কালের সাক্ষী ৩০০ বছরের পুরোনো মসজিদ, সংরক্ষণের দাবি এলাকাবাসীর

টিডিসি সম্পাদিত
টিডিসি সম্পাদিত

দেশের একমাত্র দ্বীপজেলা ভোলা। ভোলা বাংলাদেশের বৃহত্তম প্রাচীন গাঙ্গেয় বদ্বীপ। দক্ষিণাঞ্চলের এ জেলার ইতিহাস সম্পর্কে জানা যায় প্রায় ৪০০ বছর আগে পলি মাটি জমে বঙ্গপসাগরের মোহনায় মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীর তীরে গড়ে ওঠে এ দ্বীপ। চাষাবাদের জন্য এ দ্বীপে বসতি স্থাপন করে বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ। মুসলিম জনগোষ্ঠীর নামাজ আদায়ের জন্য প্রয়োজন হয় মসজিদ নির্মাণের। তেমনি একটি মসজিদ হচ্ছে আশ্রাফ সিকদার জামে মসজিদ। এ মসজিদ ৩০০ বছরের পুরোনো। সংস্কার কাজের অভাবে মসজিদটি বর্তমানে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। মসজিদটি সংস্কার ও সরক্ষণের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।

জানা গেছে, ভোলা শহরের ভোলা শহরের ওয়েস্টার্ন পাড়ায় নির্মিত আশ্রাফ শিকদার জামে মসজিদ। এটি ৩০০ বছরের পুরোনো মসজিদটি। যার দৈর্ঘ্য আনুমানিক ২৫ ফুট ও প্রস্থ ১২ ফুট। মসজিদের গম্বুজ ও মিনারগুলো মুসলিম স্থাপত্যের দৃষ্টিনন্দন কারুকার্যে নির্মিত। বাইরের কার্নিশগুলোও বাদ যায়নি ক্যালিগ্রাফি থেকে। চুন-সুরকি আর পোড়া মাটি দিয়ে নির্মিত মসজিদটি এখনো দাঁড়িয়ে আছে মুসলিম স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শন হিসেবে। মোগল আমনের নানান নকশাখচিত থাকায় অনেকের ধারণা মোঘল স্থাপত্যকলায় নির্মিত হয় মসজিদটি। বর্তমানে মসজিদটির সামনে একটি ঈদগাঁ মাঠ এবং উত্তর পার্শে নুরানি মাদরাসা রয়েছে। মসজিদটির নির্মাতা আশ্রাফ শিকদার ও তার পরিবার পরিজনের কবর রয়েছে এখানে।

আরও পড়ুন: ঢাবিতে নিক্সন চৌধুরীর ফটোগ্রাফার আটক, প্রচার করতেন নারী সমন্বয়কের ফুটেজ

জানা গেছে, ভোলা দ্বীপের বাসিন্দা আশ্রাফ আলী শিকদার আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ হন বরিশালের উলানিয়া জমিদার বাড়ির সঙ্গে। সেখান থেকে জমিদারি পেয়ে ভোলা শহরের ওয়েস্টার্ন পাড়ায় বসতি স্থাপন করেন তিনি। নামাজ আদায়ের জন্য বাড়ির সামনে নির্মাণ করেন এক কক্ষ ও ৩ গম্বুজ বিশিষ্ট একটি মসজিদ। মসজিদের পাশেই খনন করেন একটি দিঘি। মুসল্লিদের নামাজ ও গোসলের সুবিধার জন্য এবং বর্ষা মৌসূমে পানি ধরে রাখার জন্য এ দিঘি খনন করা হয়। 

ধারণা করা হয়, প্রায় ৩০০ বছরের আগে মোঘল আমলের স্থাপত্য নকশায় নির্মিত হয় মসজিদটি। একটি বড় ও দুটি অপেক্ষাকৃত ছোট গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদটিতে সামনের দিকে দুই কোনে দুটি মিনার রয়েছে। মেহরারের সঙ্গে রয়েছে ৪টি ছোট মিনার। মসজিদের পেছনের অংশেও ৬টি মিনার রয়েছে। দক্ষিণ ও উত্তর পাশে রয়েছে ৪টি করে মিনার। পিলারগুলো মিনারের আদলে তৈরি। মসজিটির ভেতরের অংশে রয়েছে ২টি আর্চ। মোগল আমলের স্থাপত্য নকশায় নির্মিত মসজিটির রয়েছে তিনটি দরজা। দরজাগুলো আকারে ছোট। দরজার চৌকাঠ ও খিলানগুলো এখনো রয়েছে অক্ষত। মসজিদটির দক্ষিণ ও উত্তর পাশে রয়েছে ছোট দুটি জানালা। এত বছর আগে এমন দৃষ্টি নন্দন স্থাপনা কীভাবে নির্মাণ করা হলো, তা নিয়ে বিস্মিত বর্তমান প্রজন্ম।

আরও পড়ুন: বেসরকারি মেডিকেলে ভর্তি: অপেক্ষমাণ ৮২৭ শিক্ষার্থীর নিশ্চায়ন কালকের মধ্যে

স্থানীয় মুসল্লিরা জানান, ৩০০ বছরেরও আগে নির্মিত মসজিদটিতে মাত্র দুটি কাতারে নামাজ আদায় হয়। তৎকালীন সময়ে এলাকায় মুসল্লি সংখ্যা কম হওয়ায় এক কক্ষ বিশিষ্ট মসজিদটি নির্মিত হয়। সঠিকভাবে এর নির্মাণ সন জানা না গেলেও অনেকের ধারণা এর বয়স ৩০০ বছরের বেশি। বর্তমানে মুসল্লির সংখ্যা বেশি হওয়ায় মূল সমজিদের বাইরের অংশে মসজিদটি বৃদ্ধি করা হয়। বাংলা ১৩৬১ সনে মসজিদটির বাইরের বর্ধিতা অংশ নির্মিত হয়। ফলে বাইরে থেকে মূল মসজিদটি ভালোভাবে দেখা যায় না। বর্তমানে মসজিদটিতে একজন খতিব, একজন ইমাম ও একজন মুয়াজ্জিন রয়েছেন।

মুয়াজ্জিনের দায়িত্বে থাকা মো. ওসমান গনীর বাড়ি মেহেন্দীগঞ্জ থানায়। তিনি ভোলার একটি মাদরাসায় পড়াশোনার সুবাদে মসজিদে খেদমদ করে আসছেন। তিন বছরের বেশি ৫ ওয়াক্ত নামাজের জন্য আজান দেন। ওসমান গনী বলেন, ‘আমি এখনো শিক্ষার্থী। এ বয়সে এমন একটি মসজিদে মুয়াজ্জিন হতে পেরে আমি আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করি।’

মসজিদের ইমাম মো. সামসুদ্দিন বলেন, ‘এমন একটি ঐতিহাসিক মসজিদে ইমামতি করতে পেরে তিনি নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করেন।’ তিনি মসজিদটি সংরক্ষণ ও উন্নয়নে সরকারের সহযোগিতা চান।

আরও পড়ুন: ইবির আবাসিক হল বন্ধ থাকবে ১২ দিন

মসজিদটিতে নিয়মিত নামাজ আদায় করেন স্থানীয় মুসল্লি মো. মহিউদ্দিন। তিনি বলেন, ‘আমি এ মসজিদে নামাজ আদায় করে আত্মতৃপ্তি পাই।’

মো. গিয়াস উদ্দিন বলেন, ‘আমি বিগত ৩০ বৎসরের অধিককাল যাবৎ এ মসজিদে নামাজ পড়ি, মসজিদটির সংস্কার প্রয়োজন।’

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আশ্রাফ শিকারের পরিবারের অনেকেই এখন আর বেঁচে নেই। তাই মসজিদটির সংস্কারের দায়িত্বও নিচ্ছে না কেউ। সংস্কারকাজের অভাবে মসজিদটি বর্তমানে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। দেয়ালের বিভিন্ন অংশে ফলেস্টার খসে পড়তে শুরু করেছে। মসজিদটি সংস্কার ও সরক্ষণের দাবি জানিয়েছে এলাকাবাসী। একজন ইমাম, একজন মুয়াজ্জিন ও একজন খতিব রয়েছেন মসজিদটিতে।

আরও পড়ুন: যবিপ্রবির বিভিন্ন বিভাগে শিক্ষক নিয়োগ, বেতন সর্বোচ্চ ৭৪ হাজার

মসজিদ কমিটির কোষাধ্যক্ষ ও প্রবীণ মুসল্লি মো. আ. বারেক বলেন, ‘মসজিদ পরিচালনা করতে বেগ পেতে হচ্ছে তাদের। মসজিদের তেমন কোনো আয় নেই। মুয়াজ্জিন, ইমাম ও খতিবের বেতন দিতে পারছেন না তারা। এ ছাড়া প্রতি মাসে বিদ্যুৎ বিলও দিতে হয় অনেক। তিনি সরকার ও সংশ্লিষ্ট মহলের কাছে মসজিদ পরিচালনার জন্য সহযোগিতা কামনা করেন।

ভোলার এই ঐতিহাসিক ৩০০ বছরের পুরাকীর্তিটি রক্ষণাবেক্ষণ ও সংরক্ষণের উদ্যোগ নেবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এমনটাই আশা ভোলাবাসীর।


সর্বশেষ সংবাদ