স্কুল অব আর্ট

নিলামে উঠছে দেশের প্রথম শিল্প শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান

প্রায় শত বছরের পুরোনো ভবনটি
প্রায় শত বছরের পুরোনো ভবনটি  © টিডিসি ফটো

নিলামে বিক্রি হচ্ছে দেশের প্রথম শিল্প শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মহেশ্বরপাশা স্কুল অব আর্ট। প্রায় শত বছরের পুরোনো প্রথম ভবনটি নিলামে অংশ নেওয়ার জন্য ছয়টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এরই মধ্যে দরপত্র জমা দিয়েছে। কিন্তু স্থানীয় লোকজন ও সংস্কৃতিপ্রেমীরা ঐতিহ্যবাহী এ ভবনটি ঐতিহাসিক সাংস্কৃতিক নিদর্শন হিসেবে সংরক্ষণ করার দাবি জানিয়েছেন।

শিক্ষাবিদ, ইতিহাস গবেষক এবং খুলনা অঞ্চলের ইতিহাসের গ্রন্থ থেকে জানা যায়, ১৯০৪ সালে বাংলাদেশ ভূসীমানায় প্রথম শিল্প শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন শশীভূষণ পাল। বাংলাদেশের প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক শিল্পশিক্ষার স্বপ্নদ্রষ্টা ছিলেন তিঁনি। তার হাতে প্রতিষ্ঠিত হয় স্কুল অব আর্ট। এই শিক্ষায়তনে প্রায় ৪১ বছর অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন শশীভূষণ ।

বাংলার গভর্নর, বর্ধমানের মহারাজা বিজয়চাঁদ মহতব, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, পল্লিকবি জসিমউদ্‌দীন, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শিল্পী এস এম সুলতানসহ দেশি–বিদেশি অনেক শিল্পরসিক এই প্রতিষ্ঠান পরিদর্শনে এসেছিলেন। জয়নুল আবেদিনও এটাকে এই বঙ্গের প্রথম শিল্প শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন।

আরও পড়ুন: শিক্ষার্থীদের পদচারণায় মুখরিত কুয়েট ক্যাম্পাস

ভবনের দেয়ালে থাকা শিলিলিপিতে থেকে জানা যায় ১৯২৯ সালে বর্ধমানের মহারাজাধিরাজের পৃষ্ঠপোষকতায় সরকারিভাবে ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছিল। ওই বছরের ১৯ মে ভবনটির উদ্বোধন করেন সে সময়ের খুলনা জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও কালেক্টর এইচ কুইনন্টন।

২০০৯ সালে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে চারুকলা ইনস্টিটিউট হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া এই প্রতিষ্ঠানটির বেশ কয়েকবার নাম ও স্থান বদল হয়। খুলনার গল্লামারী এলাকায় স্থানান্তরিত করে ১৯৮৩ সালে প্রথমে শশীভূষণ আর্ট কলেজ, এরপর খুলনা আর্ট কলেজ নামকরণ করা হয়। এরপর ১৯৮০ সালে সেখানে প্রতিষ্ঠিত হয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ১৯৯১ সালের দিকে সেখানে একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ও প্রতিষ্ঠা করা হয়। বর্তমানে ওই কমপ্লেক্সেই তিনটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ভবনটি ব্রিটিশ আমলে নির্মিত একটি স্থাপনা। এটি সংরক্ষিত পুরাকীর্তি নয়। শশীভূষণ প্রথম এই বাংলায় চিত্রশিল্প বিদ্যালয় স্থাপন করেন। বিদ্যালয়টির সঙ্গে সাংস্কৃতিক বিকাশের ধারাবাহিকতা ও স্থানীয় মানুষের আবেগ সম্পৃক্ত আছে।

আরও পড়ুন: ৪ হাজার পদে নিয়োগে অনিয়ম, মাউশিতে দুদকের অভিযান

শশীভূষণ বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরও পুরোনো ওই ভবনটিতে পাঠদান করা হতো। পরে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠলে সেখানে আর পাঠদান হয় না। শত বছরের পুরোনো ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ বলে বিদ্যালয়ের ভবনটি বিধি মোতাবেক ভেঙে ফেলার ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য তখনকার প্রধান শিক্ষক নাহিদ সুলতানার কাছে চিঠি পাঠায় কেসিসি।

এরপর ২০২১ সালের ১৪ নভেম্বর সন্ধ্যায় বিদ্যালয়ে শ্রম প্রতিমন্ত্রী বেগম মন্নুজান সুফিয়ানের সভাপতিত্বে এক মতবিনিময় সভায় সিদ্ধান্ত হয় পুরোনো ভবনটি অপসারণ করে এই স্থানে এর আদলে অন্য আরেকটি ভবন নির্মাণ করা হবে।

সরকারি বিএল কলেজের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও গবেষক শঙ্কর কুমার মল্লিক বলেন, এটাই এই বঙ্গের প্রথম শিল্প শিক্ষাকেন্দ্র। এর সঙ্গে একটা ঐতিহাসিক এবং সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ জুড়ে আছে। এটা অবশ্যই বাঁচানো দরকার। এই গুরুত্ব বিবেচনায় এটিকে সংরক্ষনের জন্য জোর দাবি জানান তিনি।

আরও পড়ুন: করোনা রোগী বেড়ে ১৪৯১, বেড়েছে শনাক্তের হারও

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাস্কর্য ডিসিপ্লিনের সহকারী অধ্যাপক মো. শেখ সাদী ভূঁঞা বলেন, শতাব্দীর প্রাচীন পথিকৃৎ শিল্পী শশীভূষণ পাল রায় সাহেবের স্মৃতি বিজড়িত ওই ভবনটি ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্তে আমরা তীব্র নিন্দা জানাই। যেভাবেই হোক ভবনটি সংরক্ষণ করা উচিত।

বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আমিরুল ইসলাম বলেন, ভবনটি নিলামে বিক্রির জন্য গত ২১ ডিসেম্বর পত্রিকায় দরপত্র বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে। ৪ জানুয়ারি ভবনটির দরপত্র জমার শেষ দিন ছিল; মোট ছয়টি দরপত্র পড়েছে।


সর্বশেষ সংবাদ