বা থেকে প্রথমে জহির উদ্দিন স্বপন, মাঝখানে ইশরাক হোসেন, শেষে দীপেন দেওয়ান © টিডিসি সম্পাদিত
সরকার গঠনের মাত্র আট মাসের মধ্যে বিএনপি সরকারের তিন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর পদত্যাগ ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা তৈরি হয়েছে। তাদের মধ্যে কেউ পদত্যাগপত্রে শারীরিক অসুস্থতার কথা উল্লেখ করেছেন, কেউ মন্ত্রিত্ব ছাড়ার পর পেয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টার দায়িত্ব, আবার কারও পদত্যাগের পেছনে রয়েছে বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের অভিযোগ।
সর্বশেষ আজ সোমবার (১৯ অক্টোবর) মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে নতুন করে আলোচনায় এসেছে সরকারে দায়িত্ব পালন, জবাবদিহি এবং মন্ত্রিসভার সদস্যদের ভূমিকার বিষয়টি। এসব পদত্যাগের পেছনে কী ছিল, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে নানা আলোচনা থাকলেও সব ক্ষেত্রে জোরপূর্বক পদত্যাগের অভিযোগ কিছুটা থেকেই যায়।
সবশেষ পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ও ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ইশরাক হোসেন। গত শনিবার (১৭ অক্টোবর) রাজধানীর গেন্ডারিয়া এলাকায় রেললাইন সংলগ্ন একটি বস্তিতে মাদকবিরোধী অভিযানে অংশ নেন তিনি। এ সময় তার হাতে এবং সঙ্গে থাকা কয়েকজনের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র দেখা যায়। অস্ত্র উঁচিয়ে অভিযান পরিচালনার ভিডিও নিজের ফেসবুক পেজে প্রকাশ করেন ইশরাক। ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা শুরু হয়। বিষয়টি নিয়ে বিএনপি ও সরকারের ভেতরেও অস্বস্তি তৈরি হয় বলে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা রয়েছে।
এরপর গতকাল রোববার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ইশরাককে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের নির্দেশ দেন বলে জানা যায়। সেই নির্দেশনার পর আজ দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগের ঘোষণা দেন তিনি।
ইশরাকের পদত্যাগের বিষয়ে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা, কেউ যদি মানুষের প্রত্যাশার পরিপন্থি কোনো কাজ করেন, সেটা তার যত কাছের মানুষই হোন না কেন, সে বিষয়ে তিনি যে সিদ্ধান্ত নেওয়ার, সেটাই নেবেন। তিনি ইতোমধ্যে সেটা প্রমাণ করেছেন। আমরা কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নই। সুতরাং এটা আমাদের সবার মাথায় রাখতে হবে।’
ইশরাকের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে আবারও আলোচনায় এসেছে বিএনপি সরকারের আগের দুই মন্ত্রীর পদত্যাগের ঘটনা। তারা হলেন পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান এবং তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। তাদের পদত্যাগের কারণ ও পরবর্তী দায়িত্ব নিয়ে সে সময় রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা হয়েছিল।
দায়িত্ব নেওয়ার সাড়ে তিন মাসের মাথায় গত ১ জুন পদত্যাগ করেন পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান। ওই দিন সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে পদত্যাগপত্র জমা দেন তিনি। পরে তা গৃহীত হয়। পদত্যাগপত্রে তিনি শারীরিক অসুস্থতার কথা উল্লেখ করেন।
পদত্যাগপত্রে দীপেন দেওয়ান লেখেন, ‘দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে আমি শারীরিক নানা জটিলতায় ভুগছি। আমার শারীরিক অসুস্থতার কারণে মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত কাজের দায়িত্ব পালনে নানাবিধ সমস্যা তৈরি হচ্ছে। বর্তমান সরকারের উন্নয়ন ও প্রশাসনিক কাজের গতিশীলতা বাড়াতে আমার বর্তমান পদ (মন্ত্রী) থেকে অব্যাহতি গ্রহণ করা আবশ্যক বলে মনে করছি।’
তবে তার পদত্যাগের পর রাজনৈতিক অঙ্গনে শারীরিক অসুস্থতার বাইরেও বিভিন্ন কারণ নিয়ে আলোচনা হয়। পার্বত্য জেলা পরিষদ পুনর্গঠন, চেয়ারম্যান পদে সুপারিশ নিয়ে মতপার্থক্য, রাঙামাটি বিএনপির অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম পরিচালনা ও নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়গুলো আলোচনায় আসে।
দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগের পর তাকে পুনর্বহাল ও পদত্যাগপত্র প্রত্যাহারের দাবিতে রাঙামাটি শহরে বিক্ষোভ করেন তার অনুসারী-সমর্থকেরা। তাদের অভিযোগ ছিল, মন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়েছে। তবে পদত্যাগপত্রে দীপেন দেওয়ান নিজেই শারীরিক অসুস্থতার কথা উল্লেখ করেছিলেন।
অন্যদিকে, গত ২২ আগস্ট তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন জহির উদ্দিন স্বপন। তবে একই দিন তাকে মন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এর আগের দিন তথ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পান আন্দালিভ রহমান পার্থ।
জহির উদ্দিন স্বপনের মন্ত্রিত্ব ছাড়ার ঘটনাটিও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা তৈরি করে। একই দিনে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ পাওয়ায় তার দায়িত্ব পরিবর্তনের বিষয়টি স্পষ্ট হলেও কেন তাকে মন্ত্রীর পদ থেকে সরানো হয়েছিল, সে বিষয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা হয়। কেউ কেউ একে মন্ত্রিত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনা হিসেবে দেখলেও পদত্যাগের পেছনে জোটের শরিক দলকে সুবিধা দেওয়ার কারণ হিসেবে জানা যায়।
তিনটি পদত্যাগের প্রেক্ষাপটই ভিন্ন। দীপেন দেওয়ান শারীরিক অসুস্থতার কথা উল্লেখ করে পদত্যাগ করেন, জহির উদ্দিন স্বপন মন্ত্রিত্ব ছাড়ার দিনই প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টার দায়িত্ব পান আর ইশরাক হোসেনের পদত্যাগের আগে অস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযানে অংশ নেওয়ার ভিডিও নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয়।