মা-সন্তান-ভাইকে হারিয়ে শোকে কাতর ডা. ইসরাত জাহান রুবা © সংগৃহীত
পদ্মা নদীতে বাস ডুবির ঘটনায় পরিবারের তিন সদস্য হারানো ডা. ইসরাত জাহান রুবা বিলাপ করতে করতে বলেন, ‘আমার একটা মাত্র বাচ্চা, সোনার ছেলে আমার। আমার চাঁদের মতোন ছেলে। সেই ছেলে নাই হয়ে গেছে। আমার একমাত্র ভাইটাও চলে গেল। আমার মা টাকেও হারিয়ে ফেললাম।’
নিহতরা হলেন, রাজবাড়ী পৌরসভার ভবানীপুর ৮নং ওয়ার্ড লালমিয়া সড়ক এলাকার মৃত মৃত ইসমাঈল হোসেন খানের স্ত্রী রেহেনা আক্তার (৬১), রেহেনা আক্তারের ছোট ছেলে আহনাফ তাহমিদ খান (২৫) ও রেহেনা আক্তারের নাতি রাজবাড়ী পৌরসভার ৫নং ওয়ার্ডের কেবিএম মুসাব্বির ও ডা. ইশরাত জাহান রুবার ছেলে তাজবীর (৭)। নিহত আহনাফ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ শিক্ষার্থী ছিলেন।
নিহত আহনাফের বড় বোন ও তাজবীরের মা ডা. ইশরাত জাহান কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমি কেমনে করে বাঁচব তোরে ছাড়া (তাজবীর), আমি কেন আগের দিন আমার বাচ্চাটারে নিয়ে গেলাম না, তাহলে আমার বাচ্চাটা বেঁচে যেত। আমার ছোট ভাইটাও চলে গেল।
তিনি বলেন, আমি ঢাকায় ছিলাম। আমার বাচ্চা আসতেছে এজন্য আমি বাসায় রান্না করছিলাম। আমি কিছুই জানতাম না। সন্ধ্যায় আমাকে গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে ফোন দেওয়া হয়। এর কিছুক্ষণ পর আমার বন্ধু আমাকে ফোন দিয়ে জানায় আমার মা আর নেই। আমার ছোট ভাই ও আমার বাচ্চার সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। পরে জানতে পারলাম আমার ছোট ভাই ও আমার একমাত্র সন্তানও মারা গেছে। সন্তানের লাশ রাতে শনাক্ত করেছিলাম, আর ছোট ভাইয়ের লাশ আজ সকালে পেয়েছি। আমার মায়ের লাশ রাতেই গোয়ালন্দ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পেয়েছিলাম।
একমাত্র সন্তান, ভাই ও মা কে হারিয়ে ইসরাত জাহান রুবা শোকে কাতর। তিনি বলেন, আমার একটা মাত্র ছেলে আর নেই, আমার একটা ভাই, আর কোনো ভাই নেই। আর কোনো সন্তান নেই। আমি যতটুকু টাইম চাকরিতে থাকি এরপর বাসায় এসে বাচ্চাকে সময় দেই। আমার বাচ্চাকে ছাড়া কেমন করে বাঁচব এখন আমি। আমার একটা মাত্র বাচ্চা, সোনার ছেলে আমার। আমার চাঁদের মতো ছেলে। সেই ছেলে নাই হয়ে গেছে।
তিনি সন্তান ও ভাইয়ের স্মৃতিচারণ করে বলেন, আমি ঈদের ছুটি শেষ করে যখন ঢাকা যাই তখন আমার ছেলে বলছিল মা সাবধানে যেও। আমি তখন বললাম রাতে কার কাছে ঘুমাবা তুমি, সে বলল মামার কাছে ঘুমাব। আমার ছেলের মামাও নেই, আমার ছেলেও নেই। দুজন মিলে নাই হয়ে গেছে আমার জীবন থেকে। আমার এত ভালো ভাই, আমাদের এত সুন্দর সংসার, আমরা দুই বোন ডাক্তার। কত সুখ শান্তি আমাদের পরিবারে, এক সেকেন্ডের মধ্যে সব কিছু শেষ হয়ে গেল। আমার সংসার ভেঙে ছাড়খার হয়ে গেল। আমার সব ছিল, এখন সব নাই হয়ে গেল। আমি এখন কি নিয়ে বাঁচব।
নিহত শিশু তাজবীরের চাচা আতাউল গণি মুক্তাদির বলেন, আমার ভাতিজারা ঢাকায় মিরপুরে থাকে। ওর বাবা মেরিন ইঞ্জিনিয়ার, বর্তমানে সে সুদানে রয়েছে। আমার ভাতিজার মা একজন চিকিৎসক। আনার তাজবীর ইংলিশ মিডিয়ামে প্লে শ্রেণিতে পড়ে। আমার ভাতিজা ঈদের ছুটিতে রাজবাড়ীতে এসেছিল দাদা বাড়ি ও নানা বাড়িতে ঈদ করতে। ঈদ শেষ করে গতকাল বিকেলে আমার ভাতিজা তার নানী, খালা ও মামার সঙ্গে ঢাকায় ফিরছিল। তাদের বাসটি দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নদীতে পড়ে যায়। এতে তাজবীরের খালা বেঁচে ফিরে এলেও বাকিরা মারা গেছে। আমার ভাতিজা আমাদের বংশের প্রদীপ ছিল। আমরা তাকে হারিয়ে ফেললাম।
উল্লেখ্য, বুধবার (২৫ মার্চ) বিকেল সোয়া ৫টার দিকে ঘাটের ৩নং পন্টুন থেকে কুষ্টিয়া থেকে ঢাকাগামী সৌহার্দ্য পরিবহনের ওই বাস ফেরিতে ওঠার সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নদীতে পড়ে যায়। এতে এখন পর্যন্ত মোট ২৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।