চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও ভাইভা কার্ড © সংগৃহীত ও সম্পাদিত
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) শিক্ষক নিয়োগের পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য নির্ধারিত তারিখের ৮ দিন পর এক প্রার্থীর হাতে পরীক্ষায় অংশগ্রহণের চিঠি পৌঁছানোর অভিযোগ উঠেছে। এতে নির্ধারিত সময়ে পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন বলে দাবি ওই প্রার্থীর।
জানা যায়, ইন্টারভিউয়ের চিঠি ২৪ সেপ্টেম্বর ইস্যু হলেও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ডাক অফিসে বুকিং হয় ২৭ সেপ্টেম্বর রাত ৮ টা ৪৯ মিনিটে। এর আরো একদিন পর তথা ২৮ সেপ্টেম্বর চিঠি ইস্যুর চারদিনের মাথায় প্রার্থীর ঠিকানায় পাঠানো হয়। বিভিন্ন গন্তব্য পেরিয়ে ৩০ সেপ্টেম্বর ইন্টারভিউয়ের মাত্র ১২ ঘন্টা আগে কয়েকজন প্রার্থীর হাতে চিঠি পৌঁছায়। অনেকের চিঠি যায় আরও পরে, কেউ পান ৮ দিন পর।
সম্প্রতি শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নিতে না পারা এবং এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রক্রিয়াগত গাফিলতির অভিযোগ তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন ৮দিন পর চিঠি পাওয়া ভুক্তভোগীসহ আরো একাধিক প্রার্থী।
গত ১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের শিক্ষক নিয়োগের পরীক্ষাকে কেন্দ্র এসব ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস বেশ কয়েকজন প্রার্থীর সাথে কথা বলেছে। জানা গেছে, তাদের মধ্যে কেউ কেউ সময় মতো চিঠি পেয়ে পরীক্ষা দিতে পেরেছেন। তবে একটি বড় অংশ পরীক্ষা দিতে পারেননি। আবেদনকারী ৩৩ প্রার্থীর মধ্যে পরীক্ষায় অংশ নেন ১২ জন। বাকি ২১ জনই অংশগ্রহণ করতে পারেননি। শিক্ষক নিয়োগের মতো গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় অংশ নিতে না পারা প্রার্থীরা দাবি করে বলেন, হয় এটি ইচ্ছাকৃতভাবে প্রার্থী কমানোর জন্য করা হয়েছে নয়তো দাপ্তরিক অযোগ্যতা ও জটিলতায় বিষয়টি ঘটেছে।
কেন ১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত নিয়োগ পরীক্ষার চিঠি মাত্র দুদিন আগে তথা ২৮ সেপ্টেম্বর পাঠাল প্রশাসন? রেজিস্ট্রার ভবন প্রশাসন সংশ্লিষ্ট উচ্চ পর্যায়ের একটি সূত্র দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের কাছে দাবি করেছে, ‘পছন্দের এক প্রার্থীকে নিয়োগের সুযোগ করে দেওয়া এবং অন্য প্রার্থীদের প্রতিযোগিতা থেকে ছেঁটে ফেলতেই এমন সময়ে চিঠি পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’ তবে এ অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি।
নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অধ্যয়ন সম্পন্ন করা এক ভুক্তভোগী প্রার্থী তার নাম প্রকাশ না করার শর্তে গতকাল রাতে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে করেন, চলতি মাসের ১ অক্টোবর সকাল ১০টায় শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য আমন্ত্রণপত্র বা চিঠি হাতে পান ৯ অক্টোবর অর্থাৎ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়ে যাওয়ার ৮ দিন পর। ফলে নির্ধারিত সময়ে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া তার পক্ষে সম্ভব হয়নি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও প্রার্থী হাসানুল কে পারভেজ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেন, গত বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর ২০২৬) দুপুর ২টায় আমি সংযুক্ত আমন্ত্রণপত্রটি হাতে পাই। অথচ নিয়োগ পরীক্ষা নির্ধারিত ছিল ওই দিন সকাল ১০টায়। দেশের শীর্ষস্থানীয় একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছ থেকে এমন পেশাদারত্ব দেখে আমি বিস্মিত হয়েছি। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের যেন এ নিয়ে কোনো মাথাব্যথাই নেই যে চিঠিটি আদৌ যথাসময়ে প্রাপকের কাছে পৌঁছেছে কি না।
তিনি আরও লিখেন, মজার বিষয় হলো, চিঠিটিতে স্বাক্ষর করা হয়েছিল ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে। কোনো আশা না রেখেই আমি বিভিন্নভাবে ফোনে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু যোগাযোগ করতে ব্যর্থ হই। তখন বুঝতে পারলাম, রেজিস্ট্রার দপ্তর নিশ্চয়ই ফোনের পরিবর্তে বার্তাবাহক কবুতরের ওপর নির্ভর করে!
আরেক প্রার্থী নাম অপ্রকাশ রাখার শর্তে গতকাল রাতে মুঠোফোনে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ফেসবুকে একজনের পোস্টের মাধ্যমে জানতে পারলাম, গত ১ অক্টোবর (বৃহস্পতিবার) চবির মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের প্রভাষক পদে নিয়োগের ভাইভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিষয়টি জানার পর বাসার দারোয়ান মামাকে জিজ্ঞেস করলাম, আমার নামে কোনো চিঠি এসেছে কি না। উত্তর পেলাম, না, আসেনি। পুরো বিষয়টি কারও কাছে ইচ্ছাকৃত গাফিলতি, আবার কারও কাছে রেজিস্ট্রার ভবনের দাপ্তরিক জটিলতা।
তিনি আরও বলেন, কিন্তু প্রশ্ন হলো, নিয়োগের আবেদনপত্রে প্রার্থীরা যেখানে ইমেইল ঠিকানা, মোবাইল নম্বর, পরিচিত দুই-তিনজনের রেফারেন্সসহ প্রয়োজনীয় সব তথ্য দেন, সেখানে পরীক্ষার তারিখ ও সময় জানাতে শুধু ডাকযোগে চিঠির ওপর নির্ভর করতে হবে কেন? জানি না, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনগুলো এখনো কেন মান্ধাতার আমলের যোগাযোগব্যবস্থায় আটকে আছে! চিঠি পাঠানো অবশ্যই আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার অংশ, কিন্তু পাশাপাশি প্রার্থীকে একটি ফোনকল, খুদে বার্তা কিংবা ইমেইল দিয়ে জানালে ক্ষতি কী? বরং এতে প্রার্থীরা যথাসময়ে অবহিত হতেন, অনাকাঙ্ক্ষিত বিড়ম্বনা এড়ানো যেত এবং নিয়োগপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি আরও নিশ্চিত হতো।
ইন্টারভিউয়ের চিঠি ২৪ সেপ্টেম্বর ইস্যু হলেও চবি ডাক অফিসে বুকিং হয় ২৭ সেপ্টেম্বর রাত ৮ টা ৪৯ মিনিটে। এর আরো একদিন পর ২৮ সেপ্টেম্বর চিঠি ইস্যুর চারদিনের মাথায় প্রার্থীর ঠিকানায় পাঠানো হয়। বিভিন্ন গন্তব্য পেরিয়ে ৩০ সেপ্টেম্বর ইন্টারভিউয়ের মাত্র ১২ ঘন্টা আগে প্রার্থীর হাতে পৌঁছায়। অনেকের চিঠি আরো পরে পৌঁছায়, কেউ পান ৮ দিন পর।
তবে সময় মতো চিঠি বা আমন্ত্রণ পত্র প্রেরণের বিষয়টি রেজিস্ট্রার দপ্তরের ব্যর্থতা নয় বলে দাবি করেছেন চবি রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) হাসান মিয়া। তিনি বলেন, আমরা চিঠিগুলো ডাকযোগে পাঠিয়েছি কিন্তু সেগুলো সার্ফ করতে ডাক বিভাগ বিলম্ব করেছে।
তবে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের মতো গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় একাধিক প্রার্থীর কাছে ডাকযোগে পাঠানো চিঠির বারকোড স্ক্যান করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তথা রেজিস্টার দপ্তরের গাফিলতির প্রমাণ মিলেছে। ইন্টারভিউয়ের চিঠি ২৪ সেপ্টেম্বর ইস্যু করা হলেও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ডাক অফিসে বুকিং দেওয়া হয় ২৭ সেপ্টেম্বর রাত ৮ টা ৪৯ মিনিটে। এর আরো একদিন পর গিয়ে ২৮ সেপ্টেম্বর চিঠি ইস্যুর চারদিনের মাথায় প্রার্থীর ঠিকানায় পাঠানো হয়। বিভিন্ন গন্তব্য পেরিয়ে ৩০ সেপ্টেম্বর ইন্টারভিউয়ের মাত্র ১২ ঘন্টা আগে প্রার্থীর হাতে পৌঁছায়। কারো কারো কাছে চিঠি আরো পরে পৌঁছায়, আবার কেউ পেয়েছেন ৮দিন পর। এদিকে চিঠিতে লেখা আছে প্রার্থী যদি বর্তমান কর্মস্থলে কর্মরত থাকেন তাহলে সেখানের অনাপত্তিপত্র ছাড়া পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ নেই।
এখন প্রার্থীদের অভিযোগ, এই অল্প সময়ে তারা কীভাবে অনাপত্তিপত্র নেবেন। যেখানে তিনি জানতেই পারছেন না, তার শিক্ষক নিয়োগের পরীক্ষাটি কবে-কখন অনুষ্ঠিত হতে চলেছে।
একাধিক প্রার্থীর দাবি, নিয়োগের আবেদন করতে তাকে ১ হাজার টাকা ফি গুণতে হয়েছে। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ ও প্রিন্টিংয়ের পেছনেও কয়েক হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। এতো অর্থ ও সময় ব্যয় করে আবেদন করেও অংশগ্রহণের সুযোগ না পাওয়ায় হতাশ তারা। তারা আরো বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়ায় আবেদন গ্রহণ থেকে শুরু করে পরীক্ষার তারিখ জানানো এবং প্রার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে কার্যকর সমন্বয় থাকা প্রয়োজন। বিশেষ করে আবেদনপত্রে প্রার্থীদের সচল ফোন নম্বর ও ইমেইল ঠিকানা থাকার পরও কেন নির্ধারিত সময়ের আগে তাদের কাছে পরীক্ষার চিঠি পৌঁছাল না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করেন ভুক্তভোগী ওই প্রার্থীরা।
আজ রবিবার (১১ অক্টোবর) বেলা ১০টায় চবির রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) হাসান মিয়ার কার্যালয়ে উপস্থিত হয়ে বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘প্রার্থীদের অনেককে ফোন করলে তারা বলে টাকা চাইছি, তাই আমি ব্যক্তিগতভাবে কাউকে ফোন করি না। আর তাছাড়া এটি আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মের ভেতরে ছিল না, তাই ওই প্রক্রিয়াতে আমরা যাইনি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা যখনই পত্র পেয়েছি, তখনই ডাক বিভাগে পাঠিয়ে দিয়েছি। তখন হয়তো এটি কি তারা পাবে, না-কি পাবে না, আমাদের এমন আশঙ্কা কাজ করেনি। এটা দুঃখজনকভাবে হয়ে গেছে। ‘এক্সিডেন্টলি হয়ে গেছে’ বিধায় দুঃখ প্রকাশ করা ছাড়া এখন আর কি করার আছে। এজন্য আমরা দুঃখিত।’
তিনি আরও বলেন, ‘এ ঘটনা দেখার পর ভিসি স্যার অর্ডার দিয়েছেন যে, এখন থেকে তারিখ হওয়ার পর তাদের ইমেইলে জিনিসটা জানিয়ে দেওয়ার জন্য। বিষয়টি এখন থেকে অনুসরণ করার চেষ্টা করছি।’