অবৈধ ট্রলিং বোটে ধ্বংস হচ্ছে সাগরের বাস্তুতন্ত্র, মিলছে না কাঙ্ক্ষিত ইলিশ

নদীতে বাঁধা ফিশিং ট্রলার

নদীতে বাঁধা ফিশিং ট্রলার © টিডিসি

সরকারি নিষেধাজ্ঞা ও প্রচলিত আইন অমান্য করে বঙ্গোপসাগরে অবাধে চলছে অবৈধ ট্রলিং বোটের দৌরাত্ম্য। নিষিদ্ধ জাল ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে নির্বিচারে পোনা ও ডিমওয়ালা মাছ নিধনের ফলে ধ্বংস হচ্ছে সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র, কমছে ইলিশসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছের উৎপাদন। এর প্রভাব পড়েছে উপকূলের হাজারো জেলের জীবিকা ও দেশের মৎস্যসম্পদের ওপর।

স্থানীয় জেলে, মৎস্য ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মহিপুর-আলিপুর এলাকায় গত বছর যেখানে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫টি রূপান্তরিত ট্রলিং বোট সক্রিয় ছিল, চলতি বছরে সেই সংখ্যা বেড়ে প্রায় ৬০টিতে পৌঁছেছে। প্রতিনিয়ত সাধারণ কাঠের মাছধরা ট্রলারকে ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকা ব্যয়ে অবৈধভাবে ট্রলিং বোটে রূপান্তর করা হচ্ছে। দ্রুত অধিক মুনাফার আশায় এসব বোটে ফিশ ফাইন্ডার, জিপিএস, রাডার, ইকো সাউন্ডার ও উইঞ্চ মেশিনের মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে।

সামুদ্রিক আইন অনুযায়ী, এই বিশাল আকৃতির ট্রলিং বোটগুলোর গভীর সমুদ্রে মাছ শিকার করার কথা। কিন্তু আইন অমান্য করে এগুলো উপকূলের মাত্র কয়েক নটিক্যাল মাইলের মধ্যে ঢুকে পড়ছে। এসব বোটে ব্যবহৃত ভারী জাল বা ‘বটম ট্রলিং’ পদ্ধতি সমুদ্রের তলদেশের পরিবেশের জন্য এক ভয়াবহ অভিশাপ। ভারী জাল সমুদ্রের তলদেশ ঘষে ঘষে টেনে নেওয়ার কারণে প্রবাল, সামুদ্রিক ঘাস, শামুক-ঝিনুকের আবাসস্থল এবং মাছের অভয়াশ্রম বা বাস্তুতন্ত্র পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।

মহিপুর ও আলিপুর বন্দরের সাধারণ জেলেরা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, তারা ছোট নৌকা ও ট্রলার নিয়ে যেখানে মাছ ধরেন, সেখানেই এই বড় ট্রলিং বোটগুলো এসে জাল ফেলে। প্রায়শই বড় বোটগুলো ক্ষুদ্র জেলেদের জালের ওপর দিয়ে চলে যায়। এতে লাখ লাখ টাকার জাল ছিঁড়ে নষ্ট হয়ে চরম ক্ষতির মুখে পড়ছেন প্রান্তিক মৎস্যজীবীরা।

ক্ষতিগ্রস্ত জেলেরা আরও জানান, এসব অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গেলে প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের পক্ষ থেকে জোটে হুমকি-ধমকি ও ভয়ভীতি। প্রায় এক বছর আগে কুয়াকাটা চৌরাস্তায় দেশের বিভিন্ন উপকূলীয় জেলা থেকে আসা শত শত জেলে বিশাল মানববন্ধন করলেও প্রশাসনের তৎকালীন তৎপরতা এখন অনেকটাই ঝিমিয়ে পড়েছে।

এদিকে মাছের সুষ্ঠু প্রজনন ও সংরক্ষণে টানা ৫৮ দিনের সরকারি নিষেধাজ্ঞা শেষে বিপুল আশা নিয়ে জেলেরা সমুদ্রে পাড়ি জমিয়েছিলেন। কিন্তু সাগরে গিয়ে আশানুরূপ ইলিশ বা সামুদ্রিক মাছের দেখা মিলছে না। প্রতিটি ট্রলারে লাখ টাকার বেশি খরচ করে সাগরে গিয়ে শূন্য হাতে কিংবা নামমাত্র মাছ নিয়ে ঘাটে ফিরতে হচ্ছে। এর ওপর যুক্ত হয়েছে মৌসুমি বায়ুর প্রভাব, যার কারণে সাগর উত্তাল হলে জেলেরা দ্রুত তীরে ফিরতে বাধ্য হন। ফলে মৎস্যঘাটে সরবরাহ কমে যাওয়ায় আড়তদার ও শ্রমিকরা অলস সময় পার করছেন। বাজারে ইলিশ, রূপচাঁদা, লইট্টাসহ সামুদ্রিক মাছের দাম এখন সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে।

মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন ও সামুদ্রিক দূষণের পাশাপাশি এই অবৈধ বোট ও জালের ব্যবহার সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদকে চরম ঝুঁকিতে ফেলেছে। ডিমওয়ালা মা মাছ ও পোনা নিধনের ফলে মাছের প্রাকৃতিক পুনরুৎপাদন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে ইলিশ, রূপচাঁদা, পোয়া, লাক্ষা, চিংড়িসহ অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন প্রজাতির মাছের উৎপাদন কমে যেতে পারে। এতে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, রপ্তানি আয় এবং দীর্ঘ মেয়াদে ‘ব্লু ইকোনমি’ বা নীল অর্থনীতির সম্ভাবনাও হুমকির মুখে পড়বে।

সাধারণ জেলেদের অভিযোগ, প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও নৌ-পুলিশের একটি অংশের পরোক্ষ সুবিধার কারণেই বছরের পর বছর এসব অবৈধ ট্রলার প্রকাশ্যে সাগরে মাছ শিকার করছে। তবে এই অভিযোগের পক্ষে সুনির্দিষ্ট কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

মহিপুরের জেলে আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমরা সমুদ্রে গিয়ে মাছ না পেয়ে খালি হাতে ফিরে আসি। অথচ কিছু প্রভাবশালী ট্রলার মালিক প্রশাসনকে ম্যানেজ করে অবৈধ ট্রলিংয়ের মাধ্যমে সাগরের সব মাছ ধ্বংস করে দিচ্ছে। প্রশাসন কঠোর হলে একদিনেই এসব বন্ধ করা সম্ভব।’

আরেক জেলে আবুল কাশেম আক্ষেপ করে বলেন, ‘ছোট মাছ বড় হওয়ার আগেই ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। লাখ লাখ রেণু প্রতিদিন নিধন হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে আমাদের আর মাছ ধরার মতো কিছুই থাকবে না।’

মৎস্য ব্যবসায়ী ও পাইকার রুবেল মিয়া বলেন, ‘আগে যে পরিমাণ মাছ বিএফডিসি ঘাটে আসত, এখন তার চার ভাগের এক ভাগ মাছও বাজারে উঠছে না।’

মহিপুর মৎস্য আড়ৎ মালিক সমিতির সহসভাপতি রাজু আহমেদ রাজা মিয়া আক্ষেপ করে বলেন, ‘অবৈধ ট্রলিং বন্ধে একাধিকবার আলোচনা হয়েছে, কিন্তু কোনো ফল হয়নি। বরং বোটের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। ফলে সাধারণ জেলেরা ক্ষতির মুখে পড়েছে। প্রশাসনের কঠোর নজরদারি না থাকলে এটি বন্ধ করা অসম্ভব।’

ফিশারিজ কর্মকর্তা বখতিয়ার আহমেদ বলেন, ‘অবৈধ জালের কারণে ডিমওয়ালা মাছ ও পোনা নিধন হচ্ছে। ফলে মাছের উৎপাদন কমে যাচ্ছে এবং মৎস্যসম্পদ হুমকির মুখে পড়ছে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, জীববৈচিত্র্য ও লাখো মানুষের জীবিকা রক্ষায় কঠোর আইন প্রয়োগ জরুরি।’

কুয়াকাটা নৌ পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মনিরুজ্জামান বলেন, ‘ট্রলিং বোট নিয়ে আদালতে মামলা চলমান। আমরা সর্বদা তৎপর, তবে গভীর সমুদ্রে অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে আমাদের কিছু লজিস্টিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে।’

এ বিষয়ে পটুয়াখালী জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিজন কুমার নন্দী দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘ট্রলিং বোটের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। এই অবৈধ তৎপরতা সম্পূর্ণ নির্মূল করতে কোস্টগার্ড, নৌ পুলিশ, সংশ্লিষ্ট সংস্থা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং জেলে প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে অভিযান ও নজরদারি আরও জোরদার করা হবে।’

উপকূলের পরিবেশকর্মী ও সাধারণ জেলেদের মতে, অবৈধ ট্রলিং শুধু একটি অপরাধ নয়, এটি দেশের সামুদ্রিক সম্পদের বিরুদ্ধে এক নীরব যুদ্ধ। এখনই যদি এই প্রভাবশালী ট্রলিং সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হয়, তবে অদূর ভবিষ্যতে রূপালি ইলিশের দেশ বাংলাদেশের বঙ্গোপসাগরের মাছের ভাণ্ডার সম্পূর্ণ শূন্য হয়ে পড়বে।

অফিসার ক্যাডেট নিয়োগ দেবে বাংলাদেশ বিমান বাহিনী, আবেদন ৫ সে…
  • ১২ আগস্ট ২০২৬
বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পরীক্ষা হলে সেটি নিয়মবহির্ভূত: …
  • ১২ আগস্ট ২০২৬
রাষ্ট্রপতি প্রার্থী চূড়ান্তে বৈঠক ডেকেছেন তারেক রহমান
  • ১২ আগস্ট ২০২৬
মারা গেলেন চীনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ঝু
  • ১২ আগস্ট ২০২৬
পরিবহন সংকট কাটাতে পবিপ্রবিতে আসছে বিআরটিসির বাস
  • ১২ আগস্ট ২০২৬
শপিংমল-দোকানপাট খোলা রাখা নিয়ে নতুন নির্দেশনা সরকারের
  • ১২ আগস্ট ২০২৬