২ বছর আগে চাকরি থেকে অবসর, ৬২ বছরে এসে স্নাতকোত্তরের স্বপ্নপূরণ

সমাবর্তন
সমাবর্তনের ফটোসেশনে আরেফা হোসেন  © সংগৃহীত

চাকরি, পরিবার আর সংসার সামলাতে গিয়ে বারবার পড়েছে বাধার মুখে। তবুও থেমে থাকেননি ঠাকুরগাঁওয়ের আরেফা হোসেনের (৬২) লেখাপড়া। সরকারি চাকরির অবসরের দুই বছর পর স্নাতকোত্তরের স্বপ্নপূরণ করলেন তিনি। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ৫৫ বছর বয়সী বেলায়েত শেখের মতো এ ঘটনাটিও অনুপ্রেরণার।

জানা যায়, আরেফা হোসেন সরকারি চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন ২০১৯ সালে। ঠাকুরগাঁও সদরের বাসিন্দা প্রয়াত হামিম হোসেনের সহধর্মিনী আরেফা হোসেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন ১৯৯৮ সালে। এরপর দীর্ঘসময় সংসার, সন্তান, পেশাগত দায়িত্ব পালন করেছেন। মনের ভেতর স্নাতকোত্তর সম্পন্নের ইচ্ছে লালন করে গেছেন। সেই স্বপ্নই পূরণ করেছেন তিনি।

ঠাকুরগাঁও সদর হাসপাতালে নার্সিং অ্যাসিসটেন্ট হিসেবে কর্মজীবন শুরু করে ২০১৯ সালে তিনি নার্সিং সুপারেনটেনডেন্ট হিসেবে অবসর নিয়েছেন। ২০১৭ সালে তিনি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমপিএইচ ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরাসের কারণে প্রতিষ্ঠানটির সমাবর্তন অনুষ্ঠান ৪ বছর পর আজ বুধবার (১৫ জুন) অনুষ্ঠিত হয়। এই সমাবর্তনে অংশ নিয়ে তিনি ৬২ বছর বয়সে পাবলিক হেলথ বিষয়ে মাস্টার্স ডিগ্রির সার্টিফিকেট গ্রহণ করেন।

এ বিষয়ে আরেফা বলেন, সরকারিভাবে এমপিএইচ করার সুযোগ সে সময় ছিল না। আগে এক জায়গা থেকেই এটা হতো নিপসম বাংলাদেশ থেকে। পরে সরকার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও মাস্টার্স করার সুযোগ আমাদের জন্য তৈরি করে। তাই আমি চিন্তা করলাম লেখাপড়া করা তো আর ভুল না, তাই যদি উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হতে পারি তাহলে হয়তো ভালো লাগবে। নিজেরও একটা ইচ্ছা ছিল পড়াশোনা করবো সেই থেকেই আরকি।

এমন অর্জনে তার অনুভূতি কী-এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, সেই কষ্টগুলো এখন আর মনে হচ্ছে না। এখন মনে হচ্ছে কষ্টগুলো কাজে লেগেছে। আর আমার এই ডিগ্রির জন্য কিন্তু চাকরির শেষ পর্যায়ে আমি প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা হিসেবে অবসরে যাওয়ার সুযোগ পাই। এখন একটি বেসরকারি নার্সিং কলেজের প্রিন্সিপাল হিসেবে কাজ করার সুযোগও পাচ্ছি। আমি বলবো এটা আমার ৬২ বছর জীবনের একটি বড় এচিভমেন্ট।

মায়ের এমন অর্জনে বেশ আবেগআপ্লুত ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছেন ছেলে আশিক হোসেন। তিনি তার নিজের ফেসবুক প্রোফাইলে লিখেছেন, “সন্তানের গ্রাজুয়েশনে বাবা-মা আনন্দিত হন, গর্বিত হন। কিন্তু বাবা-মার কোনো সাফল্যে যে সন্তানের এত আনন্দ হয় এটা আমরা বুঝতেই পারতাম না যদি না আজকের এই মুহূর্তটুকু সামনে আসতো। 

আমার মা আজ তার স্নাতোকোত্তর কনভোকেশনে যোগ দিলেন। আম্মা বিএসসি শেষ করেছিলেন যখন তখন আমি ক্লাস ফাইভে, আমার ছোট ভাই তখনও পৃথিবীতে আসেনি। এরপর সংসার-চাকরির চাপে আর তার পড়া হয়নি।

আম্মার চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার আগে চিন্তা করলেন মাস্টার্স শেষ করবেন। তখন আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাট চুকিয়ে চাকরি করছি। এরপর শুরু হলে তার অন্য রকম এক সংগ্রাম। ছোট ভাই তখনও স্কুলে। 

বন্ধের দিনগুলোতে প্রায় সাড়ে ৪শ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে রাজধানীতে আসতেন। সারাদিন ক্লাস করতেন তারপর আবার রাতে সাড়ে ৪শ কিলোমিটার পারি দিয়ে ঠাকুগাঁওয়ে ফিরতেন। পরের দিল আবার অফিস। এভাবেই ধীরে ধীরে তার ইচ্ছার দারপ্রান্তে এসে দাঁড়ালেন। আব্বা সব সময় আম্মাকে উৎসাহ দিয়েছেন, সাহস দিয়েছেন এটা বলতেই হয়। 

যা হোক, আম্মা অবসরে দিয়েছেন ২০১৯ সালে। আর আজ তিনি তার এমএসসি আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ করলেন। 

আমার মা খালাদের বিষয়ে আমি একটা কথা সব সময় বলি, তারা ধ্বংসস্তুপ থেকে আজ এ পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছেন। তাদের জীবন সংগ্রাম আরেকটি বিরাট গল্প। আজ আবার আম্মা প্রমাণ করলেন, চেষ্টা থাকলে সব বাঁধা ছুড়ে ফেলে সামনে এগিয়ে যাওয়া যায়। 

আব্বা আজ আমাদের মধ্যে নেই। কিন্তু আমি ঠিক জানি, তিনি যেখানেই আছেন খুব খুশি হচ্ছেন। মন খুলে আম্মাকে দোয়া করছেন। উই আর প্রাউড অফ ইউ আম্মা। কিপ গোয়িং। লাভ ইউ।


x

সর্বশেষ সংবাদ