১৭ বছর নিরাপদ দূরত্বে থাকা ‘হাইব্রিডরা’ এখন নেতৃত্বের কাছাকাছি, উপেক্ষিত ত্যাগীরা: ফেসবুক পোস্টে ক্ষোভের চিত্র তুলে ধরলেন তিনি
এমপি শাহাদাৎ হোসেন সেলিম © সংগৃহীত
বিপুল জনসমর্থন নিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার পর বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ে ক্ষোভ, হতাশা ও অসন্তোষের আলোচনা চলছে। তবে দলের তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভের চেয়ে অভিমানের তীব্রতাই বেশি বলে মনে করছেন বিএনপির সংসদ সদস্য শাহাদাৎ হোসেন সেলিম। তাঁর মতে, দীর্ঘদিন আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা রাখা পরীক্ষিত ও ত্যাগী নেতাকর্মীদের অনেকে এখন নিজ দলেই উপেক্ষিত। অন্যদিকে দীর্ঘ ১৭ বছর নিরাপদ দূরত্বে থাকা অনেকেই নেতৃত্বের কাছাকাছি চলে এসেছেন। এমনকি তাঁদের কেউ কেউ এখন দলীয় পদ-পদবিরও দাবিদার হচ্ছেন।
শনিবার (৭ নভেম্বর) নিজের ফেসবুক পোস্টে বিএনপির তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মনোভাব ও দলের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়ে এমন পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন তিনি।
পোস্টে শাহাদাৎ হোসেন সেলিম লেখেন, বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকেই রাজনৈতিক অঙ্গনে দলের তৃণমূল পর্যায়ে ক্ষোভ, হতাশা ও অসন্তোষের বিষয়টি আলোচিত হচ্ছে। এ নিয়ে তিনি বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলেছেন, তাঁদের কথা শুনেছেন এবং পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করেছেন। তাঁর উপলব্ধি, তৃণমূলে ক্ষোভের চেয়ে অভিমানের তীব্রতাই বেশি। এই অভিমান নিজেদের প্রতি, দলের প্রতি, এমনকি প্রিয় নেতৃত্বের প্রতিও।
তৃণমূলের নেতাকর্মীরা খুব বেশি কিছু চান না উল্লেখ করে এই সংসদ সদস্য বলেন, তাঁরা চান স্বীকৃতি, মর্যাদা ও সম্মান। বিজয়ের পেছনে তাঁদের ত্যাগ, শ্রম, সাহস ও অবদান নেতৃত্ব ভুলে যায়নি—শুধু একবার নেতৃত্বের মুখ থেকে এই স্বীকৃতিটুকু শুনতে চান তাঁরা।
দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামে তৃণমূলের অবদানের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, বছরের পর বছর যাঁরা রাজপথে থেকেছেন, খেয়ে না খেয়ে দলের কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছেন, জীবনের ঝুঁকি নিয়েছেন, হামলা-মামলা ও জেল-জুলুম সহ্য করেছেন এবং স্বৈরাচারের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে লড়াই চালিয়ে গেছেন, তাঁদের অনেকেই আজ নিজেদের দলের ভেতরেই যেন পরবাসী। তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সবচেয়ে বেশি কষ্টের জায়গা এটি।
বিএনপিতে সুবিধাভোগী ও নতুন করে দলে সক্রিয় হওয়া ব্যক্তিদের নেতৃত্বের কাছাকাছি চলে আসার বিষয়টিও তুলে ধরেছেন শাহাদাৎ হোসেন সেলিম। তাঁর ভাষ্য, যাঁদের কটূক্তি ও তুচ্ছতাচ্ছিল্য সহ্য করে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে রাজপথে লড়াই করেছেন ত্যাগী নেতাকর্মীরা, তাঁদের অনেকেই আজ দলের সামনের সারিতে। দীর্ঘ ১৭ বছর যাঁরা নিরাপদ দূরত্বে ছিলেন, তাঁদের অনেকেই এখন নেতৃত্বের কাছাকাছি। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে এসব ‘হাইব্রিড’ পদ-পদবির দাবিদার হিসেবেও নিজেদের জাহির করছেন। বিপরীতে দুঃসময়ের পরীক্ষিত ও ত্যাগী কর্মীরা উপেক্ষিত হচ্ছেন।
তবে দলে নতুন মানুষের অন্তর্ভুক্তি ও নতুন নেতৃত্ব তৈরির বিরোধিতা করেননি এই সংসদ সদস্য। তিনি বলেন, দলকে আরও বিস্তৃত ও শক্তিশালী করতে নতুন মানুষ আসবে, নতুন নেতৃত্ব তৈরি হবে। কিন্তু নতুনদের জায়গা করে দিতে গিয়ে পুরোনো ত্যাগীদের অবদান যেন বিস্মৃত না হয়।
তৃণমূলের অভিমানকে পদ-পদবি কিংবা ব্যক্তিগত সুবিধা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা হিসেবে দেখতে নারাজ শাহাদাৎ হোসেন সেলিম। তাঁর মতে, এটি রাজনৈতিক অস্তিত্ব, আত্মমর্যাদা এবং দীর্ঘদিনের ত্যাগের স্বীকৃতি পাওয়ার আকুতি।
দলের হাইকমান্ডের প্রতি বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন হওয়া উচিত তাঁদের ত্যাগ, সাহস, অবদান ও পরীক্ষিত রাজনৈতিক ভূমিকার ভিত্তিতে। যার যতটুকু অবদান, তিনি যেন ততটুকু সম্মান ও স্বীকৃতি পান।
পোস্টে বিএনপির সাংগঠনিক শক্তির ভিত্তি হিসেবে তৃণমূলের গুরুত্ব তুলে ধরে এই সংসদ সদস্য আরও বলেন, ক্ষমতায় যাওয়ার পথ তৈরি করে দেয় তৃণমূল। সেই তৃণমূলকে অবহেলা করে কোনো রাজনৈতিক দলের দীর্ঘমেয়াদি শক্তি ও ভিত্তি টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়।
তৃণমূলের অভিমান ভাঙানোর আহ্বান জানিয়ে তিনি লেখেন, নেতাকর্মীদের হৃদয়ে এই বিশ্বাস ফিরিয়ে দিতে হবে যে এই দল তাঁদেরও, এই বিজয় তাঁদেরও এবং রাষ্ট্র পরিচালনার স্বপ্নেও তাঁদের সমান অংশীদারত্ব রয়েছে। কারণ তৃণমূল শুধু দলের শক্তি নয়, তৃণমূলই দলের প্রাণ।