প্রাথমিক শিক্ষকদের সংবাদ সম্মেলন © টিডিসি ফটো
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের ৩ দফা দাবি বাস্তবায়ন, মর্যাদা প্রতিষ্ঠা এবং বৈষম্য নিরসনের লক্ষ্যে ৬ পর্বের ধারাবাহিক আন্দোলনের ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি। মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) সকালে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির শফিকুল কবির মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির নীতি নির্ধারণী চেয়ারম্যান জনাব মোঃ সিরাজুল ইসলাম। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি জনাব মোঃ মোয়াজ্জেম হোসেন শাহীন এবং স্বাগত বক্তব্য দেন সাধারণ সম্পাদক জনাব খায়রুন নাহার লিপি।
শিক্ষকদের ঘোষিত ৩ দফা দাবির মধ্যে রয়েছে-
১১তম গ্রেড বাস্তবায়ন: ৯ম জাতীয় বেতনস্কেলের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সহকারী শিক্ষকদের জন্য অবিলম্বে ১১তম গ্রেড প্রদান করা।
২. উচ্চতর গ্রেড ও শতভাগ পদোন্নতি: ৯ম পে-স্কেল অনুযায়ী ৮ ও ১৪ বছর পূর্তিতে প্রাপ্য দুটি উচ্চতর গ্রেড নিশ্চিত করা এবং সহকারী শিক্ষক থেকে প্রধান শিক্ষক পদে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে শতভাগ পদোন্নতি চালুকরণ।
৩. হয়রানিমূলক বদলি ও মামলা প্রত্যাহার: সাধারণ সম্পাদক খায়রুন নাহার লিপিসহ সকল শিক্ষকের হয়রানিমূলক বদলির আদেশ বাতিল এবং দায়েরকৃত ভিত্তিহীন বিভাগীয় মামলাগুলো অবিলম্বে প্রত্যাহার।
ঘোষিত ৬ পর্বের কর্মসূচি
সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি তাদের পরবর্তী আন্দোলনের সূচি তুলে ধরে। এর মধ্যে রয়েছে-
১. সংবাদ সম্মেলন: আজ ২০ অক্টোবর (মঙ্গলবার) সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক সূচনা।
২. কালো ব্যাজ ধারণ ও দোয়া মাহফিল (৮ নভেম্বর, রবিবার): সারা দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা কালো ব্যাজ ধারণ করবেন। পাশাপাশি প্রয়াত শিক্ষক ফাতেমা আপার রুহের মাগফিরাত এবং গ্রেনেড হামলায় নিহত ও আহতদের স্মরণে কেন্দ্রীয় দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে।
৩. জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি (৮ নভেম্বর, রবিবার): একই দিনে দেশের প্রতিটি জেলায় শিক্ষক প্রতিনিধিদল জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) সঙ্গে সাক্ষাৎ করে দাবি সংবলিত স্মারকলিপি প্রদান করবেন।
৪. বিভাগীয় কমিশনারের কাছে স্মারকলিপি (১৭ ডিসেম্বর, বৃহস্পতিবার): বিভাগীয় শিক্ষক প্রতিনিধিরা বিভাগীয় কমিশনারদের কাছে স্মারকলিপি পেশ করবেন।
৫. মহাসমাবেশ (ডিসেম্বর ২০২৬): বার্ষিক পরীক্ষা শেষে দেশের সর্বস্তরের শিক্ষকদের অংশগ্রহণে ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার বা শাহবাগে মহাসমাবেশ আয়োজন করা হবে (তারিখ পরবর্তীতে চূড়ান্ত হবে)।
৬. অবস্থান ও অনশন কর্মসূচি: এসব কর্মসূচির পরও দাবি আদায়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হলে জাতীয় প্রেস ক্লাব বা শাহবাগে এক দফা দাবিতে অবস্থান ও আমরণ অনশন কর্মসূচি পালন করবেন শিক্ষকরা।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন ও শিক্ষকদের সঠিক মর্যাদা ফিরিয়ে দিতে এই ৩ দফা দাবির যৌক্তিক সমাধান জরুরি। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত রাজপথের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে বলে হুঁশিয়ারি দেন শিক্ষক নেতারা।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকরা দীর্ঘদিন ধরে তাঁদের ন্যায্য দাবি আদায়ে ধারাবাহিকভাবে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন পরিচালনা করে আসছেন। সরকারের সদয় বিবেচনায় দাবি বাস্তবায়িত হবে—এই আশায় শিক্ষকরা অপেক্ষায় ছিলেন। কিন্তু দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ায় দাবি আদায়ে গত ৮ থেকে ১০ নভেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ‘প্রাথমিক শিক্ষক দাবি বাস্তবায়ন পরিষদ’-এর ব্যানারে সারা দেশ থেকে আগত সহকারী শিক্ষকরা ১০ম গ্রেডের দাবিতে পুনরায় শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেন।
দুর্ভাগ্যবশত, আন্দোলনের প্রথম দিন (৮ নভেম্বর ২০২৫) শাহবাগ এলাকায় পুলিশের টিয়ার গ্যাস, সাউন্ড গ্রেনেড, রাবার বুলেট ও লাঠিচার্জে অসংখ্য শিক্ষক আহত হন। পরবর্তীতে অসুস্থ অবস্থায় ফাতেমা নামে একজন শিক্ষিকা মৃত্যুবরণ করেন। এ ছাড়া সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক জনাবা খায়রুন নাহার লিপিসহ প্রায় দুই শতাধিক সহকারী শিক্ষক গুরুতর আহত অবস্থায় চিকিৎসাধীন ছিলেন।
পরিস্থিতি পর্যালোচনার লক্ষ্যে ৯ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাননীয় সচিব মহোদয়ের সভাপতিত্বে এবং উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে শিক্ষক প্রতিনিধি দলের সঙ্গে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত বৈঠকে শিক্ষকদের ৩ দফা দাবির সাথে একাত্মতা প্রকাশ করা হয় এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের সচিব মহোদয়ের সাথে বৈঠকের সময় নির্ধারণ করে প্রেস বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়।
পরদিন, ১০ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে অর্থ মন্ত্রণালয়ের মাননীয় সচিব মহোদয়ের সভাপতিত্বে উভয় মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে পুনরায় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে সহকারী শিক্ষকদের ন্যায্য দাবি বিবেচনা করে উভয় মন্ত্রণালয় শিক্ষকদের ১১তম গ্রেড প্রদানে সম্মতি প্রকাশ করে।
উভয় মন্ত্রণালয়ের এই ইতিবাচক ও মানবিক সিদ্ধান্তে শিক্ষক সমাজ সন্তুষ্টি প্রকাশ করে আন্দোলন স্থগিত করে এবং পাঠদানে ফিরে যায়। সেদিন রাতেই প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রধান তথ্য কর্মকর্তা একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেন, যা পরবর্তীতে মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা মহোদয়ের কার্যালয়ের ভেরিফাইড ফেসবুক পেজে জনস্বার্থে প্রচারিত হয়।
সরকারের উচ্চপর্যায়ের ঘোষণার পর শিক্ষক সমাজে স্বস্তি ফিরে আসলেও, এই সিদ্ধান্তটি এখনো প্রজ্ঞাপন আকারে সরকারি গেজেটে প্রকাশিত হয়নি। ফলে মাঠপর্যায়ে বিভ্রান্তি ও মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। ইতিমধ্যে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সহকারী শিক্ষকদের বেতন ১১তম গ্রেডে উন্নীতকরণের বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে গত ১১ মার্চ ২০২৬ তারিখে সচিব, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়কে পত্র জারি করে। কিন্তু এর পরও আশানুরূপ কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় শিক্ষক সমাজ চরম হতাশায় দিন কাটাচ্ছে।
অন্যদিকে, সম্প্রতি প্রধান শিক্ষকদের বেতন স্কেল ১০ম গ্রেডে উন্নীত করায় প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকদের মধ্যে ৩টি গ্রেডের বিশাল ব্যবধান তৈরি হয়েছে (অথচ একসময় উভয় পদেই শিক্ষকরা একই গ্রেডে কর্মরত ছিলেন)।