গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা © সংগৃহীত
চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে বাড়ছে অপরাধের নানা ঘটনা। সীমান্তপথে অবৈধভাবে গরু ও বিভিন্ন পণ্য প্রবেশ, সাগরপথে ইউরিয়া সার পাচার, অর্থনৈতিক অঞ্চলে সরঞ্জাম চুরি, মাদক কারবার, ছিনতাই ও কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এসব অপরাধ নিয়ন্ত্রণে বিশেষ অভিযান চালাচ্ছে জোরারগঞ্জ থানা-পুলিশ। গত ছয় মাসে বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে ৭২৩ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এ সময়ে বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধার করা হয়েছে, যার আনুমানিক বাজারমূল্য ৪ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১ মে থেকে ৪ নভেম্বর পর্যন্ত অভিযানে ১ লাখ ২৮ হাজার ৮৯৮টি ইয়াবা, ৪৩৭ কেজি গাঁজা, ১ হাজার ৯৬ লিটার দেশীয় তৈরি মদ ও ১৬৭ বোতল বিদেশি মদ উদ্ধার করা হয়েছে। মাদকদ্রব্য উদ্ধারের ঘটনায় ১০৮টি মামলা করা হয়েছে। এসব মামলায় ১২৬ জন মাদক কারবারিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। একই সময়ে চুরি, ডাকাতি ও চোরাচালানের ঘটনায় বিপুল পরিমাণ মালামাল উদ্ধার, অস্ত্রসহ দুই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার এবং চারটি হত্যা মামলার ছয় পলাতক আসামিকে গ্রেপ্তারের তথ্য জানিয়েছে থানা-পুলিশ।
পুলিশের বিবরণী অনুযায়ী, ছয় মাসে ১৩৬টি চুরির ঘটনায় চুরি যাওয়া একটি ড্রাম ট্রাক, দুটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা, একটি পালসার মোটরসাইকেল, একটি ইজিবাইক, সাত কেজি তামার তার, দুটি পানির পাম্প, তিনটি পাওয়ার সেল ইউপিএস, তিনটি স্পার্ক ব্যাটারি, ১২ টন ১০০ কেজি লোহার রড, ১১টি মোবাইল ফোন, একটি স্বর্ণের চেইনসহ বিভিন্ন মালামাল উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া একটি চুরির ঘটনায় ৮১ ফুট বা ২৫ মিটার বৈদ্যুতিক কেবল উদ্ধার করা হয়, যার আনুমানিক মূল্য চার লাখ টাকা।
মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে ডাকাতির ঘটনার পর মামলা করে অভিযান চালিয়ে সাতজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এ সময় লুণ্ঠিত ১৫০ মিটার বৈদ্যুতিক তার উদ্ধার করা হয়। পাশাপাশি ডাকাতির প্রস্তুতির গোপন তথ্য পেয়ে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে দেশীয় অস্ত্রসহ একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার এবং অপরাধীদের গতিবিধির ওপর নজরদারি অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছে পুলিশ।
চোরাচালানবিরোধী সাতটি মামলায় বিপুল পরিমাণ মালামাল ও যানবাহন জব্দ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ১৭ হাজার ৫৫০ কেজি প্লাস্টিক তৈরির কাঁচামালভর্তি ৭০২ বস্তা ও একটি কাভার্ড ভ্যান। উদ্ধার করা কাঁচামালের আনুমানিক মূল্য ৪৫ লাখ টাকা। দুটি ট্যাংকার ট্রাকে থাকা ৪৮ হাজার ৯৯৫ কেজি অ্যাসিড অয়েল ও ক্রুড গ্লিসারিনের আনুমানিক মূল্য ৫০ লাখ টাকা। এ ছাড়া সাগরপথে মিয়ানমার পাচারকালে দুটি ট্রাকে থাকা ৩০১ বস্তা ইউরিয়া সারের মূল্য ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৭৬ হাজার ২৫০ টাকা।
চোরাচালানের ঘটনায় হরলিক্স, নবরত্ন তেল, কিটক্যাট চকলেট, স্ন্যাকস ও ডেইরি মিল্কসহ বিভিন্ন পণ্য জব্দ করা হয়, যার আনুমানিক মূল্য ৪ লাখ ১৫ হাজার ২১০ টাকা। একটি হাইস গাড়িতে থাকা ১৮০টি ভারতীয় শাড়ির মূল্য ধরা হয়েছে ৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা। এ ছাড়া ১০ পাতায় ১০০টি ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেট, ১৯টি গরু এবং দুটি পিকআপ জব্দের তথ্য রয়েছে পুলিশের বিবরণীতে। গরুগুলোর আনুমানিক মূল্য ৫ লাখ ১৬ হাজার টাকা এবং পিকআপ দুটি প্রতিটির মূল্য ১২ লাখ টাকা করে উল্লেখ করা হয়েছে।
অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় দুই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাদের কাছ থেকে একটি সেমি অটোমেটিক ৭.৬২ বিদেশি পিস্তল, নয় রাউন্ড তাজা গুলি, একটি ফোল্ডিং সুইচ গিয়ার ছুরি ও দেশীয় তৈরি বিভিন্ন অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় মামলা করে তাদের আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে।
হত্যা মামলার আসামি গ্রেপ্তারেও সাফল্যের কথা জানিয়েছে পুলিশ। চারটি হত্যা মামলায় সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ছয় পলাতক আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে একজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। এর মধ্যে ২৪ আগস্টের একটি হত্যা মামলায় পুত্রবধূকে বিষ পান করিয়ে হত্যার অভিযোগে দুই এজাহারনামীয় আসামিকে গ্রেপ্তারের তথ্যও রয়েছে।
পুলিশের হিসাব অনুযায়ী, ছয় মাসে গ্রেপ্তার ৭২৩ জনের মধ্যে মাদক কারবারি ১২৬ জন, নিয়মিত মামলার আসামি ২৩৬ জন, জিআর পরোয়ানাভুক্ত ৭৫ জন, সিআর পরোয়ানাভুক্ত ৮৬ জন, জিআর সাজা পরোয়ানাভুক্ত সাতজন এবং সিআর সাজা পরোয়ানাভুক্ত ১৫ জন। এ ছাড়া ফৌজদারি কার্যবিধির ১৫১ ধারায় ১৭৩ জন, ৫৪ ধারায় তিনজন এবং দণ্ডবিধির ২৯০ ধারায় দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
একই সময়ে ১৯২ জন কিশোর গ্যাং সদস্যকে গ্রেপ্তারের তথ্য দিয়েছে পুলিশ। তাদের মধ্যে ৯৭ জনকে মুচলেকার মাধ্যমে অভিভাবকের জিম্মায় দেওয়া হয়েছে এবং ৯৫ জনকে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। পুলিশের বিবরণীতে এ সংখ্যাকে মোট ৭২৩ জন গ্রেপ্তারের হিসাবের অন্তর্ভুক্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এবিষয়ে জোরারগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আব্দুল হালিম বলেন, মাদক নির্মূলে জনসচেতনতা বাড়াতে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ ও ধর্মীয় উপাসনালয়ে কমিউনিটি পুলিশিং ও বিট পুলিশিং সভা করে স্থানীয় জনগণকে মাদক, চুরি ও ডাকাতিসহ অপরাধ প্রতিরোধে সচেতন করা হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নতি করতে এধরনের অভিযান অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছেন তিনি।