সেন্টমার্টিন ভ্রমণে জাহাজ © সংগৃহীত
দীর্ঘ আট মাস বন্ধ থাকার পর সেন্টমার্টিন রুটে পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচলের দ্বিতীয় দিনে তিনটি জাহাজে ১ হাজার ৫৫৪ জন পর্যটক দ্বীপটিতে গেছেন। শুক্রবার (৬ নভেম্বর) সকালে কক্সবাজারের উত্তর নুনিয়াছড়া ঘাট থেকে এমভি বারো আউলিয়া, এমভি কর্ণফুলী এক্সপ্রেস ও এমভি টেকনাফ সেন্টমার্টিনের উদ্দেশে যাত্রা করে। তবে জাহাজের টিকিটের ভাড়া বেশি হওয়ায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন অনেক পর্যটক।
শুক্রবার সকালে চলতি মৌসুমে প্রথমবারের মতো সেন্টমার্টিনের উদ্দেশে যাত্রা করে এমভি কর্ণফুলী এক্সপ্রেস ও এমভি টেকনাফ। এর আগে বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) ৮৩৬ জন পর্যটক নিয়ে যাত্রা করা এমভি বারো আউলিয়া রাতেই কক্সবাজার ফিরে আসে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, দ্বিতীয় দিনে তিনটি জাহাজে মোট ১ হাজার ৫৫৪ জন পর্যটক সেন্টমার্টিন গেছেন। এর মধ্যে এমভি বারো আউলিয়ায় ৬১৯ জন, এমভি কর্ণফুলী এক্সপ্রেসে ৩৮৭ জন এবং এমভি টেকনাফে ৫৪৮ জন পর্যটক ছিলেন।
ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব কক্সবাজারের (টুয়াক) যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শফিউল আলম কাজল জানান, সেন্টমার্টিনগামী পর্যটকদের জন্য একমুখী জাহাজভাড়া সর্বনিম্ন ১ হাজার ৮০০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। সর্বোচ্চ ভাড়ার টিকিটে কেবিনের সুবিধা পাওয়া যাবে।
সি ক্রুজ অপারেটর ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (স্কোয়াব) সাধারণ সম্পাদক হোসাইন ইসলাম বাহাদুর বলেন, আগামী বছরের ১৫ মার্চ পর্যন্ত অনুমোদিত তিনটি জাহাজ নিয়মিত চলাচল করবে। এসব জাহাজের সম্মিলিত ধারণক্ষমতা ২ হাজার ৩০০ জন। যেহেতু এ বছর প্রতিদিন সাড়ে ৩ হাজার পর্যটক যাওয়ার অনুমতি রয়েছে, তাই জাহাজের সংখ্যাও বাড়তে পারে।
এদিকে কক্সবাজারের উত্তর নুনিয়াছড়া ঘাটে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তৎপর রয়েছে জেলা প্রশাসন, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ), পুলিশ, কোস্টগার্ডসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সমুদ্রপথে সেন্টমার্টিন যাওয়ার আনন্দ ও উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন পর্যটকেরা। একই সঙ্গে সরকারি নির্দেশনা মেনে চলার কথাও জানিয়েছেন তাঁরা।
চট্টগ্রাম থেকে আসা পর্যটক কবির আহমেদ বলেন, ‘সেন্টমার্টিন আমাদের সম্পদ, দ্বীপের পরিবেশ রক্ষায় আমরা যারা সেখানে ঘুরতে যাই তাদের প্রত্যেকেরই ভূমিকা রাখা উচিত।’
তবে জাহাজের টিকিটের দাম বেশি হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছেন অনেক পর্যটক। ঢাকার উত্তরার বাসিন্দা মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ সাংবাদিকদের বলেন, ‘টিকিটের দাম একটু বেশি মনে হয়েছে, ভ্রমণপিপাসুদের সাধ্যের কথা বিবেচনা করে মূল্য নির্ধারণ করা হলে ভালো হতো।’ তিনি আশা প্রকাশ করেন, জাহাজ কর্তৃপক্ষ ভাড়ার বিষয়টি পর্যালোচনা করবে।
অন্যদিকে এবার সেন্টমার্টিন ভ্রমণে পর্যটকদের জন্য কয়েকটি শর্ত বাধ্যতামূলক করেছে সরকার। প্রত্যেক পর্যটককে ১০০ টাকা পরিবেশ সংরক্ষণ ফি দিতে হবে। পাশাপাশি দ্বীপ ভ্রমণের জন্য ট্রাভেল পাস ও কিউআর কোডযুক্ত টিকিট সংগ্রহ করতে হবে।
এসব ব্যবস্থার মাধ্যমে দ্বীপে পর্যটকের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, পর্যটকদের পরিচয় ও যাতায়াতের তথ্য সংরক্ষণ এবং পরিবেশ সংরক্ষণ কার্যক্রম জোরদার করা হচ্ছে। পর্যটকদের প্রবেশ ও রাতযাপনের অনুমতি থাকলেও দ্বীপের ভঙ্গুর পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় একাধিক বিধিনিষেধ বহাল রয়েছে। বিশেষ করে রাতের বেলায় পর্যটকদের কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, রাতে সমুদ্রসৈকত ও আশপাশের এলাকায় আলো জ্বালানো, উচ্চ শব্দ সৃষ্টি এবং বারবিকিউ পার্টির আয়োজন করা যাবে না। এ ছাড়া কেয়াবনে প্রবেশ, কেয়া ফল সংগ্রহ ও কেনাবেচাও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
একই সঙ্গে সামুদ্রিক কাছিম, পাখি, প্রবাল, শামুক, ঝিনুক, তারামাছ, রাজকাঁকড়া, সামুদ্রিক ঘাস ও শৈবালসহ দ্বীপের কোনো প্রাকৃতিক সম্পদ বা জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি করা যাবে না। সৈকতে মোটরসাইকেল, সি-বাইকসহ সব ধরনের যানবাহন চলাচলও নিষিদ্ধ।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, সেন্টমার্টিনের মতো ছোট ও সংবেদনশীল দ্বীপে পর্যটকের চাপ নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পর্যটকের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পানির ব্যবহার, জ্বালানি, শব্দদূষণ ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের ওপর চাপ বাড়তে পারে। তাই শুধু পর্যটকদের প্রবেশের অনুমতি দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। এসব নিয়মের যথাযথ বাস্তবায়ন ও নিয়মিত তদারকিও জরুরি।
উল্লেখ্য, এবার শুধু কক্সবাজারের উত্তর নুনিয়াছড়া ঘাট থেকে সেন্টমার্টিনে পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। টেকনাফ বা অন্য কোনো স্থান থেকে জাহাজ ছাড়ার অনুমতি নেই।