ইংলিশ মিডিয়াম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বেড়েছে শিক্ষার্থী © টিডিসি সম্পাদিত
দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সামগ্রিকভাবে শিক্ষার্থী কমছে, অথচ উল্টো চিত্র ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলগুলোতে। গত পাঁচ বছরে এসব প্রতিষ্ঠানে বেড়েছে ১০ হাজার ৭৬৪ শিক্ষার্থী। বিদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ, ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা এবং ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ারে এগিয়ে থাকার প্রত্যাশা এসব মিলিয়ে এই ধারার শিক্ষার প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। তবে এই প্রবণতা দেশের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার মান ও অভিভাবকদের আস্থা নিয়ে নতুন প্রশ্নও সামনে আনছে।
বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) সর্বশেষ বাংলাদেশ শিক্ষা পরিসংখ্যান ২০২৫ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১ সালে ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ৬৮ হাজার ৮২৫। ২০২২ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৭১ হাজার ৪৫৬ জনে। ২০২৩ সালে শিক্ষার্থী ছিল ৭২ হাজার ৭৩৯, ২০২৪ সালে ৭৬ হাজার ৪২ এবং ২০২৫ সালে ৭৯ হাজার ৫৮৯ জন। অর্থাৎ, ২০২১ সালের পর থেকে টানা চার বছর শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে। পাঁচ বছরে মোট শিক্ষার্থী বেড়েছে ১০ হাজার ৭৬৪ জনে।
এদিকে দেশে মাধ্যমিক থেকে উচ্চশিক্ষা স্তর পর্যন্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা গত এক বছরেই কমেছে ৯ লাখ ৪২ হাজার ৪৭৯ শিক্ষার্থী । ২০২৪ সালে এসব স্তরে শিক্ষার্থী ছিল ১ কোটি ৯৬ লাখ ৭৩ হাজার ৫৯১ জন, যা ২০২৫ সালে কমে দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ৮৭ লাখ ৩১ হাজার ১১২ জনে।
এ সময়ে শুধু মাধ্যমিক বিদ্যালয়েই শিক্ষার্থী কমেছে ৪ লাখ ৮ হাজার ৫০৭ জন। এর বিপরীতে ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলগুলোতে ২০২৪ সালের ৭৬ হাজার ৪২ জন থেকে ২০২৫ সালে শিক্ষার্থী বেড়ে হয়েছে ৭৯ হাজার ৫৮৯ জন। এক বছরে এ বৃদ্ধি ৩ হাজার ৫৪৭ জন। অর্থাৎ, সামগ্রিকভাবে শিক্ষার্থী কমার প্রবণতার মধ্যেও ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থী বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রয়েছে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ৯৮ শতাংশই ঢাকায়:
শিক্ষার্থী বাড়লেও ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার সুযোগ দেশের সর্বত্র সমানভাবে বিস্তৃত নয়। এ ধারার অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই গড়ে উঠেছে বড় শহরকেন্দ্রিক, বিশেষ করে সিটি করপোরেশন এলাকায়। ইংরেজি মাধ্যমের ৯৮ শতাংশের বেশি স্কুল সিটি করপোরেশন এলাকায়।
২০২৫ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২১ সালে এ ধরনের স্কুলের সংখ্যা ছিল ১২৩টি, যা পরবর্তী বছরগুলোতে বেড়েছে। সর্বশেষ ২০২৫ সালে স্কুলের সংখ্যা দাঁড়ায় ১৪৩টিতে। এ ১৪৩টি ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলের মধ্যে ১৪১টি সিটি করপোরেশন এলাকায় অবস্থিত। অর্থাৎ, মোট স্কুলের ৯৮ দশমিক ৬ শতাংশই সিটি করপোরেশন এলাকায়। বাকি দুটি স্কুলের একটি জেলা সদরের পৌরসভা এবং অন্যটি অন্য পৌর এলাকায় অবস্থিত।
উপজেলা সদরের পৌরসভা বা গ্রামীণ এলাকায় ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নেই। স্তরভিত্তিক হিসাবে, ‘এ লেভেল’ পর্যায়ের স্কুল রয়েছে ৮৫টি, ‘ও লেভেল’ পর্যায়ের ৪৬টি এবং জুনিয়র পর্যায়ের স্কুল ১২টি।
ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলগুলোর মধ্যে ১১৮টি ছেলে ও মেয়েদের একসঙ্গে পড়াশোনার ব্যবস্থা রয়েছে। মোট স্কুলের হিসাবে এটি ৮২ দশমিক ৫২ শতাংশ। আরও ২৪টি স্কুলে ছেলে ও মেয়েদের জন্য পৃথক ব্যবস্থা রয়েছে, যা মোট স্কুলের ১৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ। এ ছাড়া একটি স্কুল শুধু ছেলেদের জন্য পরিচালিত হয়। শুধু মেয়েদের জন্য পরিচালিত কোনো স্কুল নেই।
নারী শিক্ষকের সংখ্যা ৭২ শতাংশ :
শিক্ষার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতার পেশায় নারীদের অংশগ্রহণও উল্লেখযোগ্য। মোট শিক্ষকের বড় একটি অংশ নারী। ২০২৫ সালে ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলগুলোতে শিক্ষক ছিলেন ৭ হাজার ৬৯৭ জন। তাঁদের মধ্যে নারী শিক্ষক ৫ হাজার ৫১৬ জন, যা মোট শিক্ষকের ৭১ দশমিক ৬৬ শতাংশ।
স্তরভিত্তিক হিসাবে, এ লেভেল পর্যায়ে শিক্ষক রয়েছেন ৫ হাজার ৮৬৬ জন, তাদের মধ্যে নারী ৪ হাজার ১৫৪ জন। ও লেভেল পর্যায়ে শিক্ষক ১ হাজার ৫২১ জন, তাদের মধ্যে নারী ১ হাজার ১০২ জন। জুনিয়র পর্যায়ে শিক্ষক ৩১০ জন, যার মধ্যে নারী ২৬০ জন। নারী শিক্ষককর পাশাপাশি তিনটি স্তরের মধ্যে 'ও লেভেল' পর্যায়ে ছাত্রীদের অংশগ্রহণের হার সবচেয়ে বেশি।
২০২৫ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলগুলোতে মোট শিক্ষার্থীর মধ্যে ছাত্রী ৩৭ হাজার ৬৫৪ জন, যা ৪৭ দশমিক ৩১ শতাংশ। এ লেভেল পর্যায়ে ৬৪ হাজার ৫৮২ শিক্ষার্থীর মধ্যে ছাত্রী ৩০ হাজার ৫৯১ জন বা ৪৭ দশমিক ৩৭ শতাংশ। ও লেভেল পর্যায়ে ১১ হাজার ৫২০ শিক্ষার্থীর মধ্যে ছাত্রী ৫ হাজার ৬৫১ জন বা ৪৯ দশমিক ৫ শতাংশ। জুনিয়র পর্যায়ে ৩ হাজার ৪৮৭ শিক্ষার্থীর মধ্যে ছাত্রী ১ হাজার ৪১২ জন বা ৪০ দশমিক ৪৯ শতাংশ।
প্রতি ১০ শিক্ষার্থীর বিপরীতে একজন শিক্ষক:
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ও পাঠদানের পরিবেশের মধ্যে সম্পর্ক বোঝার অন্যতম সূচক শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত। ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলগুলোতে এ অনুপাত কেমন এবং প্রতিষ্ঠানভেদে শিক্ষার্থীর সংখ্যায় কতটা পার্থক্য রয়েছে তা-ও উঠে এসেছে ব্যানবেইসের পরিসংখ্যানে।
ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলগুলোতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সামগ্রিক অনুপাত ১:১০। অর্থাৎ, গড়ে প্রতি ১০ শিক্ষার্থীর বিপরীতে একজন শিক্ষক রয়েছেন। স্তরভিত্তিক হিসাবে, এ লেভেল ও জুনিয়র পর্যায়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত ১:১১ এবং ও লেভেলে ১:৮।
প্রতি স্কুলে গড়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৫৫৭ জন। এর মধ্যে এ লেভেল পর্যায়ের স্কুলে গড়ে ৭৬০ জন, ও লেভেলে ২৫০ জন এবং জুনিয়র পর্যায়ের স্কুলে ২৯১ জন শিক্ষার্থী রয়েছে।
আগ্রহ বেড়ে যাওয়ায় যত কারণ:
পরিসংখ্যানে শিক্ষার্থী বৃদ্ধির চিত্র স্পষ্ট হলেও এর পেছনের কারণ বুঝতে অভিভাবকদের প্রত্যাশা ও সিদ্ধান্তের দিকে তাকানো জরুরি। ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার বেশ কয়েক বিষয়ের সঙ্গে যুক্ত বলে মনে করছেন অভিভাবক ও শিক্ষাবিশেষজ্ঞরা। এর মধ্যে সবচেয়ে প্রচলিত ধারণা হলো চাকরির বাজারে সুবিধা। দেশে ও বিদেশে ইংরেজিতে দক্ষ প্রার্থীদের কর্মক্ষেত্রে বাড়তি সুযোগ রয়েছে বলে অভিভাবকদের বিশ্বাস। এর পাশাপাশি শিক্ষার মান ও সুযোগ-সুবিধা নিয়ে আরেকট ধারণাও বেশ জোড়ালো। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর যোগাযোগ, পাঠদানের পদ্ধতি ও স্কুলের সুযোগ-সুবিধাকে অনেকে আকর্ষণের কারণ মনে করেন। তবে সবচেয়ে হতাশার জায়গাটি হলো সাধারণ শিক্ষার ওপর আস্থার সংকট। দেশেরশিক্ষাক্রমের ঘন ঘন পরিবর্তন, মূল্যায়নব্যবস্থা এবং পাঠদানের মান নিয়ে উদ্বেগের কারণে কিছু পরিবার বিকল্প ধারার কথা ভাবছে।
তিন সন্তানকেই ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত ধানমন্ডির ইউরোপিয়ান স্টান্ডার্ড স্কুলে পড়াশোনা করাচ্ছেন এক অভিভাবক। তাঁর প্রত্যাশা সন্তানরা ইংরেজিতে দক্ষ হবে, বিদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পাবে এবং ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ারে এগিয়ে থাকবে।
ইতিমধ্যে বড় ছেলে স্কুলের গন্ডি পেরিয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছে। ছেলেকে মালয়েশিয়ার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করানোর অভিজ্ঞতা থেকে তিনি মনে করেন, ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীরা বিদেশে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে কিছু বাড়তি সুবিধা পেয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই অভিভাবক বলেন, আমার বড় ছেলেকে মালয়েশিয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়েছি। ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থী হওয়ায় তার আইইএলটিএস বা অতিরিক্ত ইংরেজি কোর্স করতে হয়নি। কিন্তু বাংলা মাধ্যম থেকে যেসব শিক্ষার্থী সেখানে গিয়েছে, তাদের অনেককে আইইএলটিএস দিতে হয়েছে, অতিরিক্ত কোর্স করতে হয়েছে এবং সেগুলোর সনদ জমা দিতে হয়েছে। আমার ছেলের ক্ষেত্রে এসব জটিলতা হয়নি।
ইংরেজি মাধ্যমে ভর্তি করানোর কারণ জানিয়ে তিনি বলেন, সন্তানরা ভাষার দিক থেকে এগিয়ে থাকবে, বিদেশে হায়ার এডুকেশনের ভালো সুযোগ পাবে, চাকরি নিয়েও দুশ্চিন্তা করতে হবে না।
দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা নিতে গেলেও ভর্তির ক্ষেত্রে ইংরেজি মাধ্যমের সনদ শিক্ষার্থীদের বাড়তি সুবিধা দেয় জানিয়ে এই অভিভাবক বলেন, প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিগুলোর মধ্যে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হওয়া বেশ কঠিন। আমার বড় ছেলের ব্যাকগ্রাউন্ড ইংলিশ মিডিয়ামে থাকায় সুবিধা হয়েছিল। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে বায়োটেকনোলজি বিষয়ে পড়াশোনা শুরু করেছিল। যদিও দুই বছর পরে ছেড়ে মালয়েশিয়ায় উচ্চ শিক্ষা নিচ্ছে।
বড় মেয়েও ভবিষ্যতে বিদেশে উচ্চশিক্ষা নিতে চায় বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, বড় মেয়েটি বর্তমানে এ লেভেলে পড়ছে। আগে তাকে মালয়েশিয়ায় পাঠানোর পরিকল্পনা থাকলেও কিছু সমস্যার কারণে আপাতত দেশে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। মেয়েটি ব্যবসায় শিক্ষা নিয়ে পড়তে আগ্রহী। যদি দেশে পড়াই তবে প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতেই পড়াবো। কারণ ওখানে ইংলিশ মিডিয়ামের স্টুডেন্টদের ভর্তির জন্য ভালো সুযোগ থাকে।
তিনি আরও বলেন, বড় ছেলে ও বড় মেয়েকে ইংরেজি মাধ্যমে পড়ানোর পর ছোট মেয়েকেও একই ধারায় ভর্তি করিয়েছি। যাতে পরিবারে ক্লাস ডিফারেন্স তৈরি না হয়।
বিকল্প শিক্ষাধারার দিকে ঝোঁকার প্রবণতা আরও বেড়ে যাওয়ায় ইঙ্গিত :
সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষার্থী কমার পেছনে শিক্ষার মান নিয়ে অসন্তোষ, শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণের দুর্বলতা এবং জবাবদিহির ঘাটতিকে বড় কারণ হিসেবে দেখছেন শিক্ষাবিদেরা। ফলে বিকল্প শিক্ষাধারার দিকে ঝোঁকার প্রবণতা ভবিষ্যতে আরও বেড়ে যাওয়ায় ইঙ্গিত দিয়েছেন শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা। সাধারণ শিক্ষার মানোন্নয়নে শিক্ষক নিয়োগ ও তাদের পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের ওপর জোর দেন ঢাবির শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ নূরে আলম সিদ্দিকী।
তিনি বলেন, শুধু বেতন-ভাতা বাড়ানো নয়, শিক্ষকদের চাকরির মেয়াদ, কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন ও জবাবদিহির বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে কোনো শিক্ষক একবার ব্যবস্থায় যুক্ত হলে তার কর্মদক্ষতা খারাপ হলেও চাকরিতে থাকা নিয়ে কার্যকর জবাবদিহির ঘাটতি রয়েছে। এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের ক্ষেত্রেও এ সমস্যা রয়েছে।
শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে এনটিআরসিএর মাধ্যমে নিয়োগ চালু হওয়ায় দুর্নীতির সুযোগ কিছুটা কমলেও পুরো প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। তার মতে, শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা যাচাই এবং যথাযথ প্রশিক্ষণ নিশ্চিত না করেই অনেক শিক্ষককে নিয়োগ দেওয়া হয়। অথচ শিক্ষকতা এমন একটি পেশা, যেখানে দায়িত্ব পালনের আগে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা যাচাই জরুরি। এ ক্ষেত্রে শিক্ষকদের জন্য নির্দিষ্ট মেয়াদে কার্যকর লাইসেন্স চালু এবং নির্দিষ্ট সময় পর তা নবায়নের ব্যবস্থার পক্ষে মত দেন তিনি।
শিক্ষকদের পেশাগত উন্নয়ন ও জবাবদিহির ঘাটতিকে সাধারণ শিক্ষার আরেকটি সংকট হিসেবে দেখছেন তিনি। তার মতে, সরকারি ও এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানে কর্মদক্ষতা দুর্বল হলেও চাকরি হারানোর আশঙ্কা তুলনামূলক কম থাকায় অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষকদের দক্ষতা উন্নয়নের তাগিদ তৈরি হয় না। বিপরীতে, কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি টিকিয়ে রাখতে শিক্ষকদের নিজেদের দক্ষতা বাড়ানোর চাপ থাকে। তবে বড় কিছু স্কুলের বাইরে এ ধরনের জবাবদিহির ব্যবস্থা খুব বেশি কার্যকর নয় বলে মনে করেন তিনি।
অধ্যাপক নূরে আলম সিদ্দিকীর মতে, শিক্ষক নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, প্রশিক্ষকদের যোগ্যতা, শিক্ষার মান এবং শিক্ষকদের জবাবদিহি এসব ক্ষেত্রে কাঠামোগত দুর্বলতা দূর না করলে সাধারণ শিক্ষার মানোন্নয়ন কঠিন হবে। আর শিক্ষার মান নিয়ে পরিবারগুলোর আস্থা তৈরি না হলে সামনের বছরগুলোতে শিক্ষার্থী সংখ্যা আরও কমবে বলে আশঙ্কা করেন তিনি।
এসব ঘাটতির কারণে ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী সংখ্যা ভবিষ্যতে আরও বেড়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়ে এই শিক্ষক বলেন, যেসব পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য রয়েছে, তাদের একটি অংশ সন্তানদের ইংরেজি মাধ্যমে পড়াচ্ছে। অন্যদিকে, দরিদ্র পরিবারের একাংশ মাদ্রাসামুখী হচ্ছে। ফলে সাধারণ শিক্ষার ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে। ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনার ক্ষেত্রে কিছু বাস্তব সুবিধাও রয়েছে। এ মাধ্যমে পড়লে শিক্ষার্থীদের ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা ও বাইরের বিশ্বের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ বাড়ে। এতে উচ্চশিক্ষা ও চাকরির ক্ষেত্রে তারা কিছুটা এগিয়ে থাকতে পারে। কিন্তু শিক্ষার সার্বিক উন্নোয়নে কাজ করতে হবে। তা না হলে সামর্থ্য অনুযায়ী বিকল্প শিক্ষাধারার দিকে ঝোঁকার প্রবণতা আরও বাড়তে পারে।