আমেরিকা-চীন-রাশিয়া, পররাষ্ট্রনীতিতে কোনদিকে ঝুঁকছে বাংলাদেশ?

০৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:৩১ AM
প্রতীকী ম্যাপ

প্রতীকী ম্যাপ © সংগৃহীত

বাংলাদেশে বিএনপি সরকার ক্ষমতা গ্রহণের প্রায় দেড় মাস হতে চলেছে। নতুন এই সরকার ক্ষমতা নেওয়ার পরপরই পুরো বিশ্ব টালমাটাল হয়ে ওঠে ইরান যুদ্ধ ইস্যুতে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশও ভোগান্তিতে পড়েছে জ্বালানী সরবরাহ ঠিক রাখতে।

এরমধ্যেই দেশটির প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবীর সফর করছেন মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ। যার মূল লক্ষ্য ঐ অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক উন্নয়ন এবং যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের শ্রমিকদের খোঁজ-খবর নেওয়া। এছাড়া আগামী সপ্তাহে ভারত সফরের কথা আছে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর।

এর আগে দেশটিতে সফর করে যান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. পল কাপুর। সবমিলিয়ে পররাষ্ট্র সম্পর্কের ক্ষেত্রে ব্যস্ত এবং একইসঙ্গে ইরান যুদ্ধের কারণে কিছুটা জটিল সময় পার করছে বাংলাদেশ।

পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে কোনদিকে ঝুঁকছে বাংলাদেশ?
আওয়ামী লীগের ষোলো বছরের শাসনামলে বাংলাদেশ পরিচিত ছিলো মূলত ভারত ঘনিষ্ট দেশ হিসেবে। পরে শেখ হাসিনা সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর যখন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেয়, তখন ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক খুব দ্রুতই নিচে নেমে যায়।

তবে এই একইসময়ে আবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উষ্ণ সম্পর্ক তৈরি হয় বাংলাদেশের। এখন যখন বিএনপি সরকার ক্ষমতায় তখন স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন উঠছে, নতুন এই সরকার পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে কোন দিকে ঝুঁকছে? ভারত, চীন নাকি যুক্তরাষ্ট্র?

এক্ষেত্রে বাংলাদেশের নতুন সরকারের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম অবশ্য বলছেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি নির্দিষ্ট কোন দেশকে ঘিরে হচ্ছে না।

তিনি বলেন, ‘আমাদের নতুন সরকারের প্রায়োরিটি হচ্ছে, বাংলাদেশের মানুষের আগ্রহ কোথায় সেটা নিয়ে। আমাদের নীতি হচ্ছে, সকল দেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখা। আমাদের দ্বিপাক্ষিক এবং বহুপাক্ষিক সম্পর্কগুলোর প্রতিটিই নির্ধারিত হবে বাংলাদেশের স্বার্থকে সুরক্ষা করে। অর্থাৎ বাংলাদেশকে প্রাধান্য দিয়েই আমাদের ফরেন পলিসি হবে, নির্দিষ্ট কোন দেশকে ঘিরে নয়।‘

ইরান যুদ্ধকে ঘিরে মার্কিন ঘেঁষা নীতি নিচ্ছে বাংলাদেশ?
বাংলাদেশ তার বিদেশ নীতির ক্ষেত্রে সব দেশের সঙ্গে যে সুসম্পর্কের কথা বলছে সেটার ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে প্রথম বড় পরীক্ষা দিতে হচ্ছে, ইরান যুদ্ধকে ঘিরে।

দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশ তার প্রথম বিবৃতিতেই উপসাগরীয় দেশগুলোতে ইরানের হামলার সমালোচনা করেছে। বিপরীতে এড়িয়ে গেছে, ইরানে মার্কিন হামলাকে। বিবৃতিতে ইরানের পাল্টা হামলায় মধ্যপ্রাচ্যের ‘কয়েকটি দেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের ঘটনা‘ ঘটেছে দাবি করে এর নিন্দা জানিয়েছে বাংলাদেশ সরকার।

সমালোচনার মুখে অবশ্য বাংলাদেশ নতুন করে বিবৃতি দেয়। তবে এই বিবৃতি নিয়েও নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া এসেছে খোদ ইরানের তরফ থেকে।

গত বুধবার বাংলাদেশে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত জলিল রহিমি জাহানাবাদি প্রকাশ্যেই বলেছেন, ইরান ইস্যুতে বাংলাদেশের বিবৃতি ‘আরও স্পষ্ট হওয়া উচিত ছিল‘। একইসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশ ইরানে ‘আগ্রাসী শক্তির বিরুদ্ধে নিন্দা করবে‘ এমন প্রত্যাশা ছিলো তার দেশের।

একদিকে ইরান নিয়ে সমালোচিত বিবৃতি অন্যদিকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে করা মার্কিন বাণিজ্যচুক্তিকে সমর্থন -দুটো মিলিয়েই বাংলাদেশে কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ঝুঁকছে কিনা। সরকার অবশ্য এমন অভিযোগ নাকচ করছে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান এর আগে একাধিক ব্রিফিংয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের জানিয়েছেন, বাংলাদেশ জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়েই কাজ করছে।

তবে নানা প্রশ্ন এবং সমালোচনা হলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবীর অবশ্য বলছেন, বাংলাদেশের বিদেশ নীতি নির্দিষ্ট কোন দেশের দিকে ঝুঁকে গেছে এখনই সেই সিদ্ধান্ত টানার সময় আসেনি।

তিনি বলেন, ‘প্রথম স্টেটমেন্টে আমরা উপসাগরীয় অঞ্চলের ব্যাপারে বেশি মনোযোগী থেকেছি। ইরান আক্রমণ হয়েছে এ ব্যাপারে কিছু বলিনি। কিন্তু পরদিনই সরকারের দিক থেকে একটা বিবৃতি দিয়ে সেখানে ইরানের সুপ্রিম লিডার আয়াতুল্লাহ খামেনির মৃত্যুর জন্য শোক প্রকাশ করা হয়েছে। অর্থাৎ এটাকে তারা ব্যালেন্স করেছেন। সুতরাং যেহেতু এটা নতুন সরকার, আমি বোঝার জন্য তাদেরকে আরেকটু গ্রেস পিরিয়ড দেবো আরকি।‘

আমেরিকা-চীন-ভারতের পাল্টাপাল্টি স্বার্থে জটিলতা
বাংলাদেশে শুধু আমেরিকা নয়, অতীতে ভারত, চীন কিংবা রাশিয়ার মতো দেশগুলোকে ঘিরেও নানা টানাপোড়েন দেখা গেছে। কোন কোন ক্ষেত্রে দেশগুলোর ভূমিকা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলেছে।

এক্ষেত্রে ভারসাম্য রক্ষার কথা বলা হলেও অনেক সময় দেখা যায়, এক দেশের প্রকল্প অন্য দেশের ক্ষোভের কারণ। যেমন ভারত-চীনের ক্ষেত্রে তিস্তা প্রকল্প।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. লাইলুফার ইয়াসমিন মনে করেন, তিস্তা প্রকল্প হবে চীন-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ‘লিটমাস টেস্ট‘।

এ ধরনের ইস্যু যেখানে দুটি দেশের পাল্টাপাল্টি স্বার্থ আছে, সেখানে বাংলাদেশের মতো দেশের পক্ষে সিদ্ধান্ত নেয়া সহজ নয়। ফলে দেখা গেছে, তিস্তা প্রকল্প কয়েক বছর ধরে আলোচনা চললেও বাস্তবায়ন ঝুলে আছে। আওয়ামী লীগের মতোই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি।

তবে ড. লাইলুফার ইয়াসমিন মনে করেন দেশের স্বার্থ বিবেচনা করে যদি সকল দলের মধ্যে ঐকমত্য তৈরি করা যায়, তাহলে সেটা জাতীয় স্বার্থে যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে।

‘এখানে স্বার্থগুলো আসলে পরস্পর সাংঘর্ষিক হয়ে যায় অনেকসময়। কিন্তু যদি কোনো একটা ইস্যুতে বাংলাদেশে সব রাজনৈতিক দলের ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয় তাহলে সেটা নিয়ে সমালোচনা কম হবে। সেটা না করলে এই সন্দেহ তৈরি হবে যে, প্রকল্পটা হয়তো নির্দিষ্ট কোন একটা দেশকে কোনো একটা কারণে দেয়া হয়েছে। এটা একটা দলভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতি হয়ে যায়। যে কারণে একবার আপনি প্রো-চায়না হচ্ছেন, আরেকবার প্রো-ইনডিয়া হচ্ছেন, আরেকবার প্রো-আমেরিকা হচ্ছে। এটা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে,‘ বলেন ড. লাইলুফার ইয়াসমিন।

বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই ভারতের কাছে জ্বালানি সংকট মেটাতে অতিরিক্ত ডিজেলের চাহিদা দিয়েছে। পাশাপাশি আমেরিকার সঙ্গেও আছে উষ্ণ সম্পর্ক।

তবে গত ফেব্রুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেয়া তারেক রহমানকে লেখা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চিঠিতে এটা স্পষ্ট যে, আমেরিকা এই সম্পর্ককে যুক্ত করতে চায় তাদের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের সঙ্গে। কারণ চিঠিতে স্পষ্ট করেই ইন্দো-প্যাসিফিকের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এই ইস্যুতে আবার উদ্বেগ আছে চীনের।

ড. লাইলুফার ইয়াসমিন বলেন, আমেরিকার স্বার্থ দেখতে গিয়ে বাংলাদেশে চীনের বিনিয়োগ যেন বাধাগ্রস্ত না হয় সেটাও খেয়াল রাখতে হবে বাংলাদেশকে। কারণ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে চীনের বিনিয়োগ এবং অর্থের দরকার আছে।

জানতে চাইলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবীর বলেন, অতীতে বাংলাদেশ নির্দিষ্ট একটি দেশের দিকে ঝুঁকে পড়ায় এর নানা মাশুল দিতে হয়েছে। এমন ভুলের পুনরাবৃ্ত্তি করা যাবে না।

তিনি বলেন, ‘নিরাপত্তা দেখতে গেলে আমাদেরকে ভারতের সঙ্গে কাজ করতে হবে, ওদেরকেও আমাদের সঙ্গে কাজ করতে হবে। কারণ দুই দেশের দীর্ঘ সীমান্ত আছে। দ্বিতীয় বিবেচনা হচ্ছে, বাংলাদেশ প্রায় পঞ্চাশ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি করে। যেটা যায় ইউরোপ-আমেরিকায়। কিন্তু এই রপ্তানির কাঁচামাল আসে চীন-ভারত থেকে।‘

‘সুতরাং এখানে স্বার্থগুলো একটা চেইনের মতো। এখানে কাউকে বাদ দিয়ে অন্য কাউকে গ্রহণ করবো সেই সুযোগ নেই। এখানে কোন একটা পক্ষের সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক বা পক্ষপাতিত্ব করতে গেলেই জটিলতা তৈরি হবে।‘

‘কে নাখোশ হবে সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়‘
কিন্তু বিভিন্ন দেশের পারস্পরিক এমন স্বার্থের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নীতি আসলে কী হবে? এমন প্রশ্নে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের স্বার্থের জন্য যেটা ভালো হবে, সেটাই করা হবে। এক্ষেত্রে ‘কে নাখোশ হবে সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়।‘

তিনি বলেন, ‘দেখেন ভারতের সঙ্গে আমাদের তিস্তা নিয়ে ইস্যু আছে, পানি নিয়ে ইস্যু আছে, বাণিজ্য ঘাটতি, সীমান্ত ইস্যু আছে। এইসবগুলো ক্ষেত্রেই আমাদের দ্বিপাক্ষিক আলোচনার ভিত্তিতে সমাধান হবে। একইভাবে চীন, যুক্তরাষ্ট্রসহ সকল দেশের সঙ্গে একই নীতিতে সম্পর্কটা হবে। কে কোনটাতে নাখোশ হবে সেটার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বাংলাদেশের মানুষ কোনটাতে ভালো থাকবে।‘

‘বাংলাদেশের কোনটা ভালো সেটা নিশ্চিত করার পরে কোন দেশ কোনটাতে আগ্রহী আমরা সেটা তখন দেখবো। আমাদের আগে নিশ্চিত করত হবে দেশের মানুষ কী চায়।‘ বাংলাদেশ তার পররাষ্ট্রনীতি স্পষ্ট করছে। যেখানে গুরুত্ব পাচ্ছে সবার আগে বাংলাদেশ।

কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, প্রভাবশালী দেশগুলোও একইভাবে নিজেদের স্বার্থ দেখতে চায় এবং এর জন্য নানা চাপও তৈরি করে। সেই চাপ সামলানো বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। [সূত্র: বিবিসি বাংলা]

চট্টগ্রামে গ্রাফিতি আঁকতে আসা নারীকে ধাক্কা দিলেন পুলিশের ড…
  • ১৮ মে ২০২৬
পুণ্ড্র ইউনিভার্সিটি নিয়োগ দেবে শিক্ষক-কর্মকর্তা, আবেদন ৮ জ…
  • ১৮ মে ২০২৬
সাকিব-মাশরাফির ফেরার পথ বললেন ইশরাক
  • ১৮ মে ২০২৬
ইমরান খানের পতনে মার্কিন চাপ ছিল, গুরুত্বপূর্ণ ‘সাইফার’ নথি…
  • ১৮ মে ২০২৬
দুর্নীতির অভিযোগে কলেজ অধ্যক্ষের কক্ষে তালা
  • ১৮ মে ২০২৬
গাকৃবিতে সরকারি ক্রয় ও ভ্যাট ব্যবস্থাপনায় ৫ দিনব্যাপী প্রশি…
  • ১৮ মে ২০২৬
×
ADMISSION
GOING ON
SPRING 2026
APPLY ONLINE
UP TO 100% SCHOLARSHIP
UNIVERSITY OF ASIA PACIFIC 🌐 www.uap.ac.bd
Last Date of Application:
21 June, 2026
📞
01789050383
01714088321
01768544208
01731681081