রেদওয়ান আহমদ তাহমিদ © সংগৃহীত ও সম্পাদিত
১০ মাসের অপেক্ষার পর আজ যে দিনটিকে জীবনের সবচেয়ে আনন্দের দিন ভেবেছিলাম, সেই দিনটিই যেন জীবনের সবচেয়ে কঠিন দিন হয়ে এলো। যে স্বপ্নের জন্য গত এক বছর জীবনের সর্বস্ব দিয়ে লড়েছি, শেষ মুহূর্তে সেই স্বপ্নই হাতছাড়া হয়ে গেল। আজ গেজেট প্রকাশের দিনে আমার পাশে বসে অঝোরে কাঁদছে পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী। তার চোখের দিকে তাকানোর সাহসটুকুও আজ আমার নেই।
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) ৪৯ বিসিএস থেকে বাদ গিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের ছাত্র রেদওয়ান আহমদ তাহমিদ এভাবেই লিখেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের ছাত্র তিনি।
ফেসবুকে তাহমিদ লিখেছেন, আমি গত বছরের জুন থেকে জীবনের সর্বস্ব দিয়ে চাকরির জন্য পড়াশোনা শুরু করি। আল্লাহ আমার জন্য ভালোও করতে থাকেন। প্রথমে ব্যাংকের প্রিলিমিনারি ও রিটেন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হই। পরবর্তীতে ৪৭তম বিসিএসের প্রিলিমিনারি পরীক্ষায়ও উত্তীর্ণ হই।
কিন্তু পরবর্তীতে ৪৯তম বিসিএসের পরীক্ষা মাত্র ২০ দিন পর থাকায় রিটেনের প্রস্তুতি শুরু না করে এক বড় ভাইয়ের কথায় ৪৯তম বিসিএসের জন্য পড়াশোনা শুরু করি। তিনি বলেছিলেন, ‘প্রতিটি বিসিএসেরই মূল্য আছে, তাই এখন ৪৯তম বিসিএস নিয়ে পড়ো।’ আলহামদুলিল্লাহ, পরীক্ষা দেওয়ার পর বাসায় ফিরে স্ত্রীকে বলি, আমি রিটেন (MCQ) টিকে যাব। শেষ পর্যন্ত তাই হয়। এরপর ভাইবার জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করি।
আমার বিভাগের একাধিক শিক্ষকের কাছে যাই এবং ভাইবায় ভালো করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ নিই। এই ভাইবাই ছিল আমার জীবনের প্রথম চাকরির ভাইবা। এক ভাই বলেছিলেন, ‘ভাইবায় ভালো করার জন্য আল্লাহর ওপর ভরসার ঊর্ধ্বে কিছু নেই।’ ভাইবায় গিয়ে আমি কথাটি বারবার স্মরণ করি।
আমি সিরিয়ালে প্রথম ছিলাম এবং এটি ছিল আমার জীবনের প্রথম ভাইবা। তারপরও কোনো ভয় পাচ্ছিলাম না। ভালো একটি ভাইবা দিই। কিছুদিন পর আলহামদুলিল্লাহ, আমি সুপারিশপ্রাপ্ত হই। তারপর শুরু হয় আমার জীবনের কষ্টের অধ্যায়।
সরকার পরিবর্তনের কারণে ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়া বিলম্বিত হতে থাকে। অন্যদিকে, অনেক চাকরিতে আবেদন করলেও এই বিসিএসে গেজেটেড হওয়ার আশায় ও ভরসায় অন্য কোথাও পরীক্ষা দিইনি। কমপক্ষে ১০-১৫টি চাকরিতে আগে থেকেই আবেদন করা ছিল, কিন্তু সেগুলোর পরীক্ষাও দিইনি। অন্যদিকে, পরবর্তীতে অনেক ভালো চাকরিতেও আবেদন করিনি।
আমার আশা ছিল, আল্লাহ আমার জন্য যে রিজিক লিখে রেখেছেন, তা থেকে আমি বঞ্চিত হব না। কিন্তু ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়া ১০ মাস বিলম্বিত হওয়ার পর শেষ পর্যন্ত আমাকে গেজেট থেকে বাদ দেওয়া হয়।
আমি ঢাকায় ছোট একটি একরুমের বাসায় সহধর্মিণীকে নিয়ে থাকতাম। পরিবারের সবার আশা ছিল, আমি প্রতিষ্ঠিত হয়ে পরিবারকে সাহায্য করব। নিজেরও অনেক আশা ছিল। অন্যদিকে, আমার সহধর্মিণী পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। তাকে একটি ভালো জীবন দেওয়ার জন্য সবসময় জীবনের সঙ্গে সংগ্রাম করি। ভেবেছিলাম, হয়তো এই চাকরির মাধ্যমে তাকে একটি সুন্দর জীবন দিতে পারব। কিন্তু আজ সে অঝোরে আমার পাশে বসে কাঁদছে।
তার শারীরিক দুর্বলতার কারণে আমি তাকে কিছুদিনের জন্য তার বাড়িতে পাঠিয়ে দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সে আমার কাছে থেকে একসঙ্গে গেজেটের দিনটি উদযাপন করতে চেয়েছিল। ভেবেছিলাম, আজ হয়তো আমাদের জীবনের সবচেয়ে আনন্দের দিন হবে।
কিন্তু তা আর হলো না। আজ তার মুখের দিকে আমি তাকাতে পারছি না।’
বাদ পড়ার সম্ভাব্য কারণ জানতে চাইলে তাহমিদ বলেন, আমার বাবা সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলা জামায়াতের আমির। সেজন্যই হয়তো আমাকে বাদ দেওয়া হয়েছে। ভেরিফিকেশনের সময় আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলো যে, আমার পরিবারের কেউ রাজনীতি করে কিনা। আমি আব্বার কথা বলেছিলাম, যে তিনি জামায়াতের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এছাড়া তো আমাকে বাদ দেওয়ার কোনো কারণ দেখছি না।