প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান © সংগৃহীত
বাংলাদেশকে বৈশ্বিক উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে জাপানি বিনিয়োগকারীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, ১৮ কোটির বেশি মানুষের বড় বাজার, তরুণ কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী এবং ক্রমবর্ধমান উৎপাদন সক্ষমতা বাংলাদেশকে বিনিয়োগের জন্য সম্ভাবনাময় গন্তব্যে পরিণত করেছে। জ্বালানি, প্রযুক্তি, মহাকাশ গবেষণা, উঁচু সড়ক ও দ্রুতগতির রেল যোগাযোগব্যবস্থাসহ গুরুত্বপূর্ণ খাতে জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগ ও সহযোগিতা চেয়েছেন তিনি।
আজ বুধবার (২৮ অক্টোবর) জাপানের জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (জেট্রো) হলে ‘বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক ফোরাম সংলাপে’ মূল বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
বক্তব্যের শুরুতে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে দেশটি সফরের সুযোগ পেয়ে সম্মানিত বোধ করছেন বলে জানান তারেক রহমান। মঙ্গলবার জাপানের প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর দলের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের ফলপ্রসূ দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠকের কথাও উল্লেখ করেন তিনি। দুই দেশের ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের শীর্ষ প্রতিনিধিদের একত্র করার জন্য বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক ফোরামকে ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী।
বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে জাপানের বিশেষ স্থান রয়েছে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর প্রথম দিকেই দেশটিকে স্বীকৃতি দিয়েছিল জাপান। এরপর থেকে দেশটি বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে পাশে রয়েছে। দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার জন্য জাপানের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি।
আগামী ৩০-৫০ বছরের অংশীদারত্বে গুরুত্ব
বাংলাদেশ ও জাপানের সম্পর্ক আগামী ৩০ থেকে ৫০ বছরে কোন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া যায়, এখন সেই পরিকল্পনা করার সময় বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৮ কোটির বেশি এবং মানুষের গড় বয়স ২৭ বছর। দেশটিতে রয়েছে তরুণ ও প্রশিক্ষণযোগ্য কর্মশক্তি। প্রতিবছর প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার শিক্ষার্থী প্রকৌশলে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।
তারেক রহমান বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের নবম বৃহত্তম ভোক্তা অর্থনীতিতে পরিণত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ক্রমবর্ধমান সচ্ছল মধ্যবিত্ত শ্রেণির কারণে ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশের বার্ষিক মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) এক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রত্যাশা রয়েছে।
বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সম্পর্ক আরও জোরদার করতে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) স্বাক্ষরের কথা উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, অন্য কোনো দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের এ ধরনের প্রথম চুক্তি এটি। তিনি বলেন, উন্নয়ন সহযোগিতার মধ্য দিয়ে দুই দেশের অংশীদারত্বের সূচনা হয়েছিল। এখন বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার মাধ্যমে সম্পর্ককে নতুন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার সময় এসেছে।
সম্প্রতি স্বাক্ষরিত অর্থনৈতিক সহযোগিতা কাঠামো চুক্তির আওতায় বাংলাদেশের ৭ হাজার ৩৭৯টি পণ্য শুল্কমুক্তভাবে জাপানের বাজারে প্রবেশের সুযোগ পাবে বলে জানান তারেক রহমান। একইভাবে ইস্পাত, মোটরযানের যন্ত্রাংশ ও ইলেকট্রনিক উপাদানসহ বিভিন্ন জাপানি পণ্য বাংলাদেশে অগ্রাধিকারমূলক বাজারসুবিধা পাবে। বিনিয়োগ, সেবা ও শুল্কসংক্রান্ত প্রক্রিয়ায় সহজতর নিয়মের সুবিধাও দুই দেশের বিনিয়োগকারীরা পাবেন বলে জানান তিনি।
ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে সরকারের উদ্যোগ
বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগের বিষয়গুলো সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাপানি কোম্পানিগুলো প্রধানত তিনটি বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। এগুলো হলো নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ, কার্যকর অবকাঠামো এবং শুল্ক ছাড় ও করব্যবস্থায় পূর্বানুমানযোগ্যতা। এসব উদ্বেগের কথা সরকার শুনেছে এবং কিছু সমস্যার সমাধান করা হয়েছে। বাকি বিষয়গুলো সমাধানেও কাজ চলছে।
তারেক রহমান বলেন, ব্যবসা পরিচালনার জন্য স্থিতিশীলতা ও নিশ্চয়তা প্রয়োজন। বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন করতে হবে। এ দুটো নিশ্চিত করার মতো পরিবেশ তৈরি করা সরকারের দায়িত্ব। বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পরিবর্তন সম্পর্কে সংলাপে তাঁর দলের সদস্যরা বিস্তারিত তুলে ধরবেন বলেও জানান তিনি।
বৈশ্বিক উৎপাদনকেন্দ্র হবে বাংলাদেশ
বাংলাদেশে কারখানা স্থাপন করলে জাপানি বিনিয়োগকারীরা একদিকে দেশের বড় ও ক্রমবর্ধমান অভ্যন্তরীণ বাজারে প্রবেশের সুযোগ পাবেন, অন্যদিকে এখান থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পণ্য রপ্তানি করতে পারবেন বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি জানান, জাপানের কয়েকটি মোটরযান উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, বড় খুচরা বিক্রেতা এবং কৃষিযন্ত্র প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে আড়াইহাজারে জাপানি অর্থনৈতিক অঞ্চলে কারখানা স্থাপনের উদ্যোগ নিচ্ছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে বাংলাদেশ সরকার প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেবে।
ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে জ্বালানি, প্রযুক্তি ও মহাকাশ গবেষণা এবং যোগাযোগ অবকাঠামো—এ তিনটি বিস্তৃত ক্ষেত্রে জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগ ও সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী।
জ্বালানি নিরাপত্তায় জাপানের সহযোগিতা চান
প্রধানমন্ত্রী বলেন, যেকোনো দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী জ্বালানি অপরিহার্য। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের জন্য জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়; বরং এটি অত্যন্ত জরুরি।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ জ্বালানির চাহিদা নিরূপণ, জ্বালানি অবকাঠামো উন্নয়ন, দক্ষ বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রকল্পে অংশ নিতে জাপানি কোম্পানিগুলোর প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
প্রযুক্তি ও মহাকাশ গবেষণায় যৌথ উদ্যোগ
প্রযুক্তি খাতে সহযোগিতার সম্ভাবনা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশে একটি বাংলাদেশ-জাপান প্রযুক্তি পার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে সরকার। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্লাউড কম্পিউটিং, রোবোটিকস ও ইলেকট্রনিকস উৎপাদনকে কেন্দ্র করে উদ্ভাবননির্ভর তথ্যপ্রযুক্তি পার্ক প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে জাপানি কোম্পানি, বিশ্ববিদ্যালয় ও বিনিয়োগকারীদের সম্পৃক্ত করতে আগ্রহী বাংলাদেশ।
মহাকাশ প্রযুক্তিতেও দুই দেশের সহযোগিতার সুযোগ রয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। মহাকাশবিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও স্যাটেলাইট প্রকৌশলে জাপানের উন্নত সক্ষমতা এবং দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ খাতে জাপানের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে পারস্পরিক লাভজনক সহযোগিতার সুযোগ খুঁজতে চায় বাংলাদেশ।
ছয় বিভাগীয় শহর যুক্ত হবে উঁচু সড়ক ও দ্রুতগতির রেল
উৎপাদনশীল অর্থনীতির বিকাশে দেশের শহর ও গ্রাম, কারখানা ও বন্দরের মধ্যে উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, এমন একটি পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলা বাংলাদেশের লক্ষ্য, যা মানুষকে কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সুযোগের সঙ্গে যুক্ত করবে এবং দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পণ্য পরিবহন সহজ করবে।
এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে দেশের ছয়টি প্রধান বিভাগীয় শহরকে যুক্ত করে দেশব্যাপী উঁচু সড়ক ও দ্রুতগতির রেল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা জানান তিনি।
তারেক রহমান বলেন, অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে জাপান বিশ্বজুড়ে সুপরিচিত। তাই দেশব্যাপী উঁচু সড়ক ও রেল নেটওয়ার্কের মহাপরিকল্পনা তৈরিতে জাপানের সহযোগিতা চায় বাংলাদেশ। পরবর্তী সময়ে সম্ভাবনাময় প্রকল্পগুলোতে বিনিয়োগ ও অর্থায়নের ক্ষেত্রেও জাপানের সহযোগিতা স্বাগত জানাবে সরকার।
বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের জাপানি ভাষা শেখানোর উদ্যোগ
বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্ককে শুধু অর্থনৈতিক সহযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চান না জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দুই দেশের সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি মানুষে-মানুষে যোগাযোগ।
প্রতিবছর বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষার জন্য জাপানে যান এবং সেখান থেকে দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। দেশে ফিরে তাঁরা দুই দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণে সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করেন।
তারেক রহমান জানান, বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের জাপানি ভাষা শেখানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যা সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। ভবিষ্যতে বাংলাদেশের লাখো তরুণ জাপানি ভাষা শিখবেন এবং দুই দেশের সম্পর্ক আরও গভীর করতে ভূমিকা রাখবেন বলে প্রত্যাশা করেন তিনি।
জাপানি বিনিয়োগকারীদের নতুন বিনিয়োগের আহ্বান
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে জাপানি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাংলাদেশে নতুন বিনিয়োগের আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, বাংলাদেশের উন্নয়নের ভিত্তি গড়ে তোলার সময় জাপান পাশে ছিল। এখন দেশের শিল্প খাত সম্প্রসারণ, নতুন সুযোগ সৃষ্টি এবং যৌথভাবে এগিয়ে যাওয়ার জন্য জাপানি বিনিয়োগকারীদের আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে।
তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশ ও জাপানের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বকে আরও শক্তিশালী অংশীদারত্বে রূপান্তর করাই তাঁদের লক্ষ্য। দুই দেশের মানুষ ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের জন্য পারস্পরিক সুযোগ সৃষ্টি এবং উভয় দেশের সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।