ফ্রান্সের আইনশৃঙ্খলাবাহিনী © সংগৃহীত
স্কুলের বেহাল দশা, শিক্ষক সংকট এবং লাগামহীন জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ার বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ ও শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ ঘিরে দাঙ্গা ও লুটপাটের আশঙ্কা করছে ফ্রান্স সরকার। এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় শনিবার দেশজুড়ে ৭০ হাজার পুলিশ মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে কতৃপক্ষ। একইসঙ্গে নিরাপত্তার জন্য জলকামান, হেলিকপ্টার ও ড্রোন প্রস্তুত রয়েছে।
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট নুনেজ এ ঘোষণা দেন। তিনি অভিযোগ করেছেন, ‘চরম বামপন্থী গোষ্ঠীগুলো অনলাইনে সরকারি ভবনে হামলা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির জন্য উসকানি দিচ্ছে।’ নুনেজ বলেছেন, ‘দাঙ্গাবাজ, লুটপাটকারী এবং সহিংসতায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আমরা আপসহীন থাকব।’
ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়া ও সরকারি সেবার মান নিয়ে অসন্তোষ থেকে কয়েক সপ্তাহ ধরেই চলছে বিক্ষোভ। এতে শিক্ষার্থী, শ্রমিক ও বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের সদস্যরা যোগ দিয়েছেন। এদিকে সরকারের দাবি, কিছু উগ্রপন্থী গোষ্ঠী ও তরুণ লুটপাটকারীরা এই পরিস্থিতির সুযোগ নিচ্ছে। অন্যদিকে, কিছু কট্টর ডানপন্থী রাজনীতিবিদ অস্থিরতার জন্য অভিবাসী ও মৌলবাদী ইসলামকে দায়ী করেছেন। তবে রাষ্ট্রপতি এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন।
শুক্রবার প্যারিসের পশ্চিমে একটি গাড়ি থেকে চালানো এক ব্যক্তির গুলিতে একজন নিহত এবং ১২ বছর বয়সী এক বালিকাসহ আরও চারজন আহত হন। কর্মকর্তাদের ধারণা, এ ঘটনার পেছনে রয়েছে ইমলামবিদ্বেষ। স্থানীয় মেয়র আলী রাবেহ উগ্র ডানপন্থী বক্তব্যকে দায়ী করে বলেছেন, ‘এটি নিঃসন্দেহে একটি বর্ণবাদী হামলা।’
এদিকে শনিবার প্যারিসে মাত্র একটি শ্রমিক সংগঠনকে বিক্ষোভের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ফ্রান্সের অধিকাংশ শহরে বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করলেও দ্বিতীয় বৃহত্তম মার্সেইয় শহরে একটি শ্রমিক সংগঠনকে বিক্ষোভের অনুমতি দিয়েছে। তবে দেশটির প্রধান ছাত্র সংগঠন ইউনেফ ও সরকারবিরোধী ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনের সমাবেশের আবেদন নাকচ করেছে কর্তৃপক্ষ। নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও শিক্ষকসংকট ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জরাজীর্ণ পরিবেশের প্রতিবাদে কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হবে বলে জানিয়েছে সংগঠনটি।
বিক্ষোভের অনুমতি সীমিত করায় সরকারের সমালোচনা করেছেন ফ্রান্সের অন্যতম বড় শ্রমিক সংগঠন সিএফডিটির সাধারণ সম্পাদক মেরিলিস লিওন। ফরাসি সম্প্রচারমাধ্যম টিএফ১-কে তিনি বলেছেন, ‘মানুষের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ রয়েছে। সেই ক্ষোভকে গুরুত্ব দেওয়া ও মানুষের কথা শোনা প্রয়োজন। কারা বৈধভাবে বিক্ষোভের আবেদন করতে পারবেন, তা নির্ধারণ করা রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নয়।’
এদিকে, অরলিয়েন্স শহরে কট্টর ডানপন্থী দল ন্যাশনাল র্যালির বার্ষিক সম্মেলন ঘিরেও সংঘর্ষের আশঙ্কা রয়েছে। তবে এ সম্মেলনের বিরুদ্ধে বামপন্থী ও বর্ণবাদবিরোধী গোষ্ঠীগুলো পাল্টা বিক্ষোভের ঘোষণা দিয়েছে। আগামী বছরের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সামনে রেখে সাম্প্রতিক সহিংসতা লে পেনের জনসমর্থন বাড়িয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। তিনি এ পরিস্থিতিকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ার প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেছেন।
নতুন করে সহিংসতার আশঙ্কায় প্যারিসের ল্যুভর ও মুজে দ’র্সেসহ বেশ কয়েকটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান শনিবার বন্ধ রাখা হয়েছে। প্যারিস সেন্ট জার্মেই (পিএসজি) ও অলিম্পিক লিওনাইসের মধ্যকার ফুটবল ম্যাচও রবিবার থেকে সোমবার পিছিয়েছে। গত সপ্তাহে প্রায় তিন হাজার দোকান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে লুটপাটের পর ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো দোকান বন্ধ রাখার আহ্বান জানিয়েছে।
ফ্রান্সের চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি অ্যালাইন ডি ক্রেসেনজো জানিয়েছেন, কিছু দোকানদার নিজেদের সম্পত্তি রক্ষায় বেসবল ব্যাট, লোহার শাবল ও শটগান প্রস্তুত রাখছেন। তবে তিনি তাদের সহিংসতায় না জড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। ইউরোপ ১ রেডিওকে তিনি বলেছেন, ‘এটা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। নিজেদের সম্পত্তি রক্ষা করতে গিয়ে সহিংসতায় জড়ানো তাদের কাজ নয়। এতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।’
বিক্ষোভ ও সহিংসতার কারণে ফ্রান্সের অর্থনীতি নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে সরকার ব্যর্থ হয়েছে; এমন আশঙ্কায় ঋণমান নির্ধারণকারী সংস্থা মুডি’স দেশটির ক্রেডিট রেটিং কমিয়ে দিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।