জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মামুন শেখ। © টিডিসি ফটো
ফল প্রকাশের পর নিজের রোল নম্বরটি দেখেও বিশ্বাস হচ্ছিল না মামুন শেখের। কয়েকবার চোখ মেলেও নিশ্চিত হতে পারছিলেন না—সত্যিই কি এবার তার স্বপ্ন পূরণ হয়েছে? শেষ পর্যন্ত পাশের রুমের এক ভাইকে অ্যাডমিট কার্ড দেখিয়ে ফলাফলের সঙ্গে মিলিয়ে নিশ্চিত হন তিনি। এরপর আর নিজেকে ধরে রাখতে পারেননি। অঝোরে কেঁদেছেন।
সঙ্গে সঙ্গে ফোন দিয়েছেন বাবাকে। কিন্তু ফোনের ওপাশে বাবার সঙ্গে কথা বলার মতো কোনো শব্দই যেন খুঁজে পাচ্ছিলেন না মামুন। শুধু কান্না করছিলেন। ছেলের কান্না শুনে বাবা ভেবেছিলেন, হয়তো এবারও ব্যর্থ হয়েছেন। তাই সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিলেন, ‘আব্বা, কান্না করো না, ধৈর্য ধর।’
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তখন মামুন বলেন, ‘আব্বা, আপনার ছেলে জজ হয়েছে।’ এরপর বাবা ও ছেলে দুজনেই কান্নায় ভেঙে পড়েন। তবে সেই কান্নার পেছনে ছিল শুধু আনন্দ নয়; ছিল দীর্ঘ অপেক্ষা, বারবার ব্যর্থতা, আত্মবিশ্বাস, পরিবারের স্বপ্ন আর হাল না ছাড়ার এক দীর্ঘ গল্প।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মামুন শেখ। ১৪তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) পরীক্ষা থেকে শুরু করে ১৮তম বিজেএস পর্যন্ত টানা পাঁচটি ভাইভায় অংশ নিয়েছেন তিনি। প্রতিবারই লক্ষ্য ছিল এক—বিচারক হওয়া। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত ফল আসেনি।
তারপরও নিজের ওপর বিশ্বাস হারাননি মামুন। বিশেষ করে ১৬তম বিজেএসের পর কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যেতে হলেও কখনো মনে হয়নি, তিনি জজ হতে পারবেন না। বরং প্রতিবারই নিজেকে বলেছেন—ইনশাআল্লাহ, এবার আমার হবে।
অবশেষে সেই অপেক্ষার অবসান হয় ২৩ সেপ্টেম্বর বুধবার। প্রকাশিত হয় ১৮তম বিজেএসের চূড়ান্ত ফল। এবার শুধু সহকারী জজ হিসেবে সুপারিশপ্রাপ্তিই নয়, মামুন শেখ অর্জন করেন ৯ম স্থান।
আগের পরীক্ষাগুলোতে শুধু জজ হতে পারাটাই ছিল তার প্রধান লক্ষ্য। তবে ১৮তম বিজেএসে এসে মনে হয়েছিল, একটু দেরি হয়ে যাচ্ছে। তাই এবার যদি প্রথম দিকের কোনো সিরিয়ালে থাকতে পারেন, তাহলে আরও ভালো লাগবে। সেই লক্ষ্য সামনে রেখে নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন তিনি। শেষ পর্যন্ত নিজের পরিকল্পনার সঙ্গে আল্লাহর পরিকল্পনার মিল হওয়ায় ৯ম স্থান অর্জন করতে পেরেছেন বলে মনে করেন মামুন।
তার বিশ্বাস, ‘আমরা শুধু চেষ্টা করতে পারি, কিন্তু রিজিকের ফয়সালা হয় আসমান থেকে।’
এই বিশ্বাসই দীর্ঘ প্রস্তুতির কঠিন সময়গুলোতে তাকে ধরে রেখেছে। ব্যর্থতার পর ব্যর্থতা এলেও ভেঙে পড়েননি। নিজের ওপর এবং আল্লাহর ওপর আস্থা রেখেই এগিয়ে গেছেন।
বিশেষ করে পবিত্র কোরআনের কয়েকটি আয়াত তাকে কঠিন সময়ে সাহস জুগিয়েছে। ‘ফা ইন্না মা‘আল উসরি ইউসরা’—নিশ্চয়ই কষ্টের সঙ্গে স্বস্তি রয়েছে—এই আয়াতটি কঠিন সময়ে বেশি মনে করতেন তিনি। একইভাবে সূরা আদ-দোহার বাণী—‘আপনার রব আপনাকে ত্যাগ করেননি এবং আপনার প্রতি নারাজও হননি’—তাকে আশাবাদী রেখেছে।
মামুনের জজ হওয়ার স্বপ্নটি অবশ্য শুধু তার নিজের ছিল না। এর সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে ছিল পুরো পরিবারের স্বপ্ন। তার মা অসম্ভব পরিশ্রমী। আর বাবা আশাবাদী মানুষ। মায়ের পরিশ্রম ও বাবার আশাবাদের প্রভাব নিজের মধ্যে রয়েছে বলে মনে করেন মামুন। দাদা ও পরিবারের অন্য সদস্যরাও বিভিন্ন সময়ে তাকে সহযোগিতা করেছেন।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই দাদা প্রায়ই বলতেন, ‘আমার নাতি জজ হবে।’ মৃত্যুর কিছুদিন আগেও দাদা একই কথা বলতেন। দাদার মৃত্যুর পরও সেই কথাগুলো মামুনের কানে ভেসে আসত। সেই স্বপ্নকে বুকে ধারণ করেই এগিয়ে গেছেন তিনি। তবে স্বপ্নের পথটা সবসময় মসৃণ ছিল না। বারবার ভাইভায় অংশ নিয়েও কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়ার কষ্ট ছিল। এর মধ্যে একবার ভাইভায় ব্যর্থ হওয়ার পর তার বাবাকে মামুনের জজ হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে একজন তিরস্কার করেছিলেন। ঘটনাটি শুনে ভীষণ কষ্ট পেয়েছিলেন তিনি।
কিন্তু সেই কষ্ট তাকে থামিয়ে দেয়নি। বরং নিজের স্বপ্নের প্রতি আরও দৃঢ় করেছে। তার মনে হয়েছে, তাকে প্রমাণ করতে হবে—স্বপ্নটা অসম্ভব নয়।প্রস্তুতির সময় প্রতিদিন আইন ও সাধারণ বিষয় পড়ার চেষ্টা করতেন মামুন। সকালে ঘুম থেকে উঠে একটি ছোট আইন পড়েই দিন শুরু করতেন। এরপর বড় আইন এবং সবশেষে সাধারণ অংশ পড়তেন। প্রতিদিন অল্প সময় করে গণিত ও মুখস্থনির্ভর বিষয়ও পড়তেন।
তার মতে, দীর্ঘ প্রস্তুতিতে বারবার রিভিশন অত্যন্ত কার্যকর। শুধু পড়াশোনাই নয়, লিখিত পরীক্ষায় উত্তরপত্রের উপস্থাপনাকেও গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন মামুন। তার ভাষায়, খাতায় এমন কিছু বিষয় থাকা দরকার, যা পরীক্ষকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং ‘আই-ক্যাচিং’ হয়।
১৮তম বিজেএসের চূড়ান্ত প্রস্তুতির সময়ে বিশেষভাবে পাশে ছিলেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের জুনিয়র এবং ১৭তম বিজেএসে সহকারী জজ হিসেবে সুপারিশপ্রাপ্ত বৈশাখী রানী কর্মকার। ১৭তম বিজেএসের ফল প্রকাশের পর থেকে মামুনের লেখার প্যাটার্ন পরিবর্তন, পরীক্ষার উত্তর পর্যালোচনা এবং প্রতিটি বিষয়ের ভুল চিহ্নিত করে তা সংশোধনের পরামর্শ দিয়েছেন বৈশাখী। কোন বিষয় পরিবর্তন করা দরকার, কোথায় আরও ভালো করা যায় কিংবা কোন অংশ ভালো হয়েছে—এসব বিষয়ে নিয়মিত পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। মামুনের চূড়ান্ত প্রস্তুতিতে যা বিশেষভাবে সহায়তা করেছে। তাই বৈশাখী রানী কর্মকারের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন তিনি।
দীর্ঘ এই পথচলায় অনেক কিছু দেখেছেন, অনেক কিছু শিখেছেন মামুন। তবে সবচেয়ে বড় উপলব্ধি হিসেবে জীবন সম্পর্কে নতুন করে অনেক কিছু বুঝতে শেখার কথা বলেন তিনি। তার মতে, প্রস্তুতির সময় কখনো কখনো মনে হবে, ‘তোমাকে দিয়ে হবে না।’ ঠিক তখনই নিজের ওপর বিশ্বাস রাখতে হবে—ইনশাআল্লাহ, তোমাকে দিয়েই হবে।’
কোনো অবস্থাতেই হাল ছাড়া যাবে না। দেরি হলেও বিশ্বাস রাখতে হবে, আল্লাহ কাউকে বিচারক হিসেবে যোগ্য না করে বিচারকের আসনে বসাবেন না। তাই নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা করার পাশাপাশি আল্লাহর পরিকল্পনার ওপর পূর্ণ বিশ্বাস রাখতে হবে—এটাই মামুনের উপলব্ধি।
মামুন শেখ মনে করেন, তার এই সাফল্যের পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার বিশেষ রহমত এবং বাবা-মায়ের দোয়া। পরিবারের সদস্যদের সহযোগিতা, দাদার স্বপ্ন, নিজের অটুট আত্মবিশ্বাস এবং দীর্ঘদিনের অধ্যবসায়—সবকিছুর সমন্বয়ে অবশেষে পূর্ণ হয়েছে সেই অপেক্ষা।
১৪তম বিজেএস থেকে ১৮তম বিজেএস—টানা পাঁচটি ভাইভা। পাঁচবার অপেক্ষা। পাঁচবারই নতুন করে স্বপ্ন দেখা। আর শেষবার এসে সেই স্বপ্নই ধরা দিয়েছে সাফল্যের হাতে।
১৮তম বিজেএসে ৯ম স্থান অর্জন করে সহকারী জজ হিসেবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের এই শিক্ষার্থী। যে স্বপ্ন একসময় দাদার মুখে শুনতেন, যে স্বপ্ন নিয়ে বাবাকে তিরস্কারও শুনতে হয়েছিল, সেই স্বপ্নই আজ বাস্তব। আর সেই বাস্তবতার মুহূর্তে, চোখের জলে বাবাকে বলা সেই কথাটিই যেন তার পাঁচ বছরের অপেক্ষার সবচেয়ে বড় উত্তর—‘আব্বা, আপনার ছেলে জজ হয়েছে।’