তারেক রহমানের জাপান সফর: বিনিয়োগের অঙ্ক ছাড়িয়ে নতুন সম্ভাবনার সন্ধানে

২৫ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৪৪ PM
মোঃ আইমান মাহমুদ

মোঃ আইমান মাহমুদ © টিডিসি সম্পাদিত

ঢাকার ব্যস্ত সড়কের ওপর দিয়ে ছুটে চলা মেট্রোরেল কিংবা মাতারবাড়ীতে গড়ে ওঠা গভীর সমুদ্রবন্দর- বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রার গুরুত্বপূর্ণ অনেক উদ্যোগের সঙ্গে জড়িয়ে আছে জাপানের নাম। স্বাধীনতার পর থেকে অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার মধ্য দিয়ে দেশটি বাংলাদেশের অন্যতম নির্ভরযোগ্য উন্নয়ন-অংশীদার হয়ে উঠেছে। তবে পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাস্তবতায় দুই দেশের সম্পর্ককে এখন নতুনভাবে দেখার সময় এসেছে।

এমন এক প্রেক্ষাপটে ২৬ অক্টোবর চার দিনের সরকারি সফরে জাপান যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পাশাপাশি দেশটির গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে তাঁর আলোচনার কথা রয়েছে। এই সফর ঘিরে বিনিয়োগ, বাণিজ্য ও কৌশলগত সহযোগিতার নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই সফর কি কেবল কূটনৈতিক সৌজন্য ও বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতিতে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক রূপান্তরের ভিত্তি তৈরি করবে?

উন্নয়ন-সহযোগিতা থেকে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব

১৯৭২ সালে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পর থেকে বাংলাদেশের উন্নয়নে জাপান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। মেট্রোরেল, হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল এবং মাতারবাড়ী প্রকল্প সেই সহযোগিতার দৃশ্যমান উদাহরণ।

তবে বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক চাহিদা শুধু অবকাঠামো নির্মাণ কিংবা উন্নয়ন ঋণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রয়োজন উৎপাদনমুখী বিনিয়োগ, প্রযুক্তি হস্তান্তর, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে স্বাক্ষরিত বাংলাদেশ–জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের প্রেক্ষাপটে জাপানের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখা জরুরি।

তবে চুক্তির সুফল পেতে হলে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, নীতির ধারাবাহিকতা এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন উৎপাদনব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

বিনিয়োগের পরিমাণ নয়, গুরুত্ব তার প্রভাবে

প্রধানমন্ত্রীর সফরকে কেন্দ্র করে ২০২৬ থেকে ২০৩১ সালের জন্য ১২টি অগ্রাধিকার খাতে প্রায় ১ হাজার ৩৮০ কোটি মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ ও সহযোগিতা প্রস্তাব আলোচনায় রয়েছে। পরিবহন, শিল্পায়ন, প্রযুক্তি, জ্বালানি ও জলবায়ুসহিষ্ণু অবকাঠামো এসব প্রস্তাবের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

সফরে জাইকা, জেবিআইসি, জেট্রোসহ জাপানের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকের পরিকল্পনা রয়েছে। টয়োটা, ইউনিক্লো ও জ্বালানি খাতের প্রতিষ্ঠান জেরার সঙ্গে সম্পৃক্ততাও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

তবে প্রস্তাবিত বিনিয়োগ আর বাস্তবায়িত বিনিয়োগ এক নয়। বড় অঙ্কের প্রতিশ্রুতি তখনই অর্থবহ হবে, যখন তা নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান, কর্মসংস্থান এবং দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখবে।

জাপানের অটোমোবাইল শিল্পের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ গাড়ির যন্ত্রাংশ উৎপাদন ও প্রকৌশল দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ তৈরি করতে পারে। একইভাবে তৈরি পোশাকশিল্পে জাপানের প্রযুক্তি ও মাননিয়ন্ত্রণের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের রপ্তানি প্রতিযোগিতা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে।

বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু বিদেশি পুঁজি আকর্ষণ নয়, বরং সেই বিনিয়োগের মাধ্যমে নিজস্ব শিল্প ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা গড়ে তোলা।

বঙ্গোপসাগর ঘিরে নতুন কৌশলগত বাস্তবতা

এই সফরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক জাপানের বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট বা বিগ-বি উদ্যোগ। ২০১৪ সালে শুরু হওয়া এই উদ্যোগের লক্ষ্য ছিল বঙ্গোপসাগর অঞ্চলকে শিল্পায়ন ও আঞ্চলিক যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করা।

মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর এবং সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো কার্যকরভাবে গড়ে উঠলে বাংলাদেশ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাণিজ্যিক যোগাযোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের সম্ভাবনাও রয়েছে।

তবে শুধু বন্দর নির্মাণ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দক্ষ শুল্কব্যবস্থা, উন্নত যোগাযোগ অবকাঠামো এবং নির্ভরযোগ্য সরবরাহব্যবস্থা।

একই সঙ্গে বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে বৃহৎ শক্তিগুলোর ক্রমবর্ধমান আগ্রহ বাংলাদেশের জন্য সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ দুটোই তৈরি করছে। এ ক্ষেত্রে জাপান, চীন, ভারতসহ গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারদের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।

তরুণ প্রজন্মের জন্য সবচেয়ে বড় সুযোগ

বাংলাদেশ–জাপান সম্পর্কের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় ক্ষেত্রগুলোর একটি মানবসম্পদ উন্নয়ন।

জাপানে জনসংখ্যার বার্ধক্য ও কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা কমে যাওয়ায় বিভিন্ন খাতে দক্ষ বিদেশি কর্মীর চাহিদা বাড়ছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য মানসম্মত কর্মসংস্থান তৈরি করা বড় চ্যালেঞ্জ।

দুই দেশের এই ভিন্ন বাস্তবতা পারস্পরিক সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে। জাপানের স্পেসিফায়েড স্কিলড ওয়ার্কার কর্মসূচি এবং দক্ষতা উন্নয়নসংক্রান্ত সাম্প্রতিক উদ্যোগগুলো বাংলাদেশের তরুণদের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।

তবে শুধু কর্মী পাঠানোর সংখ্যা বাড়ানোই লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়। জাপানি ভাষায় দক্ষতা, কারিগরি প্রশিক্ষণ, আন্তর্জাতিক মানের সনদ এবং পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জাপানিজ স্টাডিজ বিভাগের একজন শিক্ষার্থী হিসেবে বিষয়টি আমার কাছে বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। জাপানকে জানার অর্থ কেবল একটি ভাষা শেখা নয়; দেশটির শিক্ষা, প্রযুক্তি, কর্মসংস্কৃতি ও প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা থেকেও শেখার সুযোগ রয়েছে।

জাপানি কর্মসংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ ধারণা কাইজেন, অর্থাৎ ধারাবাহিক উন্নয়ন। নিয়মিত দক্ষতা বৃদ্ধি ও কাজের মানোন্নয়নের এই দর্শন বাংলাদেশের শিক্ষা ও শিল্প খাতেও প্রাসঙ্গিক।

বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে জাপানি ভাষাশিক্ষার সঙ্গে প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ, যৌথ গবেষণা, শিক্ষার্থী বিনিময় এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা বাড়ানো প্রয়োজন। এতে শুধু বিদেশে কর্মসংস্থান নয়, দেশে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির পথও প্রশস্ত হবে।

দুই দেশের সম্পর্কের দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য তাই শুধু কতগুলো কারখানা গড়ে উঠল, তা দিয়ে নয়; কতজন দক্ষ মানুষ তৈরি হলো, তা দিয়েও বিচার করতে হবে।

প্রতিশ্রুতি থেকে বাস্তবায়নই মূল চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশের শিল্পায়নে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহও গুরুত্বপূর্ণ। জাপানের এলএনজি ও বিদ্যুৎ খাতের অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে। তবে আমদানিনির্ভর জ্বালানির ঝুঁকি বিবেচনায় নবায়নযোগ্য শক্তি ও জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তিকেও গুরুত্ব দিতে হবে।

উচ্চপর্যায়ের রাষ্ট্রীয় সফরে বিনিয়োগ প্রস্তাব ও সমঝোতা স্মারক গুরুত্ব পায়। কিন্তু কূটনৈতিক সাফল্যের প্রকৃত মূল্যায়ন হয় বাস্তবায়নের মাধ্যমে।

জাপানি বিনিয়োগকারীদের কাছে নীতির স্থিতিশীলতা, স্বচ্ছতা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশকে তাই প্রশাসনিক জটিলতা কমানো, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত করা এবং দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে মনোযোগ দিতে হবে।

দুই দেশের গৃহীত সিদ্ধান্তগুলোর অগ্রগতি পর্যবেক্ষণে কার্যকর সমন্বয়ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে বিনিয়োগ ও সহযোগিতার সুফল দ্রুত পাওয়া সম্ভব।

বাংলাদেশের রয়েছে তরুণ জনগোষ্ঠী, ক্রমবর্ধমান বাজার ও গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক অবস্থান। অন্যদিকে জাপানের রয়েছে প্রযুক্তি, শিল্পদক্ষতা ও প্রাতিষ্ঠানিক অভিজ্ঞতা। এই দুই শক্তির কার্যকর সমন্বয় উভয় দেশের জন্যই লাভজনক হতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফর সেই সম্ভাবনাকে এগিয়ে নেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। তবে এর সাফল্য শুধু টোকিওতে অনুষ্ঠিত বৈঠক কিংবা ঘোষিত বিনিয়োগের অঙ্ক দিয়ে বিচার করা উচিত হবে না।

টোকিও থেকে বাংলাদেশ কী নিয়ে ফিরবে, সেটিই একমাত্র প্রশ্ন নয়। বড় প্রশ্ন হলো, এই সফরের মাধ্যমে তৈরি হওয়া সুযোগগুলো কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ নিজেকে কতটা বদলাতে পারবে।

সেই পরিবর্তন যদি দক্ষ মানবসম্পদ, উৎপাদনশীল বিনিয়োগ, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ও পারস্পরিক আস্থার ভিত্তিতে গড়ে ওঠে, তাহলে এই সফর বাংলাদেশ–জাপান সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে।

লেখক: শিক্ষার্থী, জাপানিজ স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ট্যাগ: মতামত
স্ত্রী-সন্তানদের নিরাপত্তার শঙ্কায় গাজীপুর ছেড়েছেন রুমি
  • ২৫ অক্টোবর ২০২৬
বটি দিয়ে কুপিয়ে মাকে হত্যার অভিযোগ, আটক মেয়ে
  • ২৫ অক্টোবর ২০২৬
পরিপাকতন্ত্রে রক্তক্ষরণ: কখন জরুরি এন্ডোস্কোপি প্রয়োজন?
  • ২৫ অক্টোবর ২০২৬
মসজিদ কি শুধু ইবাদতের জায়গা নাকি এর সামাজিক গুরুত্বও রয়েছে?
  • ২৫ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা কর কমিশনারের কার্যালয় ৯-এ নতুন বেতন স্কেলে ৩৮ পদে চাকর…
  • ২৫ অক্টোবর ২০২৬
তারেক রহমানের জাপান সফর: বিনিয়োগের অঙ্ক ছাড়িয়ে নতুন সম্ভাবন…
  • ২৫ অক্টোবর ২০২৬