বিজনেস গ্র্যাজুয়েটদের দখলে সিংহভাগ চাকরির বাজার

অধ্যাপক মো. মামুনার রশীদ
অধ্যাপক মো. মামুনার রশীদ  © টিডিসি ফটো

হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (হাবিপ্রবি) ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদে সম্প্রতি ডিন হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন অধ্যাপক মো. মামুনার রশীদ। এর আগে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়টির হিসাববিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি তার নতুন দায়িত্ব ও নিজের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে মুখোমুখি হয়েছে দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাসের। তার কথাগুলো শুনেছেন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি রিয়া মোদক

আপনি পূর্বে একাউন্টিং বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ছিলেন, বর্তমানে অনুষদের ডিন। কোন দায়িত্বটি বেশি উপভোগ করছেন?
অধ্যাপক মামুনার রশীদ: দায়িত্বকে আসলে আমি কখনোই উপভোগ্য মনে করি না। আমি মনে করি দায়িত্বগুলো হলো কাজের ক্ষেত্র। পূর্বে বিভাগীয় প্রধান হিসেবে আমার কাজের ক্ষেত্র ছিল বিভাগ কেন্দ্রিক। বর্তমানের ডিন হওয়ায় কাজের ক্ষেত্র বেড়েছে, দায়িত্ব বেড়েছে। কাজের মধ্যেই আমি আনন্দ খুঁজে পাই।

ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের অধীনে বিভাগগুলোতে কেমন পাঠদান চলছে? কোনো ধরনের সমস্যা বা সংকট দেখছেন কিনা?
অধ্যাপক মামুনার রশীদ: কিছু অপূর্ণতা তো রয়েছে। আমাদের প্রধান সমস্যা শিক্ষক স্বল্পতা। এই অনুষদের ৪টি বিভাগে শিক্ষাদানের জন্য শিক্ষাছুটি বাদ দিয়ে নিয়মিত শিক্ষক রয়েছেন মাত্র ২২ জন। যেখানে একটি বিভাগেই ২২ জন শিক্ষক থাকা উচিত।

শিক্ষার্থীদের ভাষ্য অনুযায়ী প্রধান সমস্যা হলো সেশনজট। এটা নিয়ে তারা খুব হতাশ। আমাদের প্রথম টার্গেট, করোনার কারণে যে ব্যাচগুলো সেশনজটে পড়েছে সেগুলো কাটিয়ে ওঠা। এজন্য আমি চেয়ারম্যানদের বলেছি।

যখন বিজনেস স্টাডিজ অনুষদ থেকে একটি ডিগ্রি প্রদান করা হতো তখন এই সংখ্যাটা ছিল পর্যাপ্ত। কিন্তু এখন ৪টি ডিগ্রি প্রদান করা হচ্ছে। তাই শিক্ষক স্বল্পতার জন্য ৪টি বিভাগেই পাঠদান খুবই চ্যালেঞ্জিং ব্যাপার হয়ে দাড়িয়েছে। আমাদের যে ফলাফল বিলম্বিত হচ্ছে, এর অন্যতম কারণ শিক্ষক স্বল্পতা। একজন শিক্ষক যে কয়টি কোর্স পরিচালনা করার কথা, তিনি তার চেয়ে বেশি কোর্স নিচ্ছেন।

যে কারণে একইসাথে ক্লাস নেওয়া, পরীক্ষা নেওয়া, খাতা মূল্যায়ন করা—সবমিলিয়ে রেজাল্ট পিছিয়ে যাচ্ছে। তবে আমাদের শিক্ষকরা বেশ আন্তরিক তারা এর মধ্যে অনলাইন, অফলাইন, এক্সট্রা ক্লাস নেওয়ার চেষ্টা করছেন। তবে ইমিডিয়েটলি যদি শিক্ষক সংকট কাটিয়ে উঠতে না পারি, তাহলে শিক্ষার যে মান তা দীর্ঘমেয়াদে বজায় রাখা সম্ভব হবে না।

শিক্ষক সঙ্কটের কথা তুললেন। এ সংকট নিরসনে কী উদ্যোগ নেবেন?
অধ্যাপক মামুনার রশীদ: বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী নিয়োগের বিষয়টি প্রশাসন দেখেন। আমরা শুধু আমাদের চাহিদাটা জানাতে পারি। তারপর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সাথে বিষয়টি যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।

এখানে অনেকগুলো ফ্যাক্টর কাজ কররে। তার মধ্যে অন্যতম হলো পদ ফাঁকা আছে কিনা—সে অনুযায়ী ইউজিসির কাছ থেকে অনুমোদন চাইতে হয়। এই অনুমোদন সাপেক্ষে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করে।

আমরা আমাদের জায়গা থেকে জানিয়েছি, আমরা অত্যন্ত সংকটের মধ্যে আছি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও অবগত আছেন। প্রশাসন উদ্যোগ নিলেই আমরা এই সংকট কাটিয়ে উঠতে পারবো। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে বেশ আন্তরিক। কিছুদিন আগে বেশ কয়েকটি বিভাগে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। আশা করছি খুব শিগগিরই আমাদের অনুষদেও নিয়োগ শুরু হবে।

চাকরির বাজারে হাবিপ্রবির ব্যবসায় অনুষদের গ্র্যাজুয়েটদের কেমন কদর?
অধ্যাপক মামুনার রশীদ: চাকরির বাজারে চাকরির যে মার্কেট শেয়ার তার সিংহভাগ বিজনেস গ্র্যাজুয়েটদের দখলে। তবে ব্যাংকে বিজনেস গ্র্যাজুয়েটদের অগ্রাধিকার পাওয়ার কথা, যদিও বাস্তবে সেটি হচ্ছে না।

বিজনেস ছাড়া বাণিজ্যিকভাবে কৃষি উৎপাদন সম্ভব না, বিজনেস ছাড়া ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিভোলিউশনও সম্ভব না। যদিও জাতীয় পর্যায়ে শুধু বিজনেস গ্র্যাজুয়েটদের নেওয়া হচ্ছে তা না, পাশাপাশি অন্য বিভাগের শিক্ষার্থীদেরও একসেস দেওয়া হচ্ছে। তবে আমি মনে করি জব মার্কেটের শেয়ারটা শুধু বিজনেস গ্র্যাজুয়েটদের হওয়া উচিত। 

ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে যেসব শিক্ষার্থী ব্যবসা শিক্ষা অনুষদের অধীন বিভাগগুলোর প্রতি আগ্রহী থাকেন—এসব শিক্ষার্থীরা নিজেদের সুন্দর ক্যারিয়ারের জন্য শুরু থেকে কীভাবে প্রস্তুতি নিতে পারেন? 
অধ্যাপক মামুনার রশীদ: নতুন যারা আসতে চলেছে তাদের প্রতি আমার পরামর্শ থাকবে, বিশ্ববিদ্যালয় হলো একটি উন্মুক্ত জায়গা। এখানে কেউ যদি নিজেকে গড়তে চায় তার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। যেমন এখানে লেখাপড়া, খেলাধুলা, নানা এক্সট্রা ক্যারিকুলার এক্টিভিটিসের সুযোগ রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সবসময় তারা এই সুযোগ-সুবিধা  গুলো পাবে।

নিজেকে গড়ার মন মানসিকতা থাকতে হবে। একইসঙ্গে লেখাপড়ার পাশাপাশি তারাও চাকরির জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে পারেন। এ প্রস্তুতি জব মার্কেটের প্রতিযোগিতায় নিজেকে এগিয়ে রাখবে।

আপনার পড়াশোনা, শৈশব-কৈশোর কোথায় কেটেছে?
অধ্যাপক মামুনার রশীদ: আমার নিজ জেলা পাবনাতে। গ্রামের প্রাইমারি ও হাইস্কুল থেকে লেখাপড়া শেষ করেছি। সেখানেই আমার বেড়ে ওঠা। এরপর দিনাজপুর সরকারি কলেজে কমার্স থেকে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হই।

তারপর ১৯৯৫-১৯৯৬ সেশন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই। ১৯৯৮ সাল ১ম শ্রেণিতে স্নাতক পাস করি। এরপর ২০০০ সালে ‘এ’ গ্রেড পেয়ে এমবিএ পাস করি। স্নাতক পরীক্ষার ফলাফলের উপর ভিত্তি করে মেধার স্বীকৃতি স্বরূপ আমার হল প্রশাসন থেকে গোল্ড মেডেল পেয়েছি।

আমাদের প্রধান সমস্যা শিক্ষক স্বল্পতা। এই অনুষদের ৪টি বিভাগে শিক্ষাদানের জন্য শিক্ষাছুটি বাদ দিয়ে নিয়মিত শিক্ষক রয়েছেন মাত্র ২২ জন। যেখানে একটি বিভাগেই ২২ জন শিক্ষক থাকা উচিত।

ডিন হিসেবে আপনার দায়িত্বের মেয়াদপূর্ণ হওয়ার পর ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদকে কোনো অবস্থানে দেখতে চান?
অধ্যাপক মামুনার রশীদ: সাবেক যারা ডিন ছিলেন সবাই এই অনুষদের শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য কাজ করে গেছেন। আমিও কাজ করতে চাই। আশা করি এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে। ইনফ্রাচটাকচার ডেভেলপমেন্টের চেয়ে শিক্ষার মান উন্নয়নের দিকে আমি বেশি গুরুত্ব দেবো। আমি না থাকলেও যেন বিভাগটিতে মানসম্পন্ন পাঠদান অব্যাহত থাকে, সেটাই দেখতে চাই।

ডিনের দায়িত্ব পাওয়ার পর অনুষদ নিয়ে বিশেষ কোনো পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন কিনা? 
অধ্যাপক মামুনার রশীদ: আমি ডিন হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর মনে হয়েছে- শিক্ষার্থীরা কি কি সমস্যা ফেস করে, শিক্ষকদের চাহিদা কী, সেগুলো আইডেন্টিফাই করা। সেগুলো কীভাবে ওভারকাম করা যায় তা নিয়ে কাজ করা।

এ বিষয়ে সাবেক ডিন, চেয়ারম্যান ও বিভিন্ন শিক্ষকদের সাথে বসে মতবিনিময় করা। তারা যে সমস্যাগুলো ফেস করেছেন সে সমস্যাগুলোকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সমাধান করা আমার পরিকল্পনার অংশ।

আমি সোশ্যাল মিডিয়ায় শিক্ষার্থীদের দুঃখ-কষ্টের বিষয় দেখেছি। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী প্রধান সমস্যা হলো সেশনজট। এটা নিয়ে তারা খুব হতাশ। আমাদের প্রথম টার্গেট, করোনার কারণে যে ব্যাচগুলো সেশনজটে পড়েছে সেগুলো কাটিয়ে ওঠা। এজন্য আমি চেয়ারম্যানদের বলেছি। অ্যাকাডেমিক ক্যালেন্ডার অনুযায়ী পরীক্ষা নিতে নির্দেশনাও দিয়েছি।

শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে আপনার বিশেষ কোনো বার্তা রয়েছে?
অধ্যাপক মামুনার রশীদ: বিজনেস স্টাডিজ অনুষদের শিক্ষক, শিক্ষার্থী সবাই আন্তরিক। তাদের থেকে সহযোগিতা পাইনি বা তারা আমার থেকে কোনো সহযোগিতা পায়নি এমন কখনো হয়নি। ডিনের স্বার্থে না, শিক্ষার্থীদের স্বার্থে যদি আরও আন্তরিক হওয়ার সুযোগ থাকে, তাহলে সেই আন্তরিকতা দিয়ে সমস্যা সমাধান করার চেষ্টা করবো।

আপনার গুরুত্বপূর্ণ সময়ের অসংখ্যা ধন্যবাদ।
অধ্যাপক মামুনার রশীদ: দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাসের জন্যেও অনেক শুভ কামনা রইলো।

 

সর্বশেষ সংবাদ