পদ্মা ব্যারাজ কী, এটি কোথায় নির্মাণ করা হবে?

১৪ মে ২০২৬, ১১:০১ AM
নদীতে ব্যারাজ

নদীতে ব্যারাজ © সংগৃহীত

বাংলাদেশে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে পদ্মা নদীর ওপর নতুন একটি ব্যারাজ নির্মাণ করতে যাচ্ছে সরকার। ‘পদ্মা ব্যারাজ’ নামের এই মেগা প্রকল্প আগামী সাত বছরে নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মৃতপ্রায় পাঁচটি নদী পুনর্জীবিত করার পাশাপাশি ২৪টি জেলার পানিসংকট নিরসনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার।

বুধবার (১৩ মে) রাজধানীর সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটির অনুমোদন দেওয়া হয়।

প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে প্রায় সাত কোটি মানুষ উপকৃত হবে বলে জানিয়েছেন পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি। তিনি বলেন, ফারাক্কা বাঁধের কারণে শুষ্ক মৌসুমে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ব্যাপক খরা পরিস্থিতি তৈরি হয় এবং পদ্মার সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন নদী শুকিয়ে যায়। এতে নদীতীরবর্তী এলাকায় লবণাক্ততা বাড়ছে। আবার বর্ষাকালে কোথাও কোথাও জলাবদ্ধতাও তৈরি হচ্ছে।

একনেক সভা শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে পানিসম্পদমন্ত্রী বলেন, ‘সবদিক বিবেচনায় এই প্রকল্পটিকে আমরা মাস্টারমাইন্ড প্রকল্প বলছি। এটি আমাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ও ইশতেহারের অংশ ছিল। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান নির্বাচনের আগেই রাজশাহীতে গিয়ে জনগণের সামনে এ বিষয়ে অঙ্গীকার করেছিলেন। সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের জন্যই প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদিত হয়েছে।’

সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী অর্থবছরেই প্রকল্পের প্রথম ধাপের কাজ শুরু হবে। ২০৩৩ সালের মধ্যে ব্যারাজ নির্মাণ শেষ করার পাশাপাশি ওই অঞ্চলে তিনটি পানি বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং সাতটি স্যাটেলাইট শহর গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে।

ব্যারাজ হচ্ছে নদী বা জলাধারের ওপর আড়াআড়িভাবে নির্মিত এমন একটি অবকাঠামো, যার মাধ্যমে পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা হয়। ড্যাম বা বাঁধের মতো পানির প্রবাহ পুরোপুরি বন্ধ না করে ব্যারাজের মাধ্যমে পানি নিয়ন্ত্রিতভাবে প্রবাহিত হতে দেওয়া হয়। এতে একাধিক গেট বা দরজা থাকে, যেগুলোর মাধ্যমে পানির গতি ও বণ্টন নিয়ন্ত্রণ করা হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাধারণত ব্যারাজ নির্মাণের আগে উজানে কৃত্রিম খাল খনন করা হয় এবং ব্যারাজের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত পানি সেই খালে প্রবাহিত করে কৃষি জমিতে সেচ দেওয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে এক নদীর পানি অন্য নদীতে সরবরাহের মাধ্যমেও নদীর প্রবাহ সচল রাখা হয়। পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পেও মূলত সেটিই করা হবে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. আনিসুল হক বলেন, যথাযথ পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় স্থানে ব্যারাজ নির্মাণ করা গেলে এর মাধ্যমে বহু ধরনের সুবিধা পাওয়া সম্ভব। তবে সঠিকভাবে ব্যবহার নিশ্চিত করা না গেলে অর্থ অপচয়ের পাশাপাশি নদীরও ক্ষতি হতে পারে।

বাংলাদেশে এর আগে ১৯৮৩ সালে মৌলভীবাজারে মনু নদীর ওপর প্রথম ব্যারাজ নির্মাণ করা হয়। পরে ১৯৯০ সালে লালমনিরহাটে তিস্তা ব্যারাজ এবং ঠাকুরগাঁওয়ে টাঙ্গন ব্যারাজ নির্মিত হয়।

আরও পড়ুন: সন্তান জন্মদানে নরমাল ডেলিভারির সম্ভাবনা বাড়াতে বিশেষজ্ঞ পরামর্শ ও জরুরি প্রস্তুতি

পদ্মা নদীতে ব্যারাজ নির্মাণের বিষয়টি নতুন নয়। গত শতাব্দীর ষাটের দশক থেকে এ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে সমীক্ষা হয়েছে। বিএনপি সরকারের সময় ২০০৫ সালে প্রকল্পটির বিস্তারিত সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ শুরু হয়। পরে ২০০৯ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত স্থানীয় ও বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত একটি দল সম্ভাব্যতা যাচাই শেষে প্রতিবেদন জমা দেয়। ২০১৬ সাল পর্যন্ত পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রকল্পটির নকশা প্রণয়নের কাজ করে।

বিশেষজ্ঞদের প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারতের ফারাক্কা ব্যারাজের কারণে উজানে পানি প্রত্যাহার বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশে শুষ্ক মৌসুমে পানিপ্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এতে নদীগুলো শুকিয়ে যাওয়ায় কৃষি, মৎস্য, নৌ চলাচল ও জীববৈচিত্র্য ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে।

পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ করা হবে রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলায়। প্রায় ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ এ ব্যারাজে ৭৮টি স্পিলওয়ে, ১৮টি আন্ডার স্লুইস এবং দুটি ফিশ পাস থাকবে। ব্যারাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশনের জন্য স্পিলওয়ে এবং পলি ব্যবস্থাপনার জন্য আন্ডার স্লুইস নির্মাণ করা হবে।

সরকার আশা করছে, এই ব্যারাজের মাধ্যমে প্রায় ২৯০ কোটি ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে। সেই পানি বণ্টনের জন্য তিনটি অফটেক অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে।

প্রকল্পের প্রথম ধাপে গড়াই-মধুমতী নদীতে ১৩৫ দশমিক ৬ কিলোমিটার এবং হিসনা নদীতে ২৪৬ দশমিক ৪৬ কিলোমিটার পুনঃখনন ও ড্রেজিং কাজ করা হবে। দ্বিতীয় ধাপে চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতী নদী পুনরুদ্ধারের কাজ করা হবে।

সরকারের তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মাধ্যমে গড়াই-মধুমতি, হিসনা-মাথাভাঙ্গা, চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতী নদীর প্রবাহ পুনরুজ্জীবিত হবে। শুষ্ক মৌসুমে এসব নদীতে প্রায় ৮০০ কিউসেক পানি সরবরাহ করা সম্ভব হবে।

এ পানি ব্যবহার করে যশোর, খুলনা, কুষ্টিয়া, মাগুরা, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, নড়াইল, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, রাজবাড়ী, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, পাবনা, রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও পিরোজপুর অঞ্চলের প্রায় ২৯ লাখ হেক্টর কৃষিজমিতে সেচ দেওয়া যাবে বলে প্রকল্প নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

সরকারি কর্মকর্তারা দাবি করছেন, এতে বছরে অতিরিক্ত প্রায় ২৪ লাখ টন ধান এবং সোয়া দুই লাখ টন মাছ উৎপাদন সম্ভব হবে। একই সঙ্গে নদীতীরবর্তী এলাকার জীববৈচিত্র্য রক্ষা, লবণাক্ততা হ্রাস, সুন্দরবনের সুরক্ষা এবং মানুষের জীবনমান উন্নয়নেও প্রকল্পটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি বলেন, “বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ও উত্তরাঞ্চলের মানুষ সবচেয়ে বেশি উপকার পাবে। কৃষি, সুন্দরবন ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে এ প্রকল্প বড় অবদান রাখবে।”

এ ছাড়া গঙ্গা-কপোতাক্ষ (জিকে) সেচ প্রকল্প, উত্তর রাজশাহী সেচ প্রকল্প, গোদাগাড়ী পাম্প হাউস এবং রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতেও এ প্রকল্প ভূমিকা রাখবে বলে আশা করছে সরকার।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, পুরো প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বছরে প্রায় আট হাজার কোটি টাকার আর্থ-সামাজিক সুবিধা পাওয়া যাবে।

ইস্ট ওয়েস্ট-ড্যাফোডিলসহ ৪ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলের…
  • ১৪ মে ২০২৬
স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস নিয়োগ দেবে এক্সিকিউটিভ, আবেদন শে…
  • ১৪ মে ২০২৬
শিক্ষক-কর্মচারীদের ঈদ বোনাসের চেক ছাড়ার সময় জানাল মাদ্রাসা …
  • ১৪ মে ২০২৬
সন্ধ্যার মধ্যে দেশের ৭ অঞ্চলে ৬০ কিমি বেগে ঝড়সহ বজ্রবৃষ্টির…
  • ১৪ মে ২০২৬
ঢাবির সিনেট সদস্য হলেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসিসহ ৫ …
  • ১৪ মে ২০২৬
ঈদুল আযহা : যাত্রীদের জরুরি বার্তা দিল বাংলাদেশ রেলওয়ে
  • ১৪ মে ২০২৬