‘কোটা চাই’ আন্দোলন। শুরুটা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘কোটা চাইলে আন্দোলনে যেতে হবে’ বক্তব্যের দিন থেকে; গত বুধবার। প্রথম দু’দিনের আন্দোলন রাজধানীর শাহবাগে সীমাবদ্ধ থাকলেও পর্যায়ক্রমে তা দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছড়িয়ে পড়েছে। ঘটনা ঘটেছে বেশ কয়েকটি সড়ক অবরোধের। সর্বশেষ আজ রোববারের কর্মসূচি থেকে আগামীকাল সোমবার সকাল ১০টা থেকে ১১পর্যন্ত মহাসড়ক অবরোধের ডাক দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা। পাশাপাশি কাল অনুষ্ঠেয় মন্ত্রিসভার বৈঠকে কোটা পুনর্বহাল না হলে মহাসমাবেশ করে নতুন কর্মসূচি দেয়ার হুশিয়ারিও উচ্চারণ করেছেন তারা।
মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ড ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আল মামুন বলেন, আজকের শাহবাগ অবরোধ রাত ১০ টা পর্যন্ত চলবে এছাড়া অাগামীকাল সকাল ১০ টা থেকে ১১ টা পর্যন্ত ১ ঘন্টাব্যাপী সারাদেশের মহাসড়ক অবরোধ করা হবে। আর সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে যদি মুক্তিযোদ্ধা কোটা বহাল না করা হয়, তাহলে সামনে অাবারো মহাসমাবেশ করে কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
আন্দোলনকারীদের ভাষ্য, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটা থাকবে। অথচ কিন্তু প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে থাকবে না। এটা তাদের জন্য অপমান। মুক্তিযোদ্ধা কোটা ৩০শতাংশই রাখতে হবে।
রবিবার শাহবাগ ঘুরে দেখা যায়, সকালের দিকে আন্দোলনকারীর সংখ্যা কম হওয়ায় বেশ কয়েকজন প্রাইভেটকার চালক ব্যারিকেড সরিয়ে যান চলাচল স্বাভাবিক করে দিলেও দুপুরের পর থেকেই আন্দোলনের মাত্রা বেড়ে যায়। এতে ‘আমরা মুক্তিযোদ্ধা সন্তান কেন্দ্রীয় কমিটি,’ ‘বীরশ্রেষ্ঠ, মুক্তিযোদ্ধা ও প্রজন্ম ঐক্য পরিষদ,’ ‘মুক্তিযোদ্ধা সন্তান ফাউন্ডেশন,’ ‘মুক্তিযুদ্ধ সংসদ সন্তান কমান্ড ও প্রতীবন্ধী শিক্ষার্থীসহ দুই শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা-পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতি দেখা যায়। তবে আন্দোলনটি মূলত দুটি অংশে বিভক্ত হয়ে চলছে। এর একটি ‘মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ’; অন্যটি বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী ঐক্য পরিষদ'।
আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক জানান, শাহবাগে চারপাশের সব রাস্তা ট্রাফিক পুলিশের ব্যবহৃত বহনযোগ্য রোড ডিভাইডার দিয়ে আটকে দিয়ে ভেতরে অবস্থান নিয়েছেন বিক্ষোভকারীরা। এতে আশেপাশের সড়কগুলোতে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। তবে অ্যাম্বুলেন্সসহ জরুরি সেবার যানগুলো চলতে দেয়া হচ্ছে। এছাড়া বাংলামোটর থেকে শাহবাগ হয়ে মৎসভবন অভিমুখী কিছু কিছু যান সড়কের একপাশ দিয়ে চলাচল করতে দেখা গেছে।
জানা যায়, প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরিতে ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা বহাল রাখা ছাড়াও আরো পাঁচটি দাবি আদায়ে মাঠে নেমেছে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানরা। তাদের অন্য দাবিগুলো হচ্ছে- সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধাদের কটূক্তি বিচার, মুক্তিযোদ্ধা পারিবারিক সুরক্ষা আইন প্রণয়ন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বাড়িতে হামলার বিচার, প্রশাসনে রাজাকার ও রাজাকারদের সন্তানদের তালিকা করে বরখাস্ত করা এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি।
অন্যদিকে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন তাদের ১১দফা। দাবিগুলো হলো, চাকরিতে বিনা শর্তে প্রতিবন্ধীদের ৫ শতাংশ কোটা প্রজ্ঞাপন আকারে প্রকাশ, সরকারি, স্বায়ত্বশাসিত, আধা-স্বায়ত্বশাসিত চাকরির প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় প্রতিবন্ধী কোটা কার্যকর, পরীক্ষায় ১০ মিনিট সময় বৃদ্ধি, তীব্র মাত্রায় প্রতিবন্ধীদের অগ্রাধিকার, চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা শিথিল করা, কর্মসংস্থানে প্রবেশ নিশ্চিত করা, অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের মতো প্রতিবন্ধী মন্ত্রণালয় থাকা, প্রতিবন্ধী অধিদপ্তর করা, চাকরিতে শ্রুতি লেখকের নীতিমালা প্রণয়ন করা। প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী ঐক্য পরিষদের আহ্বায়ক আলী হোসেন বলেন, তাদের দাবি স্পষ্ট। সরকারি চাকরিতে ৫ ভাগ কোটা সংরক্ষণসহ ১১ দফা। তিনি জানান, মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের সঙ্গে তাদের কর্মসূচির সম্পর্ক নেই। তারা পৃথকভাবে আন্দোলন করছেন।
কোটা সংস্কার আন্দোলন বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের দীর্ঘদিনের আন্দোলন ও দাবির পরিপ্রেক্ষিতে গত বৃহস্পতিবার প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরিতে কোটা বাতিল করে পরিপত্র জারি করে সরকার। জনপ্রশাসনের চাকরিতে মেধার ভিত্তিতে নিয়োগের জন্য বিদ্যমান কোটা ব্যবস্থা সংস্কারের জন্য শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার গত ২ জুলাই ২০১৮ তারিখে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করে। কমিটি গত ১৭ জুলাই প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরিতে বিদ্যমান কোটা পদ্ধতি বাতিলের সুপারিশ করে প্রতিবেদন জমা দেয়। পরে গত বুধবার তা মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকে অনুমোদন দেওয়া হয়।
বুধবার সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মো. শফিউল আলম সাংবাদিকদের মন্ত্রিসভার বৈঠকের সিদ্ধান্ত জানিয়ে বলেন, ৯ম গ্রেড থেকে ১৩তম গ্রেড পর্যন্ত সব নিয়োগ এখন থেকে সম্পূর্ণ মেধার ভিত্তিতে হবে। সরকার সময়ে সময়ে সরকারি চাকরিতে ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বের বিষয়টি পর্যালোচনা করে দেখতে পারবে এবং তাদের জন্য কোটা নির্ধারণ করতে পারবে।