অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান মামুন © সংগৃহীত
শিক্ষক দিবস উপলক্ষে ১০১ জন শিক্ষককে পুরস্কৃত করার উদ্যোগের প্রশংসা করলেও পুরস্কার নির্বাচনের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান মামুন। তার অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ ক্যাটাগরিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যে ১০ শিক্ষক পুরস্কার পেয়েছেন, তারা সবাই সাদা দলীয় বিএনপিপন্থী। এমনকি ওই ১০ জনের মধ্যে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের একজন শিক্ষকও নেই বলেও দাবি করেছেন তিনি।
সোমবার (৫ অক্টোবর) নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে এসব কথা লেখেন অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান মামুন।
স্ট্যাটাসে অধ্যাপক মামুন লেখেন, শিক্ষক দিবস উপলক্ষে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০১ জন শিক্ষককে পুরস্কৃত করার উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। একজন শিক্ষকের দীর্ঘদিনের পরিশ্রম, মেধা, সততা ও শিক্ষার্থীদের প্রতি অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে এমন পুরস্কারের বিশেষ মর্যাদা থাকা উচিত। কিন্তু সেই মর্যাদা তখনই অটুট থাকে, যখন পুরস্কার নির্বাচনের প্রক্রিয়া হয় স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ, বহুত্ববাদী ও যোগ্যতাভিত্তিক।
তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে যারা পাবেন তাদের নামের লিস্ট দেখলাম। যারা পেলেন তাদের মধ্যে সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাটাগরি থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০ জন শিক্ষক এই পুরস্কার পেলেন। যারা পেলেন তারা সবাই সাদা দলীয় বিএনপি পন্থী। শুধু তাই না। ১০ জনের মধ্যে সংখ্যা লঘুদের মধ্যে থেকে একজনও নাই। পুরস্কারপ্রাপ্তদের রাজনৈতিক পরিচয় যদি একই বলয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে এবং ভিন্নমত, সংখ্যালঘু সম্প্রদায় কিংবা দলনিরপেক্ষ যোগ্য শিক্ষকরা যদি ধারাবাহিকভাবে উপেক্ষিত হন, তাহলে এই পুরস্কারের নিরপেক্ষতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক। কোনো পুরস্কার যদি যোগ্যতার বদলে রাজনৈতিক আনুগত্যের প্রতিফলন বলে মনে হয়, তবে তা পুরস্কারপ্রাপ্তদের সম্মান বাড়ায় না; বরং পুরস্কারটির মর্যাদাকেই ক্ষুণ্ন করে।
ঢাবি অধ্যাপক মামুন লেখেন, যোগ্য ও নিষ্ঠাবান শিক্ষক খোরশেদ আহমেদ কবির স্যারের মতো ব্যক্তিত্বদের নাম যদি এমন স্বীকৃতির তালিকায় না থাকে, তাহলে নির্বাচনের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। তাকে পুরস্কৃত করা হলে এই স্বীকৃতির গ্রহণযোগ্যতা ও মর্যাদা আরও বৃদ্ধি পেত—এমন মত অনেকেরই থাকতে পারে। তবে মূল কথা ব্যক্তি নয়; মূল কথা হলো এমন একটি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে কোনো শিক্ষককে তার রাজনৈতিক পরিচয়, মতাদর্শ, ধর্মীয় পরিচয় বা ব্যক্তিগত সম্পর্ক দিয়ে নয়, তার গবেষণা, পাঠদান, শিক্ষার্থীদের গড়ে তোলা, প্রাতিষ্ঠানিক অবদান এবং নৈতিক সততার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হবে। আজ যদি আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় থাকতো দেখতেন সবাই হতো আওয়ামী পন্থী নীল দলের শিক্ষক। আর যদি কল্পনা করেন যে জামায়াত ক্ষমতায় তখন কি জানি নতুন একটা গ্রুপ হয়েছে নাম "ইউনিভার্সিটি শিক্ষক লিংক"! দেখতেন তারাই পেত অথবা তাদের মতাদর্শের শিক্ষকরাই পেত।
তিনি আরও বলেন, দুঃখজনকভাবে, আমাদের দেশে ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে পুরস্কারের তালিকাও অনেক সময় বদলে যায়। এক সময় নীল দলের শিক্ষকরা অগ্রাধিকার পান, অন্য সময় সাদা দলের শিক্ষকরা; ভবিষ্যতে অন্য কোনো রাজনৈতিক গোষ্ঠী ক্ষমতায় এলে তার ঘনিষ্ঠরাই হয়তো পুরস্কারের প্রধান দাবিদার হয়ে উঠবেন। এভাবে চলতে থাকলে পুরস্কার আর গৌরবের প্রতীক থাকে না; তা পরিণত হয় ক্ষমতাসীনদের অনুগ্রহের স্মারকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার অর্থ কোনো দলের রং ধারণ করা নয়। একজন প্রকৃত শিক্ষককে দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে সমগ্র আকাশের দিকে তাকাতে হয়। তাঁর আনুগত্য হওয়া উচিত সত্য, যুক্তি, জ্ঞান, ন্যায় এবং মানবিকতার প্রতি। কিন্তু যখন শিক্ষকরা নিজেদের যোগ্যতা ও কাজের মাধ্যমে স্বীকৃতি অর্জনের বদলে দলীয় পরিচয়, আনুগত্য ও তোষামোদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন, তখন তাঁরা শুধু নিজেদেরই ছোট করেন না—প্রতিষ্ঠানকেও ছোট করেন এবং শিক্ষার্থীদের সামনে একটি বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।