প্রেস ব্রিফিং © টিডিসি ফটো
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) শেখ মুজিবুর রহমান হলসহ বিভিন্ন স্থাপনার পুরোনো নাম পুনর্বহালের উদ্যোগের প্রতিবাদ জানিয়েছে হল সংসদ ও ডাকসুর একাংশ। শিক্ষার্থীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে হলটির নাম পরিবর্তনের প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখার দাবি জানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে আলটিমেটাম দিয়েছেন তারা। বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) রাত সাড়ে ৯টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের হলপাড়ায় আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব কথা বলেন শেখ মুজিবুর রহমান হল সংসদের জিএস আহমেদ আল সাবাহ ও ডাকসুর সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক মুসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদ।
আহমেদ আল সাবাহ বলেন, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে শহীদ ওসমান হাদীর মৃত্যুর পর শেখ মুজিবুর রহমান হলের নাম পরিবর্তনের দাবি ওঠে। শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে হলটির নাম শহীদ ওসমান হাদীর নামে করার প্রস্তাব দেওয়া হলেও এটি কোনো বাধ্যতামূলক দাবি নয় বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের দাবি আপনার পছন্দ না হলে আপনি আপনার পছন্দসম্বলিত একটা নাম দেন। মুক্তিযুদ্ধের সাতজন বীরশ্রেষ্ঠের নামে তো এই বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো হল নেই। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের নামেও কোনো ইনস্টিটিউশন নেই। তাদের কারও নামে হলের নাম হতে পারে। আমাদের আপত্তি এক জায়গাতেই শেখ মুজিবুর রহমানের নাম পুনর্বহাল করা নিয়ে।
হলের বর্তমান নামের কারণে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি। গত বিজয় দিবসে জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করতে গিয়ে ‘শেখ মুজিবুর রহমান হল’ লেখা ব্যানার পুলিশ আওয়ামী লীগের ব্যানার মনে করে সরিয়ে নিয়েছিল বলে দাবি করেন আহমেদ আল সাবাহ। পরে এটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের ব্যানার জানার পর ফিরিয়ে দেওয়া হয় বলেও জানান তিনি।
হলের নামের কারণে স্পন্সর সংগ্রহেও সমস্যা হচ্ছে বলে অভিযোগ করে তিনি বলেন, হল সংসদের বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য স্পন্সর চাইতে গেলে ‘শেখ মুজিবুর রহমান হল’ নাম শুনে অনেকেই অর্থ দিতে অনাগ্রহ দেখান।
নাম পরিবর্তনের দাবির পক্ষে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের তথ্য তুলে ধরে আহমেদ আল সাবাহ বলেন, অনলাইন ও অফলাইনে গণস্বাক্ষর সংগ্রহ করা হয়েছে। অফলাইনে সাত শতাধিক শিক্ষার্থীর স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে এবং অনলাইন ভোটিংয়ের স্ক্রিনশটসহ প্রয়োজনীয় নথি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও দাবি করেন, হল প্রশাসনের পক্ষ থেকেও হলের নাম পরিবর্তনের পক্ষে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছিল। তিনি বলেন, বিষয়টি এসএমসি ও সিন্ডিকেটের প্রক্রিয়া পেরিয়ে সিনেটের আলোচ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। তবে পরবর্তী সময়ে শেখ মুজিবুর রহমান হল, বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা হল, সুলতানা কামাল হোস্টেল ও শেখ রাসেল ভবনসহ নাম পরিবর্তনের প্রস্তাবগুলো সিনেটের আলোচ্যসূচি থেকে বাদ দেওয়া হয়।
এ ঘটনায় ডাকসুর প্রতিনিধিরা সিনেট থেকে ওয়াকআউট করেছিলেন বলেও দাবি করেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সমালোচনা করে আহমেদ আল সাবাহ বলেন, গত ১৭ বছর যারা মুজিববাদীদের দ্বারা অত্যাচারিত হয়েছিলেন, বর্তমান প্রশাসনে থাকা সাদা দলের সেই শিক্ষকরাই কীভাবে এসে আজকে মুজিবপ্রেমী হয়ে গেলেন সেটাই আমাদের জানার বিষয়।
তিনি দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে শেখ মুজিবুর রহমানের নামে থাকা স্থাপনার নাম পরিবর্তনের উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, সেখানে নাম পরিবর্তন করা সম্ভব হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও শিক্ষার্থীদের দাবিকে বিবেচনা করা উচিত।
আহমেদ আল সাবাহ বলেন, আমরা হল সংসদের পক্ষ থেকে, শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিতে চাই আমার পদ থাকে থাকুক, না থাকে না থাকুক; আমার যদি চেয়ার ছেড়ে দিতে হয়, আমি ছেড়ে দিতে রাজি আছি। তবুও প্রশাসনের এই সিদ্ধান্ত মানতে রাজি নই।
শেষে প্রশাসনের প্রতি আলটিমেটাম দিয়ে তিনি বলেন, আপনারা কখনো শেখ মুজিবুর রহমানের নাম এই বিশ্ববিদ্যালয়ের মাটিতে পুনঃপ্রতিষ্ঠার অপচেষ্টা করবেন না।
অন্যদিকে, ডাকসুর সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক মুসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদ বলেন, হলটির নাম পরিবর্তনের দাবি শিক্ষার্থীদের ম্যান্ডেটের ভিত্তিতে উত্থাপিত হয়েছে। শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামল, বাকশাল ও ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন তিনি। তিনি দাবি করেন, ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের পেছনে তৎকালীন শাসনব্যবস্থা ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার ভূমিকা ছিল।
এ প্রসঙ্গে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের দুর্ভিক্ষবিষয়ক গবেষণার কথা উল্লেখ করে মুসাদ্দিক বলেন, অমর্ত্য সেন ৭৪-এর দুর্ভিক্ষের ওপর গবেষণা করেছিলেন। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশে যদি গণতন্ত্রের উপস্থিতি থাকত, যদি বাকশালী কায়দায় শাসনব্যবস্থা পরিচালিত না হতো এবং একটি ডেমোক্রেটিক সোসাইটি থাকত, তাহলে এই দুর্ভিক্ষ হতো না।
অমর্ত্য সেনের দুর্ভিক্ষবিষয়ক গবেষণায় অবশ্য বৃহত্তরভাবে গণতন্ত্র, মুক্ত সংবাদমাধ্যম ও রাজনৈতিক জবাবদিহিকে দুর্ভিক্ষ প্রতিরোধের গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
মুসাদ্দিক আরও বলেন, শেখ মুজিবুর রহমানের নাম ব্যবহার করে পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক দমন-পীড়নের অভিযোগ রয়েছে। এসব ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক বিতর্কের প্রেক্ষাপটে তাঁর নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হল থাকা নিয়ে শিক্ষার্থীদের আপত্তি রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, আমাদের শিক্ষার্থীরা যখন কোথাও গিয়ে পরিচয় দেয় যে তারা শেখ মুজিবুর রহমান হলের শিক্ষার্থী, তখন তাদেরকে লীগ হিসেবে ট্রিট করা হয়।
গত বিজয় দিবসে জাতীয় স্মৃতিসৌধে হলের ব্যানার সরিয়ে নেওয়ার ঘটনাকে শিক্ষার্থীদের জন্য অপমানজনক উল্লেখ করে মুসাদ্দিক বলেন, হলটির নামের কারণে শিক্ষার্থীদের পরিচয় ও নিরাপত্তার বিষয়টি এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
প্রেস ব্রিফিংয়ে বক্তারা বলেন, শিক্ষার্থীদের প্রস্তাবিত নাম প্রশাসনের পছন্দ না হলে আলোচনার মাধ্যমে অন্য কোনো জাতীয় ব্যক্তিত্বের নামে হলটির নামকরণ করা যেতে পারে। তবে শেখ মুজিবুর রহমানের নামে হল পুনর্বহালের উদ্যোগ নেওয়া হলে তারা আন্দোলন অব্যাহত রাখবেন বলে জানান।