কোলাজ ছবি © টিডিসি ফটো
সাদা কাশফুল, নীল আকাশ আর সাদা মেঘে শরৎ সাজে আপন রূপে। চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে রোদের ঝলমলে আলো, প্রকৃতিতে আসে উৎসবের আমেজ। অথচ ক্যাম্পাস জীবনে এমন সৌন্দর্য উপভোগের অবসর কই! ক্লাস, পরীক্ষা, অ্যাসাইনমেন্ট আর ল্যাবের ব্যস্ততায় ছুটে চলতে হয় প্রতিনিয়ত। এরই মাঝে শরতের ছুটি যেন একটুখানি অবকাশের, নিজের মতো করে নিশ্বাস নেওয়ার। কেউ ফিরেছেন পরিবারের কাছে, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরেছেন, আবার কেউ ক্যাম্পাসেই নিভৃতে কাটিয়েছেন নিজের মতো কিছু সময়। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছে শরতের এই ছুটি কেবল অবকাশ নয়, বরং ব্যস্ত জীবনের ফাঁকে জমিয়ে রাখা কিছু আনন্দের মুহূর্ত। ছুটির দিনগুলো কীভাবে কাটালেন তারা, সেই গল্পই জানিয়েছেন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে।
‘পরিবারের সাথে শরতের আমেজ’
ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী মাঈনুদ্দিন হাসান রিয়াদ বলেন, শরৎকালের আকাশে মেঘের ভেলা আর চারপাশের মৃদু বাতাসের মাঝে বিশ্ববিদ্যালয়ে বাজল ছুটির ঘণ্টা। ছুটির কদিন আগে ফোনটি কেটে দেওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে আম্মুকে বললাম, এই সপ্তাহের শেষের দিকে হয়তো বাড়ি যাচ্ছি। প্রথমে অবশ্য বাড়ি যাওয়ার তেমন তীব্র ইচ্ছা ছিল না। কিন্তু এ কথা শোনার পর আম্মুর মুখে যে খুশির ঝিলিক আর অভিব্যক্তি ফুটে উঠেছিল, তা দেখার পর বাড়ি যাওয়ার আগ্রহ কয়েক গুণ বেড়ে গেল। মনে হলো, যতই ব্যস্ততা থাকুক না কেন, বাড়ি যাওয়াটা জরুরি। অতএব শত ব্যস্ততাকে পেছনে ফেলে অবশেষে ব্যাগ গুছিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলাম।
গ্রামে ঢুকতেই একটা বড় কবরস্থান আছে। চোখে পড়ল কবরস্থানে নতুন কবর, মনে এক চিলতে বিষাদ/বিষণ্ণতা ভর করল। বাড়ি ফিরে পরিবারের সাথে চমৎকার সময় কাটল। এরপর প্রতিদিন মায়ের হাতের রান্না খাওয়া, বন্ধুদের নিয়ে শরতের আবহাওয়ায় আর ধানখেতের রূপ উপভোগ করা—সব মিলিয়ে ছুটিটা দারুণ কেটেছে। এর ফাঁকে 'দার-এ-নিজাত' নাটকের খোঁজও পেলাম। আগ্রহ থেকে দেখাও শুরু করলাম। পড়ালেখা বাদে ছুটির দিনগুলো একেবারে পরিপূর্ণতায় কাটল।
‘প্রত্যাশার মাঝে অপ্রত্যাশিত শরৎ’
দর্শন বিভাগের শিক্ষার্থী খাদিজা আফরিন মিতু বলেন, শরতের ছুটিতে সবাই যখন বাসায় মায়ের হাতের রান্না স্বাদ নিতে ব্যস্ত ভিন্ন চিত্র আমার জীবনে। ছুটিতে পুরোটা সময় জুড়ে ছিলাম মায়ের সাথে, মায়ের আদর পেতে নয় অসুস্থ মায়ের সুস্থতা কামনায়। মায়ের দীর্ঘদিনের অসুস্থতা এখন যেনো প্রকট হয়ে উঠেছে তাই ছুটছি শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। ডাক্তার দেখানো আর রোগ পরীক্ষার মাঝে ভুলেই গিয়েছি যান্ত্রিক এই শহরের নানা প্রান্তে ফুটেছে শুভ্র কাশফুল।
ঢাকার রাস্তায় জ্যামে বসে বৈচিত্র্যপূর্ণ মানুষের জীবন পর্যবেক্ষণ করা, চমৎকার কিছু মানুষদের সাথে সাক্ষাৎ এবং দিনশেষে পোষা প্রাণীদের সাথে নিবিড় কথোপকথন দিনগুলোকে হয়ত অন্যরকম করে। কিন্তু যতই চাকচিক্য আর মোহমায়া কাজ করুক পরিবারের সকলের সুস্থতা মনে অন্যরকম প্রশান্তি দেয়। এরমাঝে হাসপাতালে মায়ের পাশে বসেও মনে পড়ে, চিরসবুজ ক্যাম্পাসে ফিরে যাওয়ার সময় হয়েছে আবার বই খাতার গোল টেবিলে বসতে হবে।
‘ব্যস্ততার ভাঁজে শরতের স্নিগ্ধ স্মৃতি’
আরবি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের শিক্ষার্থী নাঈম উদ্দীন আদীব বলেন, চাকসুর মেয়াদ শেষের দিকে ছিল তাই টিউশন আর হল সংসদের নানামুখী ব্যস্ততা শরতের ছুটিতে ডানা মেলতে দেয়নি। আমার শরতের স্নিগ্ধ সকালগুলো মোহাবিষ্টের মতো কেটে যেতে লাগল কর্মব্যস্ততার ঘোরে। এই দিনগুলোতে নিরলস শ্রম ঢেলে দিয়েছি নিজের স্বপ্নের হল সোহরাওয়ার্দীকে মনের মতো করে সাজিয়ে তোলার প্রত্যয়ে। প্রতিটি আয়োজনের ভাঁজে ভাঁজে মিশিয়ে দিতে চেয়েছি স্বপ্ন, ভালোবাসা আর নান্দনিকতার ছোঁয়া। নিজের প্রকাশিত ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদেও ফুটিয়ে তুলেছি শরতের চিরচেনা সৌন্দর্য—কাশফুলের শুভ্রতা আর ঝকঝকে নীলাকাশের মায়াবী আলপনা।
দিনান্তে শরতের প্রকৃতি মনকে স্নিগ্ধতার আবেশে ভরে তোলে, আর কর্মব্যস্ততার প্রতিটি ক্ষণ সময়ের ক্যানভাসে এঁকে যায় স্মৃতির অনিন্দ্য সুন্দর সব ছবি। প্রকৃতির মুগ্ধতা আর কর্মমুখর জীবনের আনন্দ—এই দুইয়ের মেলবন্ধনে এবারের শরৎ হয়ে রইল এক অনন্য প্রাপ্তি, এক টুকরো স্নিগ্ধ স্মৃতি; যা হয়তো বহুদিন পরেও মনের নিভৃত কোণে ফিরিয়ে আনবে এই দিনগুলোর মায়াময় সুবাস।
‘নিঃসঙ্গ ক্যাম্পাসে শরতের দিনগুলো’
সমাজতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থী নুসরাত সুলতানা বলেন, স্নাতক শেষ করে যখন স্নাতকোত্তরে পা দিলাম ছুটি কাটানোর জন্য বাড়ি যাওয়ার চেয়ে সফল হয়ে বাড়ি ফেরাটা বেশি জরুরি হয়ে গেলো। বাড়ি ফিরে আরামের বদলে নিঃসঙ্গ ক্যাম্পাসে খুঁজতে থাকলাম সফলতার দ্বার। বাড়ি থেকে কল দিলেই বলতো- মা’রে সবাই তো বাড়ি আসছে তুই আসবি না? উত্তর একটাই - বাড়ি গেলে পড়া হয় না। এরমধ্যে একদিন মা আসলেন বাড়ি থেকে আমার জন্য খাবার নিয়ে। যতই হোক মায়ের মন, মেয়েকে না দেখে থাকতে পারে না। মা চলে যাওয়ার পর মনে হল আসলে একা হয়ে গেছি, বাড়ি যাওয়া উচিত ছিল। তারপর নিজেকে আবার বুঝাতে লাগলাম এই ছুটিতে কষ্ট করি আর তো ১টা বছর। আসলে জীবন অনেক অদ্ভুত যে ছুটি একজনের কাছে আনন্দের, সেই ছুটি কারো স্বপ্ন বুননের সময়। নীরব ক্যাম্পাসে কখনও তাই গোধূলির আকাশে দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলি কবি আসলে ঠিকই বলেন- সবার শেষ ট্রেনে বাড়ি ফেরা হয় না।
‘নীরব ক্যাম্পাসের ভিন্ন চিত্র’
ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী সায়েম ফাতেহ বলেন, শরৎকালীন ছুটি মানেই বাড়ি ফেরার আনন্দ, স্বজনদের সান্নিধ্য আর ব্যস্ত জীবনে একটুখানি অবকাশ। অথচ এবারের ছুটিতে আমার বাড়ি ফেরা হয়নি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসেই কেটেছে ছুটির দিনগুলো—বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, খোঁজখবর আর সাহিত্যের পাতায় ডুব দিয়ে। তবে এক রাতে ঘটে যাওয়া ছোট্ট একটি কথোপকথন ছুটিকে দেখিয়েছে অন্য এক আলো।
ক্যাম্পাসের এক নিরাপত্তাকর্মীর কাছে জানতে চাইলাম, ছুটি কেমন কাটছে মামা? জানালেন, তাঁরও ইচ্ছে ছিল বাড়ি ফেরার, পরিবারের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটানোর। কিন্তু শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার জন্য থাকতে হচ্ছে ক্যাম্পাসে। কথাগুলো শুনে মনে হলো, ছুটি সবার জীবনে সমানভাবে আসে না।
ছুটি শেষে ক্যাম্পাস আবার সরব হবে। আমরা ফিরব পড়াশোনা আর ব্যস্ততায়। কিন্তু যারা নীরবে আমাদের নিরাপত্তা আগলে রাখেন, তাদের কথা কি মনে রাখব?
হয়তো একটি সালাম, একটুখানি আন্তরিক খোঁজখবর তাদের ক্লান্ত দিনে এনে দিতে পারে প্রশান্তি। তাই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ পাক আমাদের আচরণেও।