মধ্য আমেরিকার দেশ পানামায় শক্তিশালী ভূমিকম্প © সংগৃহীত
মধ্য আমেরিকার দেশ পানামায় ৭ দশমিক ৭ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। এতে দেশটির বিভিন্ন এলাকায় ভবন ও স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কয়েকটি শহরে ভবনের অংশবিশেষ ও স্থাপনা ধসে পড়ার দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে। ভূমিকম্পের পর আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে রাজধানী পানামা সিটিসহ বিভিন্ন এলাকায়। নিরাপত্তার জন্য ভবন ছেড়ে রাস্তায় ও পার্কে আশ্রয় নেন বহু মানুষ। এদিকে ভূমিকম্পের পর সুনামি সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
তবে এখন পর্যন্ত ভূমিকম্পে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলোতে কেউ আটকা পড়েছেন কি না, তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, ভূমিকম্পের কম্পন প্রায় ৪৬ লাখ মানুষ অনুভব করেছেন। সংস্থাটির মূল্যায়ন অনুযায়ী, বিস্তৃত অঞ্চলে এ ভূমিকম্পের প্রভাব পড়েছে। ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ভূপৃষ্ঠের তুলনামূলক অল্প গভীরে হওয়ায় ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় সময় শুক্রবার বেলা ৩টার কিছু আগে ভূমিকম্পটি আঘাত হানে। বাংলাদেশ সময় তখন শনিবার রাত প্রায় ৩টা। ইউএসজিএসের তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ-মধ্য পানামার পিতালোজা আরিবা এলাকার কাছে প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলে ভূমিকম্পটির উৎপত্তি হয়। এর কেন্দ্র ছিল ওই এলাকার প্রায় ১০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে। ভূপৃষ্ঠ থেকে মাত্র ১২ কিলোমিটার গভীরে ছিল এর কেন্দ্র।
ভূমিকম্পের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিওতে পানামার একাধিক শহরে স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার চিত্র উঠে এসেছে। পেনোনোমে ও সোনাসহ কয়েকটি এলাকায় ভবন ধসে পড়ার দৃশ্য দেখা গেছে। কোথাও ভবনের অংশবিশেষ ভেঙে পড়েছে। আবার কোথাও স্থাপনার বড় অংশ ধসে গেছে।
বার্তা সংস্থা এপি জানিয়েছে, পেনোনোমে শহরে একটি ঐতিহাসিক ভবনের চূড়া ধসে পড়েছে। একই শহরের একটি আবাসিক ভবনের কয়েকটি বারান্দাও ভেঙে পড়েছে। শহরটি ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ও রাজধানী পানামা সিটির মাঝামাঝি এলাকায় অবস্থিত।
যাচাই করা একটি ভিডিওতে পেনোনোমের একটি গির্জার এক পাশ ও এর একটি চূড়া ভেঙে পড়ার দৃশ্য দেখা গেছে। অন্য একটি ভিডিওতে স্থানীয় একটি হোটেল প্রায় পুরোপুরি ধসে পড়তে দেখা যায়। এসব ঘটনায় ভবনের ভেতরে কেউ আটকা পড়েছেন কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
আরেকটি ভিডিওতে ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপের নিচে কেউ আটকে থাকতে পারেন—এমন আশঙ্কায় এক ব্যক্তিকে ডাকাডাকি করতে দেখা যায়। তবে ওই ঘটনায় কেউ আটকা পড়েছিলেন কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
ভূমিকম্পে দেশজুড়ে মোট কতটি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ কত, তা তাৎক্ষণিকভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর পরিস্থিতি মূল্যায়ন এবং ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র নিরূপণ এখন জরুরি হয়ে উঠেছে।
ভূমিকম্পের কম্পন অনুভূত হয়েছে রাজধানী পানামা সিটিতেও। উৎপত্তিস্থল থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার দূরের এই শহরের বিভিন্ন ভবন কেঁপে ওঠে। আতঙ্কিত বাসিন্দারা ভবন ছেড়ে রাস্তায় বেরিয়ে আসেন। কম্পন থামার পরও অনেকে ভবনে ফিরে না গিয়ে রাস্তায় ও আশপাশের পার্কে অবস্থান করেন।
ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হেরেরা প্রদেশের বাসিন্দা ৬০ বছর বয়সী রোসেন্দো ডোমিঙ্গেজ বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে (এপি) ফোনে বলেন, ‘আমরা খুব শক্তিশালী কম্পন অনুভব করেছি। রান্নাঘরের জিনিসপত্র পড়ে গেছে। তবে আমরা ঠিক আছি। যদিও আমরা খুবই আতঙ্কিত।’
তিনি আরও বলেন, ‘সবাই ভয়ে বাইরে অবস্থান করছে।’
দক্ষিণাঞ্চলীয় হেরেরা প্রদেশের লাস মিনাস এলাকার বাসিন্দা রিকার্ডো ব্রাউন বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, ভূমিকম্পে তার প্রতিবেশীদের বেশ কয়েকটি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক বাড়িতে ফাটল দেখা দেওয়ায় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ৭৪ বছর বয়সী ব্রাউন নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, ‘আমরা আতঙ্কিত। এখানে আমরা দুজন বয়স্ক মানুষ থাকি। বাড়িতে ফাটল ধরেছে। ভয় হচ্ছে, এটি আমাদের ওপর ধসে পড়তে পারে।’
তার বক্তব্যে ভূমিকম্পের পর ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িতে বসবাসকারীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে পুরোনো ও দুর্বল ভবনে ফাটল দেখা দেওয়ায় সেগুলোতে বসবাস ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বাসিন্দারা।
ভূমিকম্পের পর সুনামি সতর্কতা জারি করা হয়েছে। চিলির নৌবাহিনীর হাইড্রোগ্রাফিক ও সমুদ্রবিজ্ঞান পরিষদও এ সতর্কতা জারি করে। তবে সতর্কতার আওতাভুক্ত এলাকা এবং সম্ভাব্য সুনামির প্রভাব সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। ভূমিকম্পের পর পানামার শিক্ষা মন্ত্রণালয় দেশটির স্কুলগুলো বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে। অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট হোসে রাউল মুলিনো জনগণকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘যা ঘটেছে, তা আতঙ্ক বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির জন্য ব্যবহার করা উচিত নয়।’
চলতি বছর মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চলে একাধিক ধ্বংসাত্মক ভূমিকম্প হয়েছে। জুনে ভেনেজুয়েলার উত্তরাঞ্চলে পরপর দুটি ভূমিকম্প আঘাত হানে। এতে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ঘটে এবং অন্তত ৬ হাজার ৫০০ মানুষ নিহত হন। এর আগে আগস্টে কলম্বিয়ায় ৭ দশমিক ৪ মাত্রার একটি ভূমিকম্প আঘাত হানে। এতে অন্তত ২৮৯ জনের মৃত্যু হয়।
পানামার সাম্প্রতিক ভূমিকম্পের পর ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর প্রকৃত পরিস্থিতি ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণের কাজ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে ভবনগুলোতে ফাটল ও ধসের ঝুঁকি থাকায় বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। সূত্র: বিবিসি, রয়টার্স ও এপি।