কুয়েটের রক্তদাতাদের সংগঠন ড্রিম © সংগৃহীত
‘রক্ত লাগবে’—হাসপাতাল থেকে এমন ফোন এলেই শুরু হয় ডোনার খোঁজ। রাত হোক কিংবা দিন, ক্লাস-ল্যাব বা ব্যক্তিগত ব্যস্ততার মধ্যেও রোগীর জন্য রক্তের ব্যবস্থা করতে ছুটে যান খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ড্রিমের সদস্যরা। সংগঠনটির মাধ্যমে প্রতি মাসে ৫০ থেকে ৭০ ব্যাগ এবং বছরে প্রায় ৬০০ থেকে ৮০০ ব্যাগ রক্ত দেওয়া হয় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
২০০৫ সালে ‘ডোনেট ব্লাড, সেভ লাইফ’ স্লোগান নিয়ে যাত্রা শুরু করে ড্রিম। বর্তমানে সংগঠনটির স্বেচ্ছাসেবীর সংখ্যা প্রায় ১০০। সংগঠনটির সব রক্তদাতাই কুয়েটের শিক্ষার্থী। নতুন ব্যাচ ক্যাম্পাসে আসার পর তাদের রক্তের গ্রুপের তথ্য সংগ্রহ করা হয়। পরবর্তীতে কোনো রোগীর রক্তের প্রয়োজন হলে সেই তথ্যভান্ডার থেকে ডোনারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন স্বেচ্ছাসেবীরা।
ড্রিমের স্বেচ্ছাসেবী মোঃ জাহিদ হাসান বিইসিএম-২২ ব্যাচের শিক্ষার্থী, জানান, খুলনার বিভিন্ন হাসপাতালের ব্লাড ব্যাংকে সংগঠনটির যোগাযোগ নম্বর দেওয়া থাকে। রোগীর স্বজনরা যোগাযোগ করলে তারা ডোনার ম্যানেজ করেন। সাধারণত কুয়েট মেডিকেল সেন্টার থেকে রক্ত সংগ্রহ করা হয়। জরুরি পরিস্থিতিতে ডোনারকে সঙ্গে নিয়ে শহরের হাসপাতালেও যান স্বেচ্ছাসেবীরা।
জাহিদ বলেন, সারাদিন ক্লাস-ল্যাব করার পর অনেক শিক্ষার্থী রাতে শহরে গিয়ে রক্ত দিতে আগ্রহী হন না। তারপরও রোগীর কথা বিবেচনা করে তাদের অনুরোধ করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।
একটি ঘটনা স্মরণ করে জাহিদ বলেন, এক সাবেক কুয়েট শিক্ষার্থী রাত ৩টার দিকে ও নেগেটিভ রক্তের জন্য ফোন করেছিলেন। সকাল ৭টা পর্যন্ত চেষ্টা করেও রক্তের ব্যবস্থা করতে পারেননি তিনি। অন্যদিকে, রাত ২টার দিকে ১২ দিনের এক শিশুর জন্য জরুরি রক্তের প্রয়োজন হলে জুনিয়র এক শিক্ষার্থীকে সঙ্গে নিয়ে শহরের হাসপাতালে যান তিনি। রক্ত দেওয়ার পর শিশুটির স্বজনরা আন্তরিকভাবে তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। অনেকে আবার একাধিকবার ফোন দিয়েও খোঁজখবর নেন। জরুরী পরিস্থিতিতে রক্তের জন্য রোগীর স্বজনদের উৎকণ্ঠা এবং রক্তদাতাদের প্রতি তাদের আন্তরিক দোয়াই স্বেচ্ছাসেবকদের অনুপ্রেরণা বলে মনে করেন জাহিদ।
ড্রিমের এজিএস তাইফুর রহমান, ইইই-২২ ব্যাচের শিক্ষার্থী, বলেন, রক্তের প্রয়োজনের ফোন যেমন আসে, তেমনি কখনো এমন খবরও আসে—যার জন্য নিয়মিত রক্ত নেওয়া হতো তিনি আর বেঁচে নেই। আবার থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত এক শিশুর জন্য নিয়মিত রক্তের ব্যবস্থা করতে গিয়ে তার পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। মানুষের ভালোবাসা ও দোয়া তাদের কাজের অনুপ্রেরণা বলে জানান তিনি।
ড্রিমের নিয়মিত রক্তদাতাদের একজন আব্দুল্লাহ শেখ, বিইসিএম-২২ ব্যাচের শিক্ষার্থী। প্রথমবার রক্ত দিতে না পারার একটি ঘটনা থেকেই নিয়মিত রক্তদানে আগ্রহী হন তিনি। এখন পর্যন্ত চারবার রক্ত দিয়েছেন। আরেক ডোনার মুশফিকুর রহমান তৌফিক পাঁচবার এবং রাতুল ছয়বার রক্ত দিয়েছেন।
তৌফিক বলেন, ‘অন্য কাউকে সাহায্য করলে অন্যরকম একটা শান্তি লাগে। সাধ্যের মধ্যে সবসময় মানুষকে উপকার করার চেষ্টা করা থেকেই রক্তদানে উৎসাহ পেয়েছি।’
রক্তদানের পাশাপাশি রক্তের গ্রুপ নির্ণয় ও সচেতনতামূলক কার্যক্রমও পরিচালনা করে ড্রিম। মাঝেমধ্যেই তারা খুলনা-যশোরের কোনো এক প্রত্যন্ত গ্রামে গিয়ে স্কুলশিক্ষার্থীদের রক্তের গ্রুপ নির্ণয় এবং রক্তদানের বিষয়ে সচেতন করেন।
তবে সংগঠনটির কার্যক্রমে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। জাহিদের মতে, কুয়েট থেকে খুলনা শহরের দূরত্বের কারণে জরুরি সময়ে ডোনার পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। সারাদিনের ক্লাস, ল্যাব ও অন্যান্য ব্যস্ততার মধ্যে দুই-তিন ঘণ্টা সময় ব্যয় করে শহরে গিয়ে রক্ত দিতে অনেক শিক্ষার্থী অনাগ্রহী হন। এ ছাড়া কুয়েট মেডিকেল সেন্টারে পর্যাপ্ত দক্ষ জনবল না থাকায় কখনো কখনো শিক্ষার্থীদের রক্তদানের অভিজ্ঞতা নেতিবাচক হয় বলেও জানান তিনি।
তবুও রক্তের প্রয়োজনে ফোন এলে ছুটে যান ড্রিমের স্বেচ্ছাসেবী ও ডোনাররা। তাদের কাছে রক্তদান শুধু একটি সংগঠনের কার্যক্রম নয়, বরং বিপদের সময়ে একজন মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ।