ধার-দেনা করে যেতেন দলের মিছিলে-জুলাই আন্দোলনে, ফেরারি শাকিলের আর ঘরে ফেরা হলো না

২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১০:২৩ PM , আপডেট: ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৩৬ PM
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ছাত্রদল নেতা শাকিল ইসলাম

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ছাত্রদল নেতা শাকিল ইসলাম © ফেসবুক প্রোফাইল থেকে নেওয়া

পারিবারিকভাবেই জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছিলেন নাটোরের গুরুদাসপুর পৌর ছাত্রদলের সদস্য সচিব শাকিল ইসলাম। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে পতিত শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনকালে দলের আন্দোলন-কর্মসূচিতে সরব ছিলেন তিনি। গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নাটোর-৪ (বড়াইগ্রাম-গুরুদাসপুর) আসনে বিএনপির সংসদ সদস্য আব্দুল আজিজের পক্ষেও সক্রিয় ছিলেন তিনি। তার ছেলে নুরুজ্জামান মিন্টুর সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল শাকিলের। কিন্তু সে সব স্মৃতিই এখন ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের কাছে শোকের উৎস।

গত ১৪ অক্টোবর রাতে বাড়ি ফেরার পথে দুর্বৃত্তদের আঘাতে গুরুতর আহত হন শাকিল। এরপর দীর্ঘ ১২ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে হেরে যান। ২৬ অক্টোবর রাজধানীর বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএমইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। তার মৃত্যুতে শোক নেমেছে নাটোরে, ছাত্রদলেও। ক্ষোভে ফুঁসছেন সারাদেশের ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা, তোপের মুখে পড়েছেন খোদ এমপি আজিজও।

শাকিলকে হত্যার ঘটনায় সবার অভিযোগের তীর নুরুজ্জামান মিন্টুর দিকে। তিনি উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। হত্যাকাণ্ডে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠার পর তাকে বহিষ্কার করেছে সংগঠনটি। এ ছাড়া ইতোমধ্যে তাকে তিন দিনের রিমান্ডে নেওয়ার অনুমতিও দিয়েছেন আদালত। তবে সবকিছু ছাপিয়ে শাকিলের সংগ্রামী জীবন কাঁদাচ্ছে সবাইকে।

বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ, এমনকি ছাত্রদল নেতাকর্মীদেরও প্রশ্ন, যে কর্মীদের রক্তে-ঘামে-শ্রমের ওপর দাঁড়িয়ে ক্ষমতার মসনদে বসেছেন নেতারা, তারা কি সেই কর্মীদের ঘাতক হয়ে উঠছেন?

আন্দোলনের নিবেদিত প্রাণ
গুরুদাসপুর পৌর ছাত্রদলের সদস্য সচিব শাকিল ইসলাম আওয়ামী লীগের নিপীড়নের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন সব সময়। ২০২৫ সালের ৩০ অক্টোবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে নিজের সংগ্রামের গল্প তুলে ধরেছিলেন। বাবার সঙ্গে একটি ছবি শেয়ার করে তাকে ‘আদর্শ’ উল্লেখ করে তিনি লিখেছিলেন, ‘আমার বাবা পেশায় একজন রাজমিস্ত্রি। অর্থাৎ ঠিকাদারের কাছ থেকে কাজ কন্টাক্ট নিয়ে শ্রমিক দিয়ে নির্মাণ করে দেন। আমার জন্মের পর থেকে দেখছি বাবা বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তার অনুপ্রেরণাতে আমার ছাত্রদল করা। ৫ বছর যাবত আমি গুরুদাসপুর পৌর ছাত্রদলের সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। জুলাই আন্দোলনে ঢাকা মিরপুর সামনের কাতারে থেকে অংশগ্রহণ করেছি। এটা মোটেও সহজ ছিল না, আপনারা সবাই জানেন।’

ধার-দেনা করেও আন্দোলনে অংশ নিতেন শাকিল

তিনি লিখেছেন, ‘প্রায় ১৩-১৪ বছর যাবত ঢাকা, রাজশাহী, নাটোর, বগুড়া যেখানে যখন যে প্রোগ্রাম হোক—আমি উপস্থিত হয়েছি। কখনো কোন নেতার কাছ থেকে একটা টাকাও নিই নাই। বাবার কাছ থেকেই টাকা নিয়ে সব প্রোগ্রামে যাইতাম। ফ্যাসিস্ট স্বৈরাশাসকের ঠিকাদাররা ওই ১৭ বছর  আমার বাবাকে কোন কাজ দেয় নাই। কারণ আমরা বিএনপি পরিবার ।’

তিনি আরও লিখেছেন, ‘আমার ভাবি, শহীদ শামসুজ্জোহা সরকারি কলেজের সাইকোলজি ডিপার্টমেন্ট ফার্স্ট। একদিন স্যার আমাকে ফোন দিয়ে বললো তোমার ভাবিকে গেস্ট টিচার হিসেবে সাইকোলজি ডিপার্টমেন্টে চাই আমরা। আমি বললাম ঠিক আছে স্যার। পরে শুনলাম ভাবির চাকরি হয় নাই, কারণ আমার পরিবার বিএনপি।’

২০২৩ সালে বিএনপির কর্মসূচিতে শাকিল ইসলাম

শাকিল জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে লিখেছেন, ‘৫ তারিখের পরে গুরুদাসপুর পৌরসভার অসংখ্য ঠিকাদারকে দেখলাম, যারা এখন বিএনপির। কিন্তু এটা ভেবে কষ্ট লাগে, তারা আমাদের কোন কাজ-কাম দেয় না। কিন্তু দেখেন আমরা যদি রাজপথে আন্দোলন সংগ্রাম মিছিল-মিটিং রক্ত না ঝরাইতাম, তাহলে কি তারা এখানে থাকত? থাকত না। আমাদের এই কষ্ট, পরিশ্রম, আন্দোলন, সংগ্রামের কারণে তারা এখানে বসে থেকে তাদের ভাগ্যের চাকা ঘুরাইতেছে। অথচ ৫ তারিখের পরে কত টেন্ডার হলো, কাজ হলো, একটি বারও কেউ বললো না কী অবস্থা? আহারে রাজনীতি!! আহা।’

আওয়ামীবিরোধী আন্দোলনে শাকিলের অবদান উঠে আসছে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের বক্তব্যেও। কুড়িগ্রাম জেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি আমিমুল ইহছান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে শাকিল ইসলামের সঙ্গে ম্যাসেঞ্জারে কথোপকথনের একটি স্ক্রিনশট যুক্ত করেছেন। তবে এটি কার সঙ্গে কথোপকথনের স্ক্রিনশট তা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। এতে দেখা যায়, শাকিল ইসলাম অপর পাশে থাকা ব্যক্তিকে লিখেছেন, ‘নাটোর প্রোগ্রাম আজকে, কাছে একটা ও টাকা নাই, ৫০০ টাকা দে, আগামীকাল সন্ধ্যার আগে আবার তোকে পাঠিয়ে দিবনি।’

আরেকটি স্ক্রিনশটে দেখা যায়, শাকিল হোয়াটসঅ্যাপে অপর পাশে থাকা ব্যক্তিকে লিখেছেন, ‘ভাই রাত ১১ টায় টাকা দিবে, বিকাশ নাম্বার দেন।’

পোস্টটিতে আমিমুল ইহছান লিখেছেন, ‘এই ছেলেগুলোই গত ১৬ বছর পতিত স্বৈরাচারের আমলে বিএনপিকে স্বগৌরবে দাঁড় করিয়ে রেখেছিল। এই ৫০০ টাকা ধার করে যারা নাটোর, পল্টন, প্রেসক্লাবে গেছে, তাদের রক্তেই আজ আমরা মুক্ত বাতাসে রাজনীতি করছি। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের সাথে বলতে হয়, ৫ আগস্টের পর তাদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি। পরিবর্তন হয়েছে শুধু সেই সুবিধাবাদী শ্রেণীর, যারা ২৮ অক্টোবরের মতো কঠিন দিনে গর্তে লুকিয়ে ছিল, আর আজ দামি গাড়িতে, এসি রুমে বসে ত্যাগের হিসাব কষে।’

শাকিল ইসলামের ফুলের চারা বিক্রির তথ্যের সঙ্গে এই ছবি শেয়ার করেছেন কেউ কেউ; তবে ছবিটি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি

তবে শাকিলের সংগ্রামের গল্প এখানেই শেষ নয়। তার সহযোদ্ধারা লিখছেন, আওয়ামী লীগের সময় দীর্ঘদিন ফেরারি ছিলেন শাকিল। সে সময় নিদারুণ কষ্টে জীবন-যাপন করলেও আন্দোলন থেকে পিছপা হননি। ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (ডুয়েট) ছাত্রদলের সভাপতি ও বগুড়ার গাবতলীর স্থায়ী বাসিন্দা জামিরুল ইসলাম জামিল তার পোস্টে লিখেছেন সেই গল্পের কথা। তার ভাষায়— ‘স্বৈরাচারের আমলে নাটোরে রাজনীতি করা খুবই কঠিন ছিল। তাই ছাত্রদলের নিহত শাকিল ভাই নিজেকে রক্ষা করতে থাকতেন বগুড়ায়। বগুড়া থেকে নাটোরে গিয়ে দলের সব প্রোগাম করতেন। কর্মসূচি শেষে আবার বগুড়ায় চলে যেতেন। তিনি শুধু বগুড়াতে থাকতেনই না, জীবন ও জীবিকার তাগিদে প্রতিদিন মহাস্থানগড় থেকে ফুলের গাছ কিনে এনে বিক্রি করতেন বগুড়ার অলিতে গলিতে। বগুড়ার অলিতে গলিতে ফুলের গাছ বিক্রি করে দৈনিক ১৩০-১৬০ টাকা রোজগার হতো। সেটা দিয়ে নিজের খাবারের খরচ এবং দলীয় প্রোগাম বাস্তবায়নের খরচ চালিয়ে নিতো।’

তিনি আরও লিখেছেন, ‘আমাদের ভাই শাকিলের বিক্রি করা ফুলের গাছগুলো হয়তো আজও কোনো বাড়ির বারান্দায় দাড়িয়ে আছে। গাছগুলো বড় হবে, ফুল ফুটবে। শুধু ঝরে গেলো আমাদের শাকিল ভাই। শাকিলের মতো কর্মীদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে অনেকে নেতা হন, অনেকে ক্ষমতার কাছাকাছি যান, অনেকে সংসদ সদস্যও হন। কিন্তু ক্ষমতার সেই হিসাবের বাইরে থেকে যায় শাকিলদের নাম, শাকিলদের পরিবার, শাকিলদের জীবনসংগ্রাম। শাকিল ভাই রেস্ট ইন পিস। আমাদের ক্ষমা করে দিন।’

রাজায় রাজায় যুদ্ধেই কি প্রাণ গেল শাকিলের
শাকিল সক্রিয়ভাবে এমপি আব্দুল আজিজের রাজনীতি করতেন। আক্রান্ত হওয়ার দুদিন আগেও তিনি তার ফেসবুক প্রোফাইলে এমপির সঙ্গে নির্বাচনকালীন স্মৃতি শেয়ার করেছেন। তবে আজিজের দুই ছেলে নুরুজ্জামান মিন্টু ও মাহমুদুজ্জামান সোহাগের আলাদা অনুসারী ও সমর্থক গোষ্ঠী রয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাদের মধ্যে বিরোধও আছে। এই বিরোধের জেরেই হত্যাকাণ্ড ঘটে থাকতে পারে বলে ধারণা স্থানীয়দের।

বাইকে নির্বাচনী প্রচারণায় শাকিল ইসলাম, পেছনে বসা এমপিপুত্র গ্রেপ্তার হওয়া মিন্টু

ইতোমধ্যে শাকিল হত্যা মামলায় মিন্টু জেলহাজতে রয়েছেন। তাকে ৩ দিনের রিমান্ডও দিয়েছেন আদালত। তবে হত্যা করা হতে পারে, এমন শঙ্কা আগেই করেছিলেন শাকিল। থানায় সাধারণ ডায়েরিও করেছিলেন তিনি। চলতি বছরের ১০ এপ্রিল তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে লিখেছিলেন, ‘আমি আমার জীবন নিয়ে সংশয় আছি খুবই। আমাকে মারার জন্য এক বড় ভাই বিভিন্ন চক্র ও গ্রুপের সঙ্গে যোগাযোগ করতেছে, যারা আমাকে মারতে পারবে তাদেরকে নাকি অনেকগুলো টাকা দেওয়া হবে। এই বিষয়ে আমি ওসির সঙ্গে কথা বলে থানায় একটা ডাইরি করেছি, এবং তাদের নাম উল্লেখ করা আছে। আমার যদি কিছু হয়ে যায় তাহলে ওই ডাইরি অনুযায়ী মামলা করে দিবেন। আর আমাকে হামলা করার পরে যদি আমি বেঁচে যাই, তাহলে তো ভাই বুঝতেই পারতিছেন, কী হবে এই শহরে। আমি কামলা দিয়ে কাজ করাই না। সাবধান ভাই।’

এর ৭ মাস পর গত ১৪ অক্টোবর রাতে চাঁচকৈড় বাজার থেকে বাড়ি ফেরার পথে সন্ত্রাসী হামলার শিকার হন শাকিল। পুলিশ ও স্থানীয়দের ভাষ্য, ওই রাতে হেলমেট পরা অবস্থায় মোটরসাইকেলে আসা দুই ব্যক্তি চাঁচকৈড় বাজারপাড়া সড়কে পৌর বিএনপির আহ্বায়ক দুলাল সরকারের বাড়ির কাছে শাকিলের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। এ সময় তারা দুই রাউন্ড গুলিও ছোড়ে। পরে শাকিল পালানোর চেষ্টা করলে শহিদা জলিল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কাছে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর জখম করা হয়।

স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে গুরুদাসপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন। অবস্থার অবনতি হলে ওই রাতেই চিকিৎসকরা তাকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান। পরদিন উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে ১২ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে শেষ পর্যন্ত সোমবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে মারা যান শাকিল।

বাঁশপাতা থেকে চা উদ্ভাবন করে দেশসেরা বেরোবির মাহিদ-আজিজ, পা…
  • ২৮ অক্টোবর ২০২৬
আরব জোটের সমর্থনে ঝুলছে নেতানিয়াহুর ভাগ্য
  • ২৮ অক্টোবর ২০২৬
১৮তম জিএসের অপেক্ষায় ছেড়ে গেলাম দীর্ঘ ১ বছরের সঙ্গীকে: আম্ম…
  • ২৮ অক্টোবর ২০২৬
সিভিল এভিয়েশন স্কুল অ্যান্ড কলেজে শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগে বি…
  • ২৮ অক্টোবর ২০২৬
উচ্চশিক্ষায় স্যাটেলাইট টিভি চালুর পরিকল্পনা ইউজিসির
  • ২৮ অক্টোবর ২০২৬
‘ক্রসফায়ার’ মন্তব্যে বিতর্ক জেরে আইজিপিকে সরিয়ে দেওয়ার গুঞ্…
  • ২৮ অক্টোবর ২০২৬