উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ নেতা কিম জং আন © সংগৃহীত
“মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণে মারা গেছেন উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ নেতা কিম জং আন” সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে এমন খবর। দাবি করা হয়, গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় চীনের বেইজিংয়ের একটি হাসপাতালে নিলে, সেখানেই মৃত্যু হয়েছে তার। তবে বিষয়টি গোপন রেখেছে উত্তর কোরিয়া সরকার। তবে এসব দাবির পক্ষে কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বরং এ ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে মেয়ের সঙ্গে কিমের একটি প্রদর্শনী পরিদর্শনের ছবি প্রকাশিত হয়। এতে প্রশ্ন উঠছে, বারবার কেন উত্তর কোরিয়ার এই নেতার মৃত্যুকে ঘিরে গুজব ছড়ায়?
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) বিবিসির প্রকাশিত এক বিশ্লেষণী প্রতিবেদন অনুযায়ী, উত্তর কোরিয়ার কঠোর তথ্যনিয়ন্ত্রণ, কিমের স্বাস্থ্য নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং ক্ষমতার উত্তরাধিকার নিয়ে প্রশ্ন বারবার এমন গুজব ছড়ানোর সুযোগ তৈরি করে। দেশটির অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া কঠিন হওয়ায় যাচাইহীন দাবিও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
গুজবের সূত্র কোথায়?
সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী এবং নিজেকে চীনা ডেমোক্রেটিক পার্টির পরিচয় দেওয়া ভিন্নমতাবলম্বী ওয়ানজুন শি নামের এক ব্যক্তি দাবি করেন, কিম গুরুতর মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণে আক্রান্ত হওয়ার পর বেইজিংয়ে নেওয়া হয়। পরে সেখানে তার মৃত্যু হয়। কিন্তু মরদেহ গোপনে উত্তর কোরিয়ায় ফিরিয়ে নেওয়া হয়। তবে এসব দাবির পক্ষে কোনো যাচাইযোগ্য প্রমাণ দেননি তিনি। এর আগে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মৃত্যু নিয়েও যাচাইহীন দাবি ছড়ানোর অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
এদিকে গুজব ছড়ানোর কয়েক ঘন্টা পরই উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদপত্র ‘রোদং সিনমুনে’ কিমের কয়েকটি ছবি প্রকাশিত হয়। ছবিতে তাকে মেয়ে কিম জু এ-কে নিয়ে পোশাক ও জুতার প্রদর্শনীতে ঘুরতে দেখা যায়। সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী রি সল জু এবং সরকারি কর্মকর্তারাও। তবে ছবিগুলো প্রকাশিত হলেও ঠিক কখন তোলা হয়েছিল, তা নিশ্চিত করা যায়নি। দেশটির গোয়েন্দা কর্মকর্তারাও দেশটির বার্তা সংস্থা ইয়োনহাপকে জানিয়েছেন, কিমের মৃত্যুর দাবির পক্ষে তাদের কাছে কোনো তথ্য নেই।
আগেও ছড়িয়েছে এমন গুজব
কিম জং আনকে ঘিরে এমন গুজব নতুন নয়। ২০২০ সালেও তার মৃত্যু নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছিল। সে সময় উত্তর কোরিয়ার এক সাবেক কূটনীতিক দাবি করেছিলেন, কিম শারীরিকভাবে গুরুতর অসুস্থ। আরেক উত্তর কোরীয় দলত্যাগী বলেছিলেন, হৃদযন্ত্রের অস্ত্রোপচারের পর কিম মারা গেছেন বলে তিনি ‘৯৯ শতাংশ নিশ্চিত’। কিন্তু ওই বছরের মে মাসে কিমকে একটি সার কারখানার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দেখা যায়। সেই ছবি ও ভিডিও প্রকাশের পরই অবসান ঘটে গুজবের।
বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ ধরনের ঘটনা বারবার ঘটার অন্যতম কারণ উত্তর কোরিয়ার গোপনীয় শাসনব্যবস্থা। দেশটির সর্বোচ্চ নেতার স্বাস্থ্য, চিকিৎসা কিংবা দৈনন্দিন কার্যক্রম সম্পর্কে স্বাধীনভাবে তথ্য সংগ্রহের সুযোগ খুবই সীমিত। ফলে কিমের কয়েক দিনের অনুপস্থিতিও নানা গুজবের জন্ম দিতে পারে।
উত্তরসূরি নিয়েও প্রশ্ন
কিমের মৃত্যুর গুজব গুরুত্ব পাওয়ার আরেকটি কারণ উত্তর কোরিয়ার ক্ষমতার উত্তরাধিকার নিয়ে অনিশ্চয়তা। তিন প্রজন্ম ধরে কিম পরিবার দেশটি শাসন করছে। তবে কিম জং আনের পর কে ক্ষমতায় আসবেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
কিমের দাদা কিম ইল সুং তার ছেলে (জং আনের বাবা) কিম জং ইলকে উত্তরসূরি হিসেবে প্রস্তুত করতে কয়েক দশক সময় নিয়েছিলেন। ১৯৯৪ সালে কিম ইল সুংয়ের মৃত্যুর সময় উত্তরাধিকার পরিকল্পনা নির্ধারিত ছিল। পরে কিম জং ইল তার ছেলে কিম জং আনকে ক্ষমতার জন্য প্রস্তুত করেন। ২০১১ সালে বাবার মৃত্যুর পর ক্ষমতায় আসেন কিম জং আন।
বর্তমানে কিমের মেয়ে কিম জু এ-কে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান ও সামরিক আয়োজনে দেখা যাচ্ছে। দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়েন্দা সংস্থার মূল্যায়নে, তাকে সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে প্রস্তুত করা হতে পারে। তবে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে উত্তরসূরি ঘোষণা করা হয়নি। তার বয়সও কম। তা ছাড়া উত্তর কোরিয়ার নেতৃত্বে এর আগে কোনো নারী আসেননি। ফলে ভবিষ্যতে ক্ষমতা হস্তান্তর কীভাবে হবে, তা নিয়ে রয়েছে অনিশ্চয়তা।
কিমের স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ কেন?
কিমের শারীরিক অবস্থা নিয়েও দীর্ঘদিনের আলোচনা রয়েছে। তিনি অতিরিক্ত ওজনের অধিকারী এবং ধূমপান করেন। দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়েন্দা সংস্থাও তার হৃদরোগের ঝুঁকির বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়েছিল। তার পরিবারের সদস্যদের মধ্যেও হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ইতিহাস রয়েছে।তবে এসব তথ্য তার মৃত্যুর গুজবের সত্যতা প্রমাণ করে না। বরং তাঁর স্বাস্থ্য সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্যের ঘাটতিই নানা দাবির সুযোগ তৈরি করে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও উত্তর কোরিয়ার অভ্যন্তরীণ তথ্য সংগ্রহে নানা সীমাবদ্ধতার মুখে পড়ে।
কিমের মৃত্যু হলে কী প্রভাব পড়তে পারে?
ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, কিম জং আনের আকস্মিক মৃত্যু হলে উত্তর কোরিয়ার রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ এবং দেশটির পারমাণবিক অস্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন দেখা দিতে পারে। উত্তরাধিকার নিয়ে দ্বন্দ্ব তৈরি হলে আঞ্চলিক নিরাপত্তার ওপরও প্রভাব পড়তে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে চীন সীমান্তে সম্ভাব্য শরণার্থী প্রবাহ, উত্তর কোরিয়ার অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় মোতায়েন যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ২৮ হাজার সেনার নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হতে পারে। ফলে কিমের স্বাস্থ্য ও নেতৃত্বের পরিস্থিতি শুধু উত্তর কোরিয়ার জন্য নয়, প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্লেষকদের মতে, উত্তর কোরিয়ার তথ্যের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণের কারণে এসব গুজব পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা কম। দেশটির সর্বোচ্চ নেতার কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগ রয়েছে অল্প কয়েকজনেরই। এমনকি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছেও সব সময় নিশ্চিত তথ্য থাকে না।
সাম্প্রতিক মৃত্যুর দাবির পক্ষে কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ না থাকায় এটিকে সত্য হিসেবে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। তবে উত্তর কোরিয়ার গোপনীয়তা, কিমের স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ এবং ক্ষমতার উত্তরাধিকার নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণেই তার মৃত্যুর গুজব বারবার ফিরে আসে।