দায়িত্বের শেকলে বন্দি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তাকর্মীদের ঈদ
- ওয়াসিফ আল আবরার
- প্রকাশ: ০১ এপ্রিল ২০২৫, ১২:১৬ PM , আপডেট: ০১ এপ্রিল ২০২৫, ১২:১৬ PM

প্রিয়জনের জন্য সকলেই যখন বাড়ির পথ ধরেন, তখন এই মানুষগুলো আরও কঠোর দায়িত্ব পালনে ব্যস্ত থাকেন। সেই পুরনো সবুজ পোশাক, সেই একই ডিউটি; নেই বিশ্রামের সুযোগ, ক্লান্তি প্রকাশেরও উপায়। ঈদে সবাই চায় তার পরিবারের সাথে ঈদ আনন্দ ভাগাভাগি করতে। সেজন্যই নাড়ির টানে বাড়ি ফেরা হয় সবার। কিন্তু ফেরা হচ্ছে না তাদেরই শুধু। কাঁধে রয়েছে গুরুদায়িত্বের ভার। সার্বক্ষণিক দায়িত্ব কাঁধে ক্যাম্পাসকে আগলে রাখছেন তারা। সারাবছর একই পোষাকে ক্যাম্পাসকে নিরাপত্তার চাদরে সযত্নে ঢেকে রাখা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) আনসার সদস্যদের স্বপ্ন বাড়ি যায়নি এবারের ঈদেও। সকলেই যেখানে ছুটি উপভোগের নানা উপায় খুঁজে সেখানে তারা খুব বেশি প্রয়োজন ছাড়া বিশেষ দিনগুলোতেও ডিউটি করে যাচ্ছেন হাসিমুখে। এদের দায়িত্বের শেকলে বাঁধা কর্মব্যস্ত জীবনে যেন কর্মবিরতির সুযোগ নেই।
প্রায় ৪০ দিনের লম্বা ছুটিতে 'স্বপ্ন যাবে বাড়ি আমার' গানের মতো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা, কর্মচারী সবাই ফিরে গিয়েছে নাড়ীর টানে, বাড়ির পথে পরিবারের সাথে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে। কিন্তু এবারেই এই মানুষ গুলোর বাড়ি যাওয়া হলো না। তাদের কাছে ঈদ মানে শুধু আরো কিছু কর্মঘণ্টা, আরো কিছু রাতজাগা পাহারা। স্ত্রী-সন্তান যখন প্রশ্ন করেন,"বাড়ি ফিরবা না?" তখন চোখের কোণে জল চেপে রেখে উত্তর আসে," ছুটি পাই নাই যে!" ঈদের ছুটিতে শূন্য ক্যাম্পাস তাদের দায়িত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণ। রাতের নীরবতা যখন ঘুম পাড়িয়ে দেয় পুরো এলাকাকে, তখনও নীরব ক্যাম্পাসে টহল দিয়ে চলেন তারা, নিঃশব্দে আগলে রাখেন পুরো ক্যাম্পাস। তাদের কাছে পেশাটাই যেন ধীরে ধীরে এক অভ্যাস, এক নেশায় পরিণত হয়েছে। প্রিয়জন ঘিরে সযত্নে গড়ে উঠা আবেগ, অনূভুতি গুলো দায়বদ্ধতার ঘূর্ণিপাকে ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে।
মায়ের হাতের রান্না, ঈদের নতুন পোশাক, নামাজ শেষে বাবা-মায়ের দোয়া - এসব যেন তাদের কাছে শুধুই স্মৃতি। ক্যাম্পাসের গণ্ডিতেই তারা গড়ে তুলেছেন আরেকটি পরিবার, যেখানে রক্তের বন্ধন নেই, আছে কেবল দায়িত্বের সম্পর্ক। বিনিময়ে তারা চায় না কিছুই, শুধু একটু সম্মান, একটু কৃতজ্ঞতা, আর কিছু হাসিমুখের কথা। বিশ্ববিদ্যালয়ের সিকিউরিটি সেল সূত্রে জানা যায়, এবারের ঈদে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ৯৬ জন আনসার সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। এর মধ্যে সাতজন কুষ্টিয়া ও ঝিনাইদহ শহরে গাড়ি পাহারার কাজে নিয়োজিত। ক্যাম্পাসে তদারকির দায়িত্বে উভয় রেঞ্জের প্লাটুন কমান্ডার (পিসি) ও সহকারী প্লাটুন কমান্ডারসহ (এপিসি) মোট চারজন রয়েছেন যাদের কেওই ছুটি পাননি। পরিবারের কাছে ফেরা তো দূরের কথা, সহকর্মীরাই তাদের ঈদের সঙ্গী। একে অন্যের পাশে থেকে দায়িত্ব পালনই যেন তাদের ঈদ উৎসব।
দায়িত্বরত এক আনসার সদস্য বলেন, সবার ই মন চায় পরিবারের সাথে ঈদ কাটাতে। সব দুঃখ-কষ্ট মাটি চাপা দিয়ে টাকা ইনকাম করতে হয়। পরিবারের জন্য কাজ করি, অথচ তাদের কাছেই ঈদ করতে পারি না। পরিবারের সঙ্গে ঈদ করতে ইচ্ছা করলেও তখন ডিউটি দিবে কে? সেই চিন্তায় আর ছুটি পাওয়া যায়না, বাড়িও যাওয়া হয়না।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সিকিউরিটি ইনচার্জ মো: মিজানুর রহমান বলেন, "ঈদের ছুটিতেও আমাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা দুর্বল হবে না। আমাদের দিক থেকে নিরাপত্তা নিয়ে কোন ত্রুটি নেই। ক্যাম্পাসে আমাদের সদস্যরা দিনরাত না ঘুমিয়ে পাহারা দিচ্ছে। আপাতত ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা নিয়ে কোনো শঙ্কা নেই। ক্যাম্পাস যতদিন ছুটিতে থাকবে আমাদের নিরাপত্তায় কোনো ঘাটতি রাখবো না ইনশাআল্লাহ।"
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. শাহীনুজ্জামান বলেন, ঈদের ছুটিতে ক্যাম্পাস বন্ধ থাকলেও আমাদের নিরাপত্তাকর্মীরা নিরবিচ্ছিন্ন নিরাপত্তায় নিয়োজিত আছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে ঈদের দিন সকালে প্রত্যেক দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের জন্য নামাজের আগে নাস্তা এবং দুপুরে খাবারের আয়োজন করা হয়েছে। দায়িত্বের মধ্যে থেকেও সবাই চেষ্টা করছি সুন্দরভাবে ঈদ উদযাপন করার।