সচিবালয় শেরেবাংলা নগরে, পূর্বাচল কি তবে উপেক্ষিত?

১৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৪৭ PM , আপডেট: ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৪৯ PM
এম এ মতিন

এম এ মতিন © টিডিসি সম্পাদিত

ঢাকার যানজট কমাতে কত পরিকল্পনাই না এ যাবৎ হয়েছে। নতুন শহর গড়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রাজধানীর বাইরে প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ছড়িয়ে দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে বহুবার। এসব পরিকল্পনার মধ্যে পূর্বাচল ছিল গুরুত্বপূর্ণ একটি নাম। কিন্তু নতুন সচিবালয় পূর্বাচলে না করে শেরেবাংলা নগরে নির্মাণের সিদ্ধান্ত সেই পরিকল্পনা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে। সরকার কি শুধু সচিবালয়ের ঠিকানা বদলাতে চায়, নাকি ঢাকাকে বিকেন্দ্রীকরণের কোনো সুস্পষ্ট পরিকল্পনা আছে?

১৮ অক্টোবর ২০২৬ মন্ত্রিসভা শেরেবাংলা নগরের সাবেক আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলার মাঠে নতুন সচিবালয় নির্মাণের প্রস্তাব অনুমোদন করেছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৩১.৫৮ একর জমিতে ১৪টি ১২ তলা ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। মোট আয়তন হবে প্রায় ৩৩.১৬ লাখ বর্গফুট। ২০২৯ সালের মধ্যে সেখানে দাপ্তরিক কার্যক্রম শুরু করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। শহরের ভেতরকার উন্মুক্ত স্থানকে ওই শহরের নাসিকা বলা হয়। ওই নাসিকার মাধ্যমে শহর আকাশ থেকে বাতাস আর অক্সিজেন গ্রহণ করে থেকে। তাতে শহরের পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য ঠিক থাকে। শেরেবাংলা নগরের বাণিজ্যমেলার এই উন্মুক্ত মাঠটি এবার কংক্রিটের জঙ্গল হতে চলেছে। রাজধানী ঢাকা আরও অক্সিজেন সংকটে পড়লো– এই আর কি? শেরেবাংলা নগরের এই ফাঁকা অংশটুকু খালি রেখে রাজধানী ঢাকা শহরের উপর চাপ কমানো তথা প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের লক্ষ্যে পূর্বাচলে সচিবালয় এবং আরও কতিপয় অফিস আদালত সরনোর বিষয়টি মন্ত্রিসভা কেন বিবেচনা করলেন না – এই প্রশ্ন অনেকের। 

শেরেবাংলা নগর ঢাকার বিদ্যমান নগরকেন্দ্রের অংশ। আগারগাঁও ও এর আশপাশে ইতিমধ্যে বহু সরকারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। নতুন সচিবালয় নির্মিত হলে সেখানে প্রতিদিন কর্মকর্তা-কর্মচারী, সেবাপ্রার্থী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের যাতায়াত বাড়বে। ফলে সড়ক, গণপরিবহন, পার্কিং এবং জরুরি সেবার ওপর নতুন চাপ তৈরি হতে পারে। বর্তমান সচিবালয় এলাকা থেকে চাপ কিছুটা কমতে পারে। কিন্তু পুরো মহানগরীর জনসংখ্যা, কর্মসংস্থান ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রীভূতকরণ কি কমবে? এর উত্তর সরাসরি ‘হ্যাঁ’ নয়। কারণ শেরেবাংলা নগরে সচিবালয় নির্মাণ মানে ঢাকার বাইরে প্রশাসনিক কেন্দ্র তৈরি করা নয়। এটি মূলত ঢাকার এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় প্রশাসনিক কার্যক্রম সরিয়ে নেওয়া।

পূর্বাচলকে আবাসিক এলাকা নয়, কার্যকর নগরকেন্দ্র করতে হবে
পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ—রাজউকের (RAJUK)। ঢাকার উত্তর-পূর্ব দিকে, রূপগঞ্জ ও কালীগঞ্জ এলাকায় বিস্তৃত এই প্রকল্পের আয়তন প্রায় ৬,২০০ একর। সরকারি প্রকল্প-সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, এখানে আবাসিক প্লটের পাশাপাশি প্রশাসনিক, বাণিজ্যিক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক অবকাঠামো এবং বহুতল আবাসনের ব্যবস্থা রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। উল্লেখ্য পূর্বাচল প্রকল্পের কাজ শুরু হয় বি এন পি সরকারের প্রথম মেয়াদে ১৯৯১ -৯৬ সালে। ২০০১ সালে মির্জা আব্বাস পুর্ত মন্ত্রী থাকাকালীন সময়ে প্লট বরাদ্দের কাজ শুরু হয়। কিন্তু দীর্ঘ সময়েও পূর্বাচল প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজের কোন অগ্রগতি হয় নি।
প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য ছিল—
• ঢাকার আবাসনসংকট কমানো এবং পরিকল্পিত নগরায়ণ নিশ্চিত করা।
• রাজধানীর কেন্দ্রীয় এলাকার ওপর জনসংখ্যা ও অবকাঠামোগত চাপ হ্রাস করা।
• আধুনিক সড়ক, পানি, পয়োনিষ্কাশন ও অন্যান্য নাগরিক সুবিধাসহ একটি নতুন নগরকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা।
• সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা ও কর্মসংস্থানের নতুন কেন্দ্র গড়ে তোলা।
• দীর্ঘমেয়াদে ঢাকার পূর্বদিকে নগর সম্প্রসারণকে পরিকল্পিত রূপ দেওয়া।

ঢাকা বাংলাদেশের প্রশাসনিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও শিক্ষাকেন্দ্র। দেশের অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দপ্তর, ব্যাবসাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয়, উচ্চশিক্ষা ও বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবার বড় অংশ এই শহরকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। ফলে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষকে কর্মসংস্থান, ব্যবসা, শিক্ষা, চিকিৎসা ও প্রশাসনিক প্রয়োজনে ঢাকায় আসতে হয়। এর পরিণতিতে যানজট, বায়ুদূষণ, আবাসনসংকট, জলাবদ্ধতা, পরিবেশের অবক্ষয় এবং নাগরিক সেবার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়েছে।

এই সমস্যা সমাধানের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় হলো ঢাকার জনসংখ্যা ও কর্মসংস্থানের চাপ কমিয়ে পরিকল্পিত নতুন নগরকেন্দ্র গড়ে তোলা। রাজধানীর পূর্বদিকে গড়ে ওঠা পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্প সেই সম্ভাবনার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। তবে একটি পরিকল্পিত আবাসিক শহর নির্মাণ এবং রাজধানীর কার্যকর বিকেন্দ্রীকরণ—দুটি এক বিষয় নয়। পূর্বাচলের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে সেখানে শুধু আবাসন নয়, বরং কর্মসংস্থান, প্রশাসনিক কার্যক্রম, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, পরিবহন ও বাণিজ্যের একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা গড়ে ওঠার ওপর। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পূর্বাচলকে কেবল আবাসিক উপশহর হিসেবে নয়, একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ নগরকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার ধারণাই ছিল এর বিকেন্দ্রীকরণ-সংক্রান্ত গুরুত্বের মূল ভিত্তি। 

পূর্বাচলের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা হলো পরিকল্পিতভাবে নতুন কর্মসংস্থান ও প্রশাসনিক কার্যক্রম গড়ে তোলা। সেখানে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দপ্তর, অধিদপ্তর, প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান ও সেবা খাতের কার্যক্রম স্থানান্তর করা গেলে নতুন অর্থনৈতিক কেন্দ্র তৈরি হতে পারে। এতে শুধু পূর্বাচলের বাসিন্দারা উপকৃত হবেন না। ঢাকার ওপরও কিছুটা চাপ কমতে পারে।

তবে পূর্বাচলে সচিবালয় নির্মাণ করলেই বিকেন্দ্রীকরণ নিশ্চিত হতো, এমন দাবি করাও ঠিক হবে না। সেখানে পর্যাপ্ত যোগাযোগব্যবস্থা, নাগরিক সুবিধা এবং কর্মসংস্থান তৈরি না হলে সচিবালয়ও একটি বিচ্ছিন্ন প্রশাসনিক স্থাপনা হয়ে থাকতে পারে। নতুন শহরকে কার্যকর করতে হলে আবাসন, কর্মসংস্থান, পরিবহন ও নাগরিক সেবার মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন।

তাই প্রশ্নটি শুধু সচিবালয় কোথায় হবে, তা নিয়ে নয়। প্রশ্ন হলো, পূর্বাচলসহ ঢাকার বিভিন্ন নতুন নগরাঞ্চলকে সরকার কী ভূমিকা দিতে চায়। সচিবালয় শেরেবাংলা নগরে হলেও পূর্বাচলের জন্য আলাদা প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনা থাকতে পারে। কিন্তু সেই পরিকল্পনা কোথায়? কোন প্রতিষ্ঠান কোথায় যাবে? কত সময়ের মধ্যে কর্মসংস্থান তৈরি হবে? যোগাযোগব্যবস্থা কীভাবে গড়ে উঠবে? এসব বিষয়ে স্পষ্ট রূপরেখা দরকার।

যতদূর জানা যায়, উন্নয়ন সহযোগীরা ঢাকার চাপ কমাতে পূর্বাচলসহ নতুন নগরাঞ্চল গড়ে তোলার ধারণাকে সমর্থন করেছে—কিন্তু ঢাকার সব প্রশাসনিক কার্যক্রম পূর্বাচলে সরিয়ে নেওয়াই তাদের সর্বসম্মত সুপারিশ ছিল, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো নির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় না। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) ঢাকা স্ট্রাকচার প্ল্যান ২০১৬–২০৩৫-এ ঢাকাকে একটি একক কেন্দ্রে আবদ্ধ না রেখে বহুকেন্দ্রিক মহানগর হিসেবে গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে। পরিকল্পনায় মহানগর অঞ্চলকে ছয়টি অঞ্চলে ভাগ করা, প্রতিটি অঞ্চলে কর্মসংস্থান ও নাগরিক সেবা সম্প্রসারণ এবং গণপরিবহন ও রিং রোডের মাধ্যমে অঞ্চলগুলোর মধ্যে যোগাযোগ উন্নত করার প্রস্তাব রয়েছে। অর্থাৎ, সব কাজ এক জায়গায় কেন্দ্রীভূত না রেখে বিভিন্ন অঞ্চলে কর্মসংস্থান ও নাগরিক সুবিধা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। এই পরিকল্পনার মূল কথা স্পষ্ট: একটি বড় শহরের সব প্রশাসনিক, বাণিজ্যিক ও সামাজিক কার্যক্রম একই কেন্দ্রে আটকে থাকলে যানজট ও জনসংখ্যার চাপ কমানো কঠিন।  ঢাকার জনসংখ্যার চাপের একটি বড় কারণ হলো, কর্মসংস্থান ও গুরুত্বপূর্ণ সেবা নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় কেন্দ্রীভূত। মানুষ পূর্বাচলে বাড়ি নির্মাণ করলেও যদি চাকরি, ব্যবসা, উন্নত হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি কাজের জন্য পুরোনো ঢাকায় যেতে বাধ্য হয়, তাহলে যানজট ও যাতায়াতের চাপ থেকেই যাবে। ২০২৬ সালে প্রকাশিত পূর্বাচলবিষয়ক গবেষণাটির অন্যতম প্রধান সিদ্ধান্ত হলো, স্থানীয় কর্মসংস্থান ও কার্যকর নগরসেবার সঙ্গে বসতি উন্নয়নের যথেষ্ট সমন্বয় না থাকায় প্রকল্পটি তার বিকেন্দ্রীকরণ-লক্ষ্য অর্জনে পিছিয়ে রয়েছে। গবেষকেরা এ ধরনের শহরকে অর্থনৈতিকভাবে অন্য নগরের ওপর নির্ভরশীল আবাসিক বা ‘ডরমিটরি টাউন’ হয়ে ওঠার ঝুঁকিতে দেখেছেন।

পূর্বাচলকে সত্যিকার বিকেন্দ্রীকরণের কেন্দ্র করতে করণীয়
১. গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দপ্তর স্থানান্তর
সচিবালয় বা কয়েকটি সরকারি ভবন স্থানান্তর করাই যথেষ্ট নয়। মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর, সরকারি সেবা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়সহ একটি প্রশাসনিক কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে। কোন দপ্তর কোথায় গেলে নাগরিক ও কর্মীদের যাতায়াত কমবে, তা সমীক্ষার ভিত্তিতে নির্ধারণ করা উচিত।

২. কর্মসংস্থান ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র গড়ে তোলা
ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি ও সেবা খাতের প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়িক কার্যালয় এবং উপযুক্ত শিল্প ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমকে পূর্বাচলে আকৃষ্ট করতে হবে। এতে সেখানে বসবাসকারী মানুষ স্থানীয়ভাবেই কাজের সুযোগ পাবেন।

৩. গণপরিবহনকে অগ্রাধিকার
পূর্বাচলকে ঢাকার সঙ্গে যুক্ত করার পাশাপাশি শহরের ভেতরে ও আশপাশে নির্ভরযোগ্য বাস, দ্রুতগামী গণপরিবহন, হাঁটার পথ এবং নিরাপদ সাইকেল চলাচলের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। শুধু ব্যক্তিগত গাড়িনির্ভর নগরায়ণ হলে যানজট নতুন এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়বে।

৪. নাগরিক সেবা আগে, বসতি সম্প্রসারণ পরে
নিরাপদ পানি, পয়োনিষ্কাশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্যসেবা, স্কুল, কলেজ এবং জরুরি সেবার কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। অবকাঠামোর কাজ ও বাসিন্দাদের জন্য সেবা চালুর সময়সীমা প্রকাশ করা উচিত।

৫. পরিবেশ ও সামাজিক ন্যায় নিশ্চিত করা
জলাধার ও প্রাকৃতিক নিষ্কাশনপথ রক্ষা, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য সাশ্রয়ী আবাসন, স্বচ্ছ প্লট বরাদ্দ এবং প্রকল্পের নিয়মিত স্বাধীন নিরীক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।

পূর্বাচল বাংলাদেশের নগর পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। এখানে পরিকল্পিত আবাসন, উন্নত সড়ক এবং নতুন প্রাতিষ্ঠানিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র গড়ে তোলার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু দীর্ঘসূত্রতা, অসম্পূর্ণ নাগরিক অবকাঠামো, স্থানীয় কর্মসংস্থানের ঘাটতি এবং পরিবেশ ও সুশাসন-সংক্রান্ত সমস্যার সমাধান ছাড়া একে ঢাকার ওপর চাপ কমানোর সফল মডেল বলা কঠিন।

এখানে একটি নীতিগত পার্থক্য স্পষ্ট করা দরকার: রাজধানীর ভৌগোলিক সম্প্রসারণ এবং রাজধানীর কার্যকর বিকেন্দ্রীকরণ এক বিষয় নয়। ঢাকার পূর্বদিকে নতুন শহর গড়ে উঠলেই প্রশাসন, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রীকরণ দূর হবে না।

পূর্বাচলের জন্য তাই সরকারের সামনে দুটি পথ রয়েছে। প্রথমটি হলো—এটিকে মূলত জমি, প্লট ও আবাসনের প্রকল্প হিসেবে এগিয়ে নেওয়া। দ্বিতীয়টি হলো—পরিকল্পিত পরিবহন, প্রশাসন, কর্মসংস্থান, নাগরিক সেবা ও পরিবেশ সংরক্ষণকে একত্র করে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ নগরকেন্দ্রে পরিণত করা।

দ্বিতীয় পথটি বাস্তবায়িত হলেই পূর্বাচল তার মূল উদ্দেশ্যের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারবে। অন্যথায়, এটি ঢাকার বিকল্প নগরকেন্দ্র না হয়ে ঢাকানির্ভর আরেকটি আবাসিক অঞ্চল হয়ে থাকার ঝুঁকিতে থাকবে।

সেজন্যে সচিবালয় স্থাপনের জন্যে পূর্বাচলকে বেছে নিলে রাজধানীর বিকেন্দ্রীকরণ যেমন হতো ঠিক তেমনি ঢাকা শহরের উপর জনবস্তি ও যানজটের চাপ কমতো বলে অনেকে মনে করেন। 

শেরেবাংলা নগরের সিদ্ধান্তে যে প্রশ্নগুলোর উত্তর প্রয়োজন
নতুন সচিবালয় নির্মাণের আগে সরকারের উচিত বিকল্প স্থানগুলোর পূর্ণাঙ্গ ব্যয়-সুবিধা সমীক্ষা প্রকাশ করা। শুধু ভবন নির্মাণের খরচ হিসাব করলেই হবে না। জমির সুযোগ ব্যয়, ভবিষ্যৎ রক্ষণাবেক্ষণ, যানজটের কারণে মানুষের সময় নষ্ট এবং নতুন অবকাঠামোর পরিবেশগত প্রভাবও বিবেচনায় নিতে হবে।
আগারগাঁও ও শেরেবাংলা নগর এলাকায় যানবাহনের চাপ কীভাবে সামলানো হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। নতুন সচিবালয় চালু হলে প্রতিদিন কত মানুষ সেখানে যাতায়াত করবেন, কী পরিমাণ যানবাহন বাড়বে এবং গণপরিবহন কতটা প্রস্তুত—এসব তথ্য জনসমক্ষে থাকা উচিত। সড়কের ধারণক্ষমতা যাচাই না করে শুধু ভবন নির্মাণ করলে এক সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে অন্য সমস্যা তৈরি হতে পারে।

এই প্রকল্পের সঙ্গে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদের উদ্বেগের বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। কোনো উন্নয়ন প্রকল্পের পরিকল্পনায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ ও জনস্বার্থ বিবেচনা করা জরুরি। আপত্তি থাকলে তা শুনতে হবে। প্রয়োজন হলে বিকল্প ব্যবস্থা নিতে হবে।

একই সঙ্গে সরকারকে জানাতে হবে, পূর্বাচলকে ঘিরে তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী। সেখানে প্রশাসনিক কার্যক্রম না বাড়ালে কোন খাতকে কেন্দ্র করে কর্মসংস্থান তৈরি করা হবে? শিল্প, প্রযুক্তি ও সেবা খাতের বিনিয়োগ কীভাবে আসবে? এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া পূর্বাচলকে বিকেন্দ্রীকরণের কার্যকর কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা কঠিন।

বিকেন্দ্রীকরণ ঢাকার সীমানায় আটকে থাকলে চলবে না
রাজধানীর বিকেন্দ্রীকরণ বলতে শুধু ঢাকার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে সরকারি ভবন সরিয়ে নেওয়া বোঝায় না। দেশের অন্যান্য শহরকেও শক্তিশালী করতে হবে। চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট, বরিশাল, রংপুর ও ময়মনসিংহে মানসম্মত শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, শিল্প ও প্রশাসনিক সুবিধা বাড়ানো গেলে ঢাকামুখী মানুষের চাপ কমানোর বাস্তব সুযোগ তৈরি হবে।

আজ একজন মানুষ উন্নত চিকিৎসা, উচ্চশিক্ষা, চাকরি কিংবা ব্যবসার সুযোগের জন্য ঢাকায় আসতে বাধ্য হন। কারণ অনেক গুরুত্বপূর্ণ সেবা ও সুযোগ রাজধানীকেন্দ্রিক। জেলা ও বিভাগীয় শহরে এসব সুবিধা বাড়ানো না গেলে ঢাকার ওপর চাপ কমবে না। শুধু নতুন সড়ক বা আবাসিক এলাকা তৈরি করে এই সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়।

সরকারি দপ্তরের বণ্টনও নতুন করে ভাবতে হবে। সব মন্ত্রণালয় এক জায়গায় রাখার প্রয়োজন থাকতে পারে। কিন্তু সব অধিদপ্তর, প্রশিক্ষণকেন্দ্র, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও আঞ্চলিক কার্যালয় কেন ঢাকায় থাকবে, সেই প্রশ্নও করা দরকার। যেসব প্রতিষ্ঠান রাজধানীর বাইরে থেকে দক্ষতার সঙ্গে কাজ করতে পারে, সেগুলোর কিছু উপযুক্ত বিভাগীয় শহরে নেওয়ার সম্ভাবনা যাচাই করা যেতে পারে। এতে কর্মসংস্থান ছড়াবে, স্থানীয় অর্থনীতি শক্তিশালী হবে এবং রাজধানীর ওপর নির্ভরতা কমবে।
নতুন সচিবালয় যেন বৃহত্তর পরিকল্পনার বিকল্প না হয়

শেরেবাংলা নগরে সচিবালয় নির্মাণের সিদ্ধান্তকে সরাসরি বিকেন্দ্রীকরণের বিরোধী বলা ঠিক হবে না। আধুনিক প্রশাসনিক অবকাঠামো প্রয়োজন। পুরোনো ভবনের বিকল্পও দরকার। কিন্তু এই প্রকল্পকে রাজধানীর বিকেন্দ্রীকরণের সমাধান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

সরকারের সামনে এখন দুটি কাজ। প্রথমত, নতুন সচিবালয় নির্মাণের যৌক্তিকতা, ব্যয় ও পরিবেশগত প্রভাব সম্পর্কে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়ত, পূর্বাচলসহ ঢাকার বিভিন্ন অঞ্চলে পরিকল্পিত কর্মসংস্থান ও নাগরিক সুবিধা গড়ে তোলার দীর্ঘমেয়াদি রূপরেখা প্রকাশ করা। এই দুটি কাজ পরস্পরের বিকল্প নয়।
পূর্বাচলকে উপেক্ষা করা হচ্ছে কি না, তার উত্তর শুধু সচিবালয়ের অবস্থান দেখে দেওয়া যাবে না। উত্তর পাওয়া যাবে সরকারের সামগ্রিক নগর-পরিকল্পনায়। পূর্বাচল যদি আবাসিক শহর হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে বিকেন্দ্রীকরণের একটি বড় সুযোগ অপূর্ণ থেকে যাবে। আর সেখানে কর্মসংস্থান, সেবা ও অর্থনৈতিক কার্যক্রম গড়ে তোলার সুস্পষ্ট পরিকল্পনা থাকলে সচিবালয় অন্যত্র নির্মিত হলেও বিকেন্দ্রীকরণের লক্ষ্য এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।

বাংলাদেশের প্রয়োজন শুধু একটি নতুন সচিবালয় নয়। প্রয়োজন এমন একটি নগরনীতি, যেখানে সরকারি প্রতিষ্ঠান, কর্মসংস্থান ও নাগরিক সুবিধা পরিকল্পিতভাবে ছড়িয়ে থাকবে। শেরেবাংলা নগরের নতুন ভবন সেই নীতির অংশ হবে, নাকি আরেকটি ব্যয়বহুল অবকাঠামো প্রকল্পে সীমাবদ্ধ থাকবে—তা নির্ভর করবে সরকারের পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপর।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি সচিবালয়ের ঠিকানা নয়, উন্নয়নের দিকনির্দেশনা। ঢাকা কি সব সুযোগের একমাত্র কেন্দ্র হয়েই থাকবে, নাকি পূর্বাচলসহ অন্যান্য নগরকেন্দ্র এবং দেশের বিভাগীয় শহরগুলোও অর্থনীতি ও প্রশাসনের শক্তিশালী অংশীদার হয়ে উঠবে? এই প্রশ্নের উত্তরেই নির্ধারিত হবে সচিবালয় স্থানান্তরের প্রকৃত সাফল্য।

লেখক: উপদেষ্টা, গ্রন্থাগার ও তথ্যবিজ্ঞান বিভাগ, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ এবং প্রাক্তন পরিচালক, বাংলাদেশ লোক-প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (বিপিএটিসি), সাভার
ই-মেইল: [email protected] 

ট্যাগ: মতামত
ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির প্রথম বর্ষের পরীক্ষার রুটিন প্…
  • ১৯ অক্টোবর ২০২৬
অস্ত্র হাতে ইশরাকের অভিযান চালানো সেই স্পটে এবার গেল যৌথবাহ…
  • ১৯ অক্টোবর ২০২৬
ফ্যান চুরির দায়ে বিএনপি নেতার ছেলের কারাদণ্ড
  • ১৯ অক্টোবর ২০২৬
বিশ্ববাজারে কমল তেলের দাম 
  • ১৯ অক্টোবর ২০২৬
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা পাবেন বিনামূল্যে এআই প্র…
  • ১৯ অক্টোবর ২০২৬
ওয়ার্ল্ড ভিশন ঢাকায় নিয়োগ দেবে বিজনেস ডেভেলপমেন্ট অফিসার, আ…
  • ১৯ অক্টোবর ২০২৬