১৮৬ নম্বর আয়াতে ঘোষণা করেছেন—বান্দা যখনই তাঁকে ডাকে, তিনি তা শোনেন এবং সাড়া দেন। এই সাড়া কখনো তাৎক্ষণিক মেলে, কখনো বিলম্বে আসে কিংবা এর বিনিময়ে আরও উত্তম কিছু দান করা হয়।)
৪. ফজরের সালাত পরবর্তী বিশেষ প্রার্থনা
রাসূলুল্লাহ (সা.) ফজরের সালাত সমাপ্ত করে নিয়মিত একটি চমৎকার দোয়া পাঠ করতেন। উম্মে সালামা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে, নবীজি বলতেন:
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নী আসআলুকা ‘ইলমান নাফি‘আ, ওয়া রিযকান তায়্যিবা, ওয়া ‘আমালান মুতাকাব্বালা।
অর্থ: 'হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে উপকারী জ্ঞান, পবিত্র রিজিক এবং কবুলযোগ্য আমল প্রার্থনা করছি।' (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস নং ৯২৫)
৫. অভাব ও অসহায়ত্বে হযরত যাকারিয়া (আ.)-এর দোয়া
কঠিন বিপদ বা চরম অসহায়ত্বের মুহূর্তে পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হযরত যাকারিয়া (আ.)-এর এই দোয়াটি অত্যন্ত কার্যকরী:
উচ্চারণ: রব্বি লা তাযারনী ফারদান, ওয়া আনতা খাইরুল ওয়ারিসীন।
অর্থ: 'হে আমার প্রতিপালক! আমাকে একা ছেড়ে দেবেন না; আপনিই সর্বোত্তম উত্তরাধিকারী।' (সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত ৮৯)
৬. তাহাজ্জুদ ও সর্বাবস্থায় কল্যাণের দোয়া
দুনিয়া ও আখিরাতের সার্বিক কল্যাণ কামনায় রাসূলুল্লাহ (সা.) এই দোয়াটি সবচেয়ে বেশি পাঠ করতেন।
উচ্চারণ: রব্বানা আতিনা ফিদ্দুনইয়া হাসানাতান, ওয়া ফিল আখিরাতি হাসানাতান, ওয়া কিনা ‘আযাবান্নার।
অর্থ: 'হে আমাদের রব! আমাদের দুনিয়ায় কল্যাণ দান করুন, আখিরাতেও কল্যাণ দান করুন এবং আমাদের জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করুন।'
৭. রিজিক বৃদ্ধির চাবিকাঠি: ইস্তিগফার
বেশি বেশি ক্ষমা প্রার্থনা বা ইস্তিগফারের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা রিজিক বাড়িয়ে দেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন, তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কাছে ক্ষমা চাও, কারণ তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের ওপর অঝোরে বৃষ্টি বর্ষণ করবেন এবং ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দিয়ে সাহায্য করবেন। (সূরা নূহ, আয়াত ১০-১২) তাই সংকট কাটাতে নিয়মিত 'আস্তাগফিরুল্লাহ' পাঠ করা উচিত।
৮. প্রতিটি কষ্টের সাথেই স্বস্তির সুসংবাদ
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন নিশ্চয়ই কষ্টের সাথেই রয়েছে স্বস্তি। (সূরা আল-ইনশিরাহ, আয়াত ৬)
ইসলামী চিন্তাবিদদের মতে, এই আয়াত মুমিনকে চরম হতাশা থেকে বাঁচায়। লক্ষ্য করার বিষয় হলো, আল্লাহ বলেননি যে কষ্টের পরে স্বস্তি আসবে; বরং বলেছেন কষ্টের সাথেই স্বস্তি রয়েছে। অর্থাৎ প্রতিটি সমস্যার গর্ভেই সমাধানের পথ লুকিয়ে থাকে। তাছাড়া ব্যাকরণগত দিক থেকেও এই আয়াতে গভীর সান্ত্বনা রয়েছে একটি নির্দিষ্ট কষ্টের বিপরীতে আল্লাহ দুটি স্বস্তি বা রহমত দান করেন।
৯. দুশ্চিন্তা ও মানসিক অস্থিরতা থেকে মুক্তির দোয়া
অহেতুক উদ্বেগ, দুশ্চিন্তা কিংবা মানসিক চাপ থেকে সুরক্ষা পেতে প্রিয় নবী (সা.) প্রায়ই মহান আল্লাহর দরবারে এই প্রার্থনা করতেন:
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নী আ‘উযু বিকা মিনাল হাম্মি ওয়াল হাজান।
অর্থ: 'হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে উদ্বেগ ও দুঃখ থেকে আশ্রয় চাই।' (সহিহ বুখারি)
১০. চিরতরে অভাব দূর করতে সূরা ওয়াকিয়াহ পাঠ
দারিদ্র্য ও অভাব-অনটন থেকে নিরাপদ থাকতে প্রতি রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে নিয়মিত একবার সূরা ওয়াকিয়াহ তিলাওয়াত করার বিশেষ ফজিলত রয়েছে। বিশিষ্ট সাহাবি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন যে ব্যক্তি প্রতি রাতে সূরা ওয়াকিয়াহ তিলাওয়াত করবে, তাকে কখনো দারিদ্র্য স্পর্শ করবে না।
ইসলাম কখনো মানুষকে হাত গুটিয়ে বসে থাকার বা কর্মবিমুখ হওয়ার শিক্ষা দেয় না। বরং সঠিক পরিকল্পনা, কঠোর পরিশ্রম, হালাল উপার্জনের ঐকান্তিক চেষ্টা এবং শেষ পর্যন্ত আল্লাহর ওপর পরিপূর্ণ ভরসা বা তাওয়াক্কুলের সমন্বয়ে জীবন পরিচালনা করতে নির্দেশ দেয়। চাকরি, ঋণ বা জীবনের যেকোনো জটিল সংকটে একজন মুমিন ধৈর্য ও বিশ্বাসের সাথে এই পথগুলো অনুসরণ করেই সফলকাম হতে পারে।