ব্যালন ডি’অর জয়ের দৌড়ে এগিয়ে থাকা ফুটবলাররা © সংগৃহীত
আগামী সোমবার (২৬ অক্টোবর) এবারের ব্যালন ডি’অর বিজয়ীর নাম ঘোষণা করা হবে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ব্যক্তিগত পুরস্কারটি কে জিততে যাচ্ছেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
যদিও হ্যারি কেইন, কিলিয়ান এমবাপ্পে ও লামিনে ইয়ামালকে এই পুরস্কার জয়ের তিনজন সুস্পষ্ট অগ্রগামী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে সাবেক তিন বিজয়ী উসমান দেম্বেলে, রদ্রি ও ৮ বারের ব্যালন ডি’অরজয়ী লিওনেল মেসির নামও আলোচনায় আছে। এর পাশাপাশি মাইকেল ওলিসে ও খভিচা কাভারৎস্খেলিয়াও অপ্রত্যাশিতভাবে সম্ভাবনাময় প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় আছেন।
প্রকৃতপক্ষে, এবারের লড়াইকে এতটা আকর্ষণীয় করে তুলেছে যে কোনো প্রার্থীর পক্ষেই জয়ের শতভাগ নিশ্চিত যুক্তি নেই। প্রতিটি প্রতিদ্বন্দ্বীর পক্ষেই যেমন শক্তিশালী যুক্তি তুলে ধরা যায়, তেমনি প্রত্যেকের বিপক্ষেও যুক্তি দেখানো খুবই সহজ।
উসমান দেম্বেলে
দেম্বেলেকে নিয়ে বড় প্রশ্ন ছিল, একসময় ভীষণ শৃঙ্খলাহীন ও ধারাবাহিকতার অভাবে ভোগা এই খেলোয়াড় ব্যালন ডি’অর জয়ের পরও নিজের দুর্দান্ত ফর্ম ধরে রাখতে পারবেন কিনা! গত মৌসুমের প্রথমার্ধে চোটের সমস্যা কাটিয়ে ওঠার পর বহুমুখী এই ফরোয়ার্ড আবারও প্যারিস সেন্ট জার্মেইয়ের (পিএসজি) টানা দ্বিতীয় চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
প্রতিযোগিতাটির শেষ ৪ ম্যাচে দলের হয়ে ৬টি গোল করেন দেম্বেলে। এরপর সদ্য সমাপ্ত বিশ্বকাপে ফ্রান্সের চতুর্থস্থান অর্জনের পথে নিজের ক্যারিয়ারে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে গোল করেন তিনি। বিশ্বকাপে তার ষষ্ঠ গোল এটি।
ত্বে ২০২৪-২৫ মৌসুমে দেম্বেলে যতটা উজ্জ্বল ছিলেন, এবার ততটা ছিলেন না। ওই মৌসুমে ব্যালন ডি’অর জয়ের দৌড়ে তিনিই ছিলেন স্পষ্ট ফেবারিট। প্রকৃতপক্ষে, কেউ চাইলে যুক্তি দেখাতেই পারেন যে পিএসজির দ্বিতীয় চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়ের পথে তিনি দলের সেরা খেলোয়াড় ছিলেন না। এমনকি বিশ্বকাপেও ফ্রান্সের সবচেয়ে কার্যকর ফরোয়ার্ড ছিলেন না তিনি।
ফলে দেম্বেলেকে ঘিরে এবার আগের মতো উত্তেজনা নেই। যদিও একজন শীর্ষ পর্যায়ের আক্রমণভাগের খেলোয়াড় হিসেবে নিজের সামর্থ্য নিয়ে কোনো সংশয়ের অবকাশ রাখেননি তিনি।
হ্যারি কেইন
২০২৫-২৬ মৌসুমজুড়ে কেইনের চেয়ে বেশি গোল কেউই করেননি। মোট ৭৩টি গোল করেছেন তিনি। তার প্রাণঘাতী ফিনিশিংয়ের সুবাদে ঘরোয়া ট্রেবল জিতেছে বায়ার্ন মিউনিখ। ৩৩ বছর বয়সী এই স্ট্রাইকারের জন্য বেশ উল্লেখযোগ্য অর্জন এটি, বিশেষ করে একসময় শিরোপা জিততে না পারার কারণে যাকে নিয়ে উপহাস করা হতো।
কিন্তু কেইনের ব্যালন ডি’অর জয়ের যুক্তি পুরোপুরি তার দুর্দান্ত গোলসংখ্যার ওপর নির্ভরশীল। কারণ, চ্যাম্পিয়নস লিগ কিংবা বিশ্বকাপ—কোনোটিরই শিরোপা জিততে পারেননি তিনি। আর ফুটবলের শীর্ষস্থানীয় কোনো শিরোপা না জিতে বিশ্বের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া বিরল ঘটনা।
তবে এটাও মনে রাখা দরকার, উত্তর আমেরিকায় ইংল্যান্ডের তৃতীয় স্থান অর্জনের পথে কেইন ৬টি গোল করলেও শেষ ষোলোতে জয়ের পর আর একবারও জালের দেখা পাননি তিনি। এমনকি আর্জেন্টিনার বিপক্ষে বিস্ময়কর সেমিফাইনাল হারেও নিষ্প্রভ ছিলেন তিনি।
খভিচা কাভারৎস্খেলিয়া
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে কাভারৎস্খেলিয়া প্যারিসের পার্ক দে প্রিন্সেসে যোগ দেওয়ার সময় পিএসজির আরেকজন উইঙ্গারের প্রয়োজন আছে বলে মনে হয়নি। কিন্তু তিনি লুইস এনরিকের আক্রমণভাগে সম্পূর্ণ নতুন মাত্রা যোগ করেন এবং প্যারিসের ক্লাবটিকে প্রথমবারের মতো ইউরোপিয়ান কাপ জিততে সাহায্য করেন।
গত মৌসুমে আরও ভালো খেলেছেন জর্জিয়ার এই তারকা। চ্যাম্পিয়নস লিগের নকআউট পর্বে টানা ৭টি ম্যাচে অন্তত একটি করে গোলে সরাসরি অবদান রাখা প্রথম খেলোয়াড় হওয়ার পাশাপাশি যথাযথভাবেই প্রতিযোগিতাটির মৌসুমসেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হন। তার এই পারফরম্যান্সের সুবাদেই পিএসজি নিজেদের মহাদেশীয় শিরোপা ধরে রাখে।
তবে বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পাননি। জর্জিয়া যদি বিশ্বকাপে জায়গা করে নিতে পারত এবং কাভারৎস্খেলিয়া সেখানে ইতিবাচক কোনো প্রভাব ফেলতে পারতেন, তাহলে তার ব্যালন ডি’অর জয় নিয়ে যুক্তি দেখানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ত।
কিলিয়ান এমবাপ্পে
ইয়ামালের মতো এমবাপ্পেও ব্যালন ডি’অর জয়ের সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলতে দ্বিধা করেননি। আর ইয়ামালের মতোই তার পক্ষেও রয়েছে শক্তিশালী যুক্তি।
লা লিগা, চ্যাম্পিয়নস লিগ এবং বিশ্বকাপ—তিনটি প্রতিযোগিতাতেই সবার চেয়ে বেশি গোল করেছেন এমবাপ্পে। যদিও চ্যাম্পিয়নস লিগে কোয়ার্টার ফাইনাল থেকেই বিদায় নিয়েছিল রিয়াল মাদ্রিদ।
এর ওপর উত্তর আমেরিকায় গোল্ডেন বুট জেতার পথে তার দুর্দান্ত পারফরম্যান্স তাকে বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতাও বানিয়েছে। ফলে ব্যালন ডি’অর যদি গোলসংখ্যার ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়, তাহলে এমবাপ্পের গোলগুলোকে কেইনের গোলের চেয়েও বেশি গুরুত্ব দেওয়ার যুক্তি রয়েছে।
ত্বে এমবাপ্পের অবিশ্বাস্য গোল করার হার তার ক্লাব কিংবা জাতীয় দলকে কোনো শিরোপা এনে দিতে পারেনি। এ ছাড়া সমালোচকদের দাবি, এমবাপ্পে চলে যাওয়ার পর পিএসজি আরও ভালো খেলছে এবং তিনি সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে আসার পর রিয়াল মাদ্রিদ আরও খারাপ করেছে।
লিওনেল মেসি
সর্বকালের সেরা খেলোয়াড়ের মানদণ্ডেও গত এক বছরে লিওনেল মেসি যা অর্জন করেছেন, তা অসাধারণ। ৩৯ বছর বয়সে এই আর্জেন্টাইন তারকা ইন্টার মায়ামিকে তাদের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এমএলএস কাপ জিততে অনুপ্রাণিত করেছেন। এরপর একের পর এক নির্ণায়ক পারফরম্যান্সের মাধ্যমে আর্জেন্টিনাকে টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপের ফাইনালে তুলেছেন।
তবে আর্জেন্টিনা যদি বিশ্বকাপ জিতত, তাহলে হয়তো মেসিকে নিয়ে প্রশ্নই উঠত না! মেসিই হতেন নবম ব্যালন ডি’অর জয়ের অপ্রতিদ্বন্দ্বী ফেবারিট।
তবে স্পেনের কাছে লে আলবিসেলেস্তেদের পরাজয়ের ধরন মেসির বিপক্ষে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পাশাপাশি এমএলএসকে অধিকাংশ ভোটার যে নিচু চোখে দেখেন, সেটিও তার জন্য নেতিবাচক হতে পারে।
মাইকেল ওলিসে
বর্তমান ফুটবলে ওলিসের চেয়ে সৃজনশীল আক্রমণাত্মক প্রতিভা আর কেউ নেই, বললেও খুব বেশি বাড়িয়ে বলা হবে না। ২০২৫-২৬ মৌসুমজুড়ে সতীর্থদের দিয়ে অবিশ্বাস্য ৪১টি গোল করিয়েছেন। বিশ্বকাপেও একাই রেকর্ড গড়ে ৭টি অ্যাসিস্ট করেছেন।
এতে অনেকেই মনে করেন, কেইন নন, বরং ওলিসেই বায়ার্ন মিউনিখের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়। আর এ কারণেই এই দুর্দান্ত দক্ষতাসম্পন্ন উইঙ্গার টানা দ্বিতীয় বছরের মতো বায়ার্নের সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হয়েছেন। পাশাপাশি জিতেছেন বুন্দেসলিগার মৌসুমসেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কারও।
কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, ওলিসের অবস্থাও তার ক্লাব সতীর্থ কেইনের মতোই। ব্যক্তিগতভাবে নিঃস্বার্থ ও অসাধারণ পারফরম্যান্স উপহার দিলেও দলীয়ভাবে তিনি এমন কোনো বড় শিরোপা জিততে পারেননি, যা ব্যালন ডি’অরের দৌড়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়।
চ্যাম্পিয়নস লিগের এক মহাকাব্যিক সেমিফাইনালে পিএসজির কাছে হেরে বিদায় নেয় বায়ার্ন। এরপর বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ফ্রান্সও বিদায় নেয়, তাও বেশ নিষ্প্রভ পারফরম্যান্সের মাধ্যমে। তাই ওলিসে ফুটবলের নতুন অ্যাসিস্ট-সম্রাট হলেও তাকে এখনই বিশ্বের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে মুকুট পরানো হবে বলে মনে হয় না।
রদ্রি
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে এসিএল (অ্যান্টেরিয়র ক্রুসিয়েট লিগামেন্ট) ছিঁড়ে যাওয়ার পর আর কখনো রদ্রি নিজের ব্যালন ডি’অরজয়ী সেরা ফর্মে ফিরতে পারবেন কিনা, তা নিয়ে সত্যিকারের উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। বিশেষ করে গত মৌসুমে ম্যানচেস্টার সিটিতেও চোটের কারণে বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছিলেন এই মিডফিল্ডার।
তবে এবারের বিশ্বকাপে অসাধারণ ছিলেন তিনি। লুইস দে লা ফুয়েন্তের স্পেনের হয়ে পুরো খেলা নিয়ন্ত্রণ করেছেন। প্রতিপক্ষদের বলের দখল থেকে বঞ্চিত করে একের পর এক ম্যাচে আধিপত্য বিস্তার করে নিউ জার্সিতে বিশ্বকাপের শিরোপা জেতে স্পেন। এর ফলে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার বা ‘নাম্বার সিক্স’ হিসেবে রদ্রির অবস্থান এখন সুপ্রতিষ্ঠিত।
বিশ্বকাপে রদ্রি হয়তো ছিলেন অপ্রতিরোধ্য। কিন্তু চোটের কারণে ২০২৫-২৬ মৌসুমে নিজের সেরা ফর্মে ছিলেন না তিনি।
এমনকি প্রিমিয়ার লিগ কিংবা চ্যাম্পিয়নস লিগ—কোনোটিরই শিরোপা জিততে পারেনি ম্যানচেস্টার সিটি। এর অন্যতম প্রধান কারণ ছিল রদ্রির অনুপস্থিতি ও তার ফিটনেসের সমস্যা। তাই শুধু স্পেনের হয়ে তার পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে দ্বিতীয়বারের মতো ব্যালন ডি’অর জিতে নেওয়াটা কিছুটা বিস্ময়করই হবে।
লামিনে ইয়ামাল
গত দুই মৌসুমে ইয়ামালের চেয়ে বেশি রোমাঞ্চকর কোনো খেলোয়াড়কে দেখার সুযোগ মেলেনি। অবিশ্বাস্য প্রতিভাবান এই কিশোর গত বছরের ব্যালন ডি’অর ভোটে দ্বিতীয় হয়েছিলেন।
২০২৬ সালে টানা দ্বিতীয়বারের মতো লা লিগার শিরোপা জিতেছেন ইয়ামাল। এরপর স্পেনের বিশ্বকাপ জয়ের ফলে ফুটবল ইতিহাসে সবচেয়ে কম বয়সী খেলোয়াড় হিসেবে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ ও বিশ্বকাপ—দুটিই জয়ের কৃতিত্ব অর্জন করেছেন তিনি।
তবে ইয়ামালের ব্যালন ডি’অর জয়ের দাবির বিপক্ষে আসলে একটিই বড় যুক্তি রয়েছে, আর সেটিই হয়তো তার হাত থেকে পুরস্কারটি কেড়ে নিতে পারে।
সহজভাবে বললে, বিশ্বকাপে ইয়ামাল নিজের অসাধারণ সেরা ফর্মের ধারেকাছেও ছিলেন না। চোটের কারণে তার ক্লাব মৌসুম ব্যাহত হয়েছিল—এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু বিশ্বকাপে অন্য যেকোনো খেলোয়াড়ের চেয়ে বেশি ড্রিবল সম্পন্ন করলেও একটি অ্যাসিস্টও করতে পারেননি। গ্রুপ পর্বে সৌদি আরবের বিপক্ষে করা গোলটিই ছিল পুরো টুর্নামেন্টে তার একমাত্র গোল।