বিশ্ববিদ্যালয়ে ৭৪ শতাংশ শিক্ষার্থী র‍্যাগিংয়ের শিকার

১৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৫৩ AM
র‍্যাগিংয়ের শিকার বেশিরভাগ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা

র‍্যাগিংয়ের শিকার বেশিরভাগ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা © টিডিসি সম্পাদিত

বনভোজনের কথা বলে নবীন ছাত্রীদের একটি কক্ষে ডেকে নেওয়া হয়। সেখানে সিনিয়র ছাত্রীরা তাদের অহেতুক ধমক দেন। এরপর চতুষ্পদ প্রাণীর মতো ১০ ধরনের ডাক দিতে বলা হয়। ক্যাম্পাসে যাওয়া, ছেলেদের সঙ্গে মেশা এবং ফেসবুকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠানো নিয়েও তাদের জেরা করা হয়। একপর্যায়ে এক ছাত্রীর শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। পরে তিনি অচেতন হয়ে পড়েন। গত ৮ অক্টোবর পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে এ ঘটনা ঘটে।

দেশের শিক্ষাঙ্গনে র‍্যাগিং বা বুলিংয়ের এমন ঘটনা নতুন নয়। গত ৪ জুলাই র‍্যাগিংয়ের অভিযোগে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের ১২ শিক্ষার্থীকে সাময়িক বহিষ্কার করে প্রশাসন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ৩ জুলাই রাতে অভিযুক্তরা কয়েকজন নবীন শিক্ষার্থীকে ডেকে নিয়ে গালাগাল করেন। তাদের কান ধরানো হয়। ‘ম্যানার’ শেখানোর নামে করা হয় র‍্যাগিং ও মানসিক নির্যাতন।

এমন পরিস্থিতিতে দেশ-বিদেশের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে পরিচালিত একটি গবেষণায় উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য। এতে দেখা গেছে, জরিপে অংশ নেওয়া বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের প্রায় ৭৪ শতাংশ জীবনের কোনো না কোনো সময়ে র‍্যাগিং বা বুলিংয়ের শিকার হয়েছেন। পূর্ণাঙ্গ উত্তর দেওয়া ৯ হাজার ৪৭৪ জনের মধ্যে ৭ হাজার ১১ জনের এমন অভিজ্ঞতা রয়েছে। তাদের মধ্যে ৪৫ দশমিক ৪ শতাংশ মাঝারি এবং ১১ দশমিক ৯ শতাংশ গুরুতর মাত্রার বুলিংয়ের কথা জানিয়েছেন। গবেষণায় র‍্যাগিংয়ের সঙ্গে উদ্বেগ ও বিষণ্নতার উপসর্গ এবং শিক্ষার্থীদের নিজেদের মূল্যায়নে খারাপ শিক্ষাগত ফলের সম্পর্কও পাওয়া গেছে।

‘স্বাস্থ্য ও শিক্ষাগত সাফল্যের ওপর প্রভাব’ শিরোনামের গবেষণাটি গত জুনে আন্তর্জাতিক সাময়িকী ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব মেন্টাল হেলথ অ্যান্ড অ্যাডিকশন-এর ২৪তম খণ্ডের তৃতীয় সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। গবেষণার তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছিল ২০২৪ সালে।

বাংলাদেশের ৫৭টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ২০২৪ সালের ২৪ মার্চ থেকে ১৩ জুলাই পর্যন্ত তথ্য সংগ্রহ করেন গবেষকেরা। গবেষণার শুরুতে ৯ হাজার ৫৭১টি উত্তর পাওয়া যায়। এর মধ্যে অসম্পূর্ণ ৯৭টি উত্তর বাদ দেওয়া হয়। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ২ হাজার ৪৬৩ জন র‍্যাগিংয়ের শিকার হননি। তাদের বাদ দিয়ে বুলিংয়ের অভিজ্ঞতা থাকা ৭ হাজার ১১ জনের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়।

গবেষণায় ইংরেজি ‘বুলিং’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। এর আওতায় রয়েছে মৌখিক বিদ্রূপ, সামাজিকভাবে হেয় করা, শারীরিক ও অনলাইন হয়রানি এবং যৌন হয়রানির মতো আচরণ। গবেষণায় অংশ নেওয়া ৭ হাজার ১১ জনের মধ্যে পুরুষ ছিলেন ৪ হাজার ৯৮৫ জন বা ৭১ দশমিক ১ শতাংশ। নারী ছিলেন ২ হাজার ২৬ জন বা ২৮ দশমিক ৯ শতাংশ।

বুলিংয়ের মাত্রা বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৯ দশমিক ৭ শতাংশ শিক্ষার্থী সামান্য, ৩৩ শতাংশ মৃদু, ৪৫ দশমিক ৪ শতাংশ মাঝারি এবং ১১ দশমিক ৯ শতাংশ গুরুতর বুলিংয়ের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। পুরুষদের মধ্যে ৫২ দশমিক ১ শতাংশ মাঝারি মাত্রার বুলিংয়ের শিকার হয়েছেন। গুরুতর বুলিংয়ের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন ৭ দশমিক ২ শতাংশ পুরুষ।

অন্যদিকে, নারীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৩৭ দশমিক ১ শতাংশ মৃদু মাত্রার বুলিংয়ের শিকার হয়েছেন। তবে গুরুতর বুলিংয়ের হার নারীদের মধ্যে ২৩ দশমিক ৩ শতাংশ। পুরুষদের ক্ষেত্রে এ হার ৭ দশমিক ২ শতাংশ।

জরিপে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন ৬ হাজার ৬৮৭ জন বা ৯৫ দশমিক ৪ শতাংশ। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন ৩২৪ জন বা ৪ দশমিক ৬ শতাংশ। সরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ১২ দশমিক ৩ শতাংশ গুরুতর বুলিংয়ের কথা জানিয়েছেন। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এ হার ২ দশমিক ৮ শতাংশ। তবে গবেষণার নমুনায় সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীর সংখ্যায় বড় পার্থক্য রয়েছে। তাই এই ফলাফলের ভিত্তিতে দুই ধরনের প্রতিষ্ঠানে বুলিংয়ের প্রকোপ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।

বুলিংয়ের ধরন বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৮৫ দশমিক ৬ শতাংশ উত্তরদাতা মৌখিক বিদ্রূপ বা টিজিংয়ের শিকার হয়েছেন। সামাজিকভাবে হেয় করার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন ৫৮ দশমিক ৯ শতাংশ। শারীরিক হয়রানির শিকার হয়েছেন ৩২ দশমিক ৬ শতাংশ এবং সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়েছেন ৩০ দশমিক ৫ শতাংশ। যৌন হয়রানির অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন ৪ দশমিক ৪৩ শতাংশ। একজন উত্তরদাতা একাধিক ধরনের হয়রানির কথা জানাতে পেরেছেন। এ কারণে এসব শতাংশের যোগফল ১০০ নয়।

বুলিংয়ের পেছনের কারণ হিসেবে ৭৫ দশমিক ৯ শতাংশ উত্তরদাতা আধিপত্য প্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন। উপহাস বা মজা করার কথা জানিয়েছেন ৬৪ দশমিক ৭ শতাংশ। প্রতিশোধের কথা বলেছেন ৫৭ দশমিক ৬ শতাংশ।

চেহারা বা শারীরিক গঠনের কারণে হয়রানির শিকার হয়েছেন ১৯ দশমিক ৬ শতাংশ। ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে ১৫ দশমিক ৯ শতাংশ, সংখ্যালঘু পরিচয়ের কারণে ৫ দশমিক ৯ শতাংশ এবং ধর্মের কারণে ১ দশমিক ৭ শতাংশ শিক্ষার্থী হয়রানির কথা জানিয়েছেন।
বুলিংয়ের স্থায়িত্বের বিষয়ে ৩৩ দশমিক ২ শতাংশ উত্তরদাতা ছয় মাস ধরে হয়রানির শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছেন। এক বছর বা তার বেশি সময় ধরে এমন অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন ৩১ দশমিক ৪ শতাংশ। এ ছাড়া ২৩ দশমিক ৯ শতাংশ এক মাস ধরে এবং ১১ দশমিক ৫ শতাংশ এক থেকে দুই সপ্তাহ ধরে বুলিংয়ের শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছেন।

গবেষণায় উদ্বেগের উপসর্গ পরিমাপে জিএডি-৭ এবং বিষণ্নতার উপসর্গ পরিমাপে পিএইচকিউ-৯ স্কেল ব্যবহার করা হয়েছে।

উদ্বেগের মাত্রা বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৪৪ দশমিক ২ শতাংশ শিক্ষার্থীর উপসর্গ মৃদু, ৪০ দশমিক ৯ শতাংশের মাঝারি এবং ১০ দশমিক ৬ শতাংশের গুরুতর পর্যায়ে ছিল। ৪ দশমিক ২ শতাংশের ক্ষেত্রে উদ্বেগের উপসর্গ পাওয়া যায়নি।

বিষণ্নতার স্কোরে ৪২ দশমিক ১ শতাংশ শিক্ষার্থীর উপসর্গ মাঝারি পর্যায়ে ছিল। ২৪ দশমিক ১ শতাংশের ছিল মৃদু এবং ২২ দশমিক ৮ শতাংশের ছিল মাঝারি থেকে গুরুতর পর্যায়ের উপসর্গ। গুরুতর পর্যায়ের স্কোর ছিল ৯ দশমিক ২ শতাংশের। ১ দশমিক ৯ শতাংশের ক্ষেত্রে বিষণ্নতার উপসর্গ পাওয়া যায়নি।

গবেষণায় র‍্যাগিংয়ের সঙ্গে উদ্বেগ ও বিষণ্নতার উপসর্গের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে এ ফলাফল থেকে র‍্যাগিংকেই শিক্ষার্থীদের মানসিক সমস্যার একমাত্র কারণ বলা যায় না।

নিজেদের শিক্ষাগত ফল সম্পর্কে ৬৪ দশমিক ৮ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন, তাদের ফল গড়পড়তা। ভালো ফলের কথা বলেছেন ১৬ দশমিক ৫ শতাংশ। অন্যদিকে, ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ শিক্ষার্থী নিজেদের ফল খারাপ বলে উল্লেখ করেছেন।

বুলিংয়ের তীব্রতা অনুযায়ী দেখা যায়, গুরুতর মাত্রার বুলিংয়ের অভিজ্ঞতা থাকা শিক্ষার্থীদের ৪৭ দশমিক ৫ শতাংশ নিজেদের শিক্ষাগত ফল খারাপ বলে জানিয়েছেন। মাঝারি মাত্রার বুলিংয়ের ক্ষেত্রে এ হার ২৪ দশমিক ১ শতাংশ। মৃদু মাত্রার বুলিংয়ের ক্ষেত্রে হার ৬ দশমিক ৩ শতাংশ।

র‍্যাগিংয়ের শিকার হওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৭৩ দশমিক ৮১ শতাংশ জানিয়েছেন, তারা এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করেননি। অভিযোগ করেছেন ২৬ দশমিক ১৯ শতাংশ। অভিযোগ না করার এই উচ্চ হার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে র‍্যাগিংয়ের ঘটনা জানানো এবং প্রতিকার চাওয়ার ব্যবস্থা আরও কার্যকর করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে। র‍্যাগিং প্রতিরোধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে, সে বিষয়েও উত্তরদাতাদের মতামত নেওয়া হয়।

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ১১ দশমিক ২ শতাংশ উত্তরদাতা সাময়িক বা স্থায়ী বহিষ্কারের মতো কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থার কথা বলেছেন। সচেতনতা বাড়ানোর পক্ষে মত দিয়েছেন ৬৯ দশমিক ৮ শতাংশ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাধারণ জায়গাগুলো পর্যবেক্ষণে রাখার পক্ষে মত দিয়েছেন ৫৭ দশমিক ১ শতাংশ। শিক্ষার্থীদের সম্মিলিতভাবে হস্তক্ষেপের কথা বলেছেন ৫৩ দশমিক ২ শতাংশ।

ভুক্তভোগীদের যথাযথ সহায়তা দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন ৫০ দশমিক ৯ শতাংশ। অভিভাবক বা শিক্ষকদের জানানোর কথা বলেছেন ৩১ দশমিক ৪ শতাংশ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হস্তক্ষেপের পক্ষে মত দিয়েছেন ২৩ দশমিক ৯ শতাংশ। গবেষণায় নেতৃত্ব দেন যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব বার্মিংহাম ও ঢাকার ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির শিক্ষক ড. শাফায়াত হোসেন।

গবেষক দলে আরও ছিলেন রিফাত রায়হান রাফি, নাকিব ইসতিয়াক লাবিব, ফারহিন ইসলাম, রাজিয়া সুলতানা, মাহদি হাসান, অলা সিকদার ইতি, নাইমাতুন জান্নাত, কাওসার মাহমুদ, নাকিন, আল আমিন, রেদোয়ান আহমেদ, তানজিম ইসলাম এবং চীনের চাকু ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী মো. রোকনুজ্জামান।

ফটিকছড়িতে পোলট্রি ফার্মে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে কর্মচারীর মৃত্যু
  • ১৮ অক্টোবর ২০২৬
গোপালগঞ্জে পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ২
  • ১৮ অক্টোবর ২০২৬
ফ্রান্সে বিক্ষোভে ব্যাপক সহিংসতা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট, বিপা…
  • ১৮ অক্টোবর ২০২৬
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর নিয়ে দুই ‘বড় প্…
  • ১৮ অক্টোবর ২০২৬
সরকারি সেবা পেতে ঘুষ দিতে হয় ৭৪ শতাংশ সেবাপ্রার্থীকে: গবেষণা
  • ১৮ অক্টোবর ২০২৬
‘ভারত ও আমাদের জেন জি আন্দোলনের মিল অমিল’
  • ১৮ অক্টোবর ২০২৬