বেতন ছাড়াই ঈদ: নীরবে চোখের জল ফেলছেন শিক্ষকেরা

এমপিও
ক্লাস নিচ্ছেন শিক্ষক  © ফাইল ফটো

পাবনার সুজানগর উপজেলার খলিলপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে তৃতীয় গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন হাবিবুল্লাহ রাজু। গত জানুয়ারি মাসে তিনি যোগদান করলেও এখনও এমপিওভুক্ত হতে পারেননি। চাকরি পাওয়ার পর এটাই রাজুর প্রথম ঈদ। তবে বেতন না পাওয়ায় পরিবারের কারো জন্য নতুন কাপড় কিনতে পারেননি তিনি। উল্টো পরিবারের কাছ থেকে টাকা নিয়ে বাড়ি ফিরতে হয়েছে রাজুকে।

বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার একটি বেসরকারি স্কুলে বাংলা বিষয়ের সহকারী শিক্ষক হিসেবে চাকরি করছেন এনায়েতুল্লাহ। অনেক আগেই তার এমপিওভুক্ত শেষ হয়েছে। তবে ঈদের আগে অন্য সবাই বেতন পেলেও কেবল বোনাসই তুলতে পেরেছেন তিনি। যদিও এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বেতন-বোনাসের চেক ছাড় হয়েছে অনেক আগেই। তবে শিক্ষকরা কেবল বেতনের ২৫ শতাংশ বোনাসই তুলতে পেরেছেন। ফলে এবারের ঈদ অনেকটাই ফ্যাকাসে হয়ে গেছে এনায়েতের জন্য।

শুধু রাজু কিংবা এনায়েতুল্লাহ নয়; বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষকদের এবারের ঈত বেতন ছাড়াই উদযাপন করতে হচ্ছে। এতে চরম হতাশা ব্যক্ত করেছেন দেশ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেওয়া শিক্ষকরা। তারা বলছেন, দেশের সরকারি-বেসরকারি সব ধরনের প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ঈদের আগেই বেতন-বোনাস পেয়েছেন।

তারা পরিবার নিয়ে আনন্দের সাথে ঈদ উদযাপন করতে পারলেও শিক্ষকদের অবস্থা খুবই করুন। এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা ৪/৫ হাজার টাকায় এবারের ঈদ উদযাপন করছেন আর যাদের এমপিও হয়নি তাদের কোনো টাকা ছাড়াই ঈদ উদযাপন করতে হচ্ছে। ফলে এবারের ঈদ শিক্ষকদের আনন্দ দেওয়ার পরিবর্তে একরাশ গ্লানি নিয়ে এসেছে।

নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠান বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ) শিক্ষকদের বেতন নিয়ে কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেছেন। তারা বলছেন, তাদের কাজ কেবল সুপারিশ করা। বেতনের বিষয়টি অধিদপ্তরের। আর অধিদপ্তর বলছে, মন্ত্রণালয় থেকে শিক্ষকদের বেতন-বোনাসের চেক ঈদের আগে ছাড় হলেও তারা কেবল বোনাসের অংশটুকুই প্রসেস করতে পেরেছে। শিক্ষকদের মে মাসের বেতন মে মাসেই দেওয়া হবে।

তৃতীয় গণবিজ্ঞপ্তিতে বাড়ি থেকে বেশ খানিকটা দূরে নিয়োগ পান মো. জাকির হোসেন নামে এক শিক্ষক। তিনি দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, গত ফেব্রুয়ারিতে স্কুলে যোগদান হলে আশায় বুক বাঁধতে থাকি। অনেক কষ্ট করে সব কাগজপত্র জোগাড় করে এমপিওর আবেদন করি। তবে আমার ফাইল এখনো ডিডিতে আটকে আছে। তিনমাস ধরে বিনা বেতনে খেটে যাচ্ছি। ধার দেনা করে চলছে জীবন। এক বন্ধুর থেকে ধার এনে আরেক বন্ধুকে দিই। রমজান মাসে ঠান্ডা পানি আর মুরি-চানাচুর দিয়ে ইফতার করছি। মাঝে মাঝে সন্ধ্যা রাতে না খেয়ে একবারে ভোর রাতে খেয়ে রোজা রেখেছি। বাসা বাড়া, হোটেলে খাওয়ার বিল পরিশোধ করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, আমার বাবা একজন ক্যান্সার রোগী। আমার যোগদানের খবর শুনে সেদিন বাবার চোখে সুখের কান্না চলে এসেছিল। কিন্তু সেই সুখ তিনি চোখে দেখে যেতে পারবেন কিনা সন্দেহ। আজ আমি বেকার চাকরিজীবী। বাড়িতে আসছি শূন্য হাতে। চাকরি করেও বাবা-মার জন্য ঈদের একটা পোশাক কিনে দিতে পারি নাই। বাবার অসুস্থতার সময়ে তার হাতে একটা আপেল কিনে দিতে পারি না। চাকরিতে ঢোকার আগে এমনভাবে যাচাই-বাছাই করা হলো মনে হচ্ছে আমি দেশের কোন ১ম শ্রেণির চাকরিটা পেয়েছি। প্রিলি, রিটেন ভাইভা, এরপর পুলিশ ভেরিফিকেশন। সবকিছু হলেও আমার বেতনটাই হলো না।

মো. সাব্বির আনোয়ার নামে আরেক শিক্ষক জানান, একই সাথে প্রিলি  রিটেন,  ভাইভা দিলাম।  নিয়োগ পেলাম, যোগদানও করলাম। কেউ দুইমাস ধরে বেতন ভাতা সব ভোগ করছে,  আর কেউ নীরবে চোখের পানি ফেলে দিনযাপন করছে। চাকরিজীবনের প্রথম ঈদ,  বাবা বেঁচে নেই অথচ মায়ের হাতে ২৫ পয়সার কোন জিনিসও তুলে দিতে পারলাম না। আর নিজেরা যে কিভাবে দিন পার করছি সেটা আসলে ভাষায় প্রকাশ করা যাচ্ছে না।  আসলে আমাদের অপরাধ কি? আমরাতো তিনমাস ধরে নিয়মিত স্কুল করলাম, তাহলে আমরা আজ কেন বঞ্চিত?  জাতি গড়ার কারিগর হিসেবে নিজেকে বেছে নেয়াই কি আমাদের অপরাধ? আজ কারো কাছে দশ টাকা ধার চাইলে বলে এতগুলো বেতন বোনাস পাওয়ার পরও টাকা ধার চাইছো? এর উত্তর কোথায় পাব?  কে দেবে এর সমাধান?

মো. আবু সাঈদ বলেন, জীবনে এরকম পরিস্থিতিতে কখনও পড়িনি। এই অবস্থায় কি বলবো সেটাই ভেবে পাচ্ছি না। সরকার শিক্ষিত দেশ গড়বেন, কিন্তু সেই শিক্ষার কারিগর যারা তাদের রেখেছে পায়ের তলাতেই। সামান্য বেতন তাও যদি দিত। আজ এমন একটা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যে একজন শিক্ষক তার সন্তানকে এই ঈদে একটি জামা কিনে দিতে পারছে না। সন্তানের সামনে পিতা দাঁড়াতে পারছে না। আমাদের চাকরি শুধু শুধু নামের। এই চাকরির কোনো মূল্য নেই।

মো. মিলন শাহ্ নামে আরেক শিক্ষক জানান, বেতনের ২৫ শতাংশ বোনাস পেয়েছি। বাড়িতে যেতেই সিংহভাগ টাকা খরচ হয়ে গেছে। এই অবস্থায় বেতন ছাড়া ঈদ করা সত্যিই কষ্টকর। বাবা, মা,  স্ত্রী, মেয়ে কারো মুখের দিকে সাহস নিয়ে তাকাতে পারি না৷ শুধু  মুখ লুকিয়ে নিতে হচ্ছে। নিজেকে অপরাধী মনে হচ্ছে। শিক্ষকতা পেশায় এসে কি ভুলই করলাম এখন আমার এটা মনে হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে এই পেশার সাথে নিজেকে খুব বেশিদিন যুক্ত রাখা সম্ভব হবে না।

ঈদের আগে শিক্ষকদের বেতন না হওয়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের উপসচিব (বাজেট) মো. নূর-ই-আলম দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের এপ্রিল মাসের বেতন ও ঈদুল ফিতরের উৎসব ভাতার প্রস্তাব এপ্রিল মাসের ২১ তারিখে পাস পাস হয়েছে। শিক্ষকরা বোনাস পেলেও বেতন কেন পাননি সেটি সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা ভালো বলতে পারবেন।

শিক্ষকদের বেতন না হওয়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক প্রফেসর নেহাল আহমেদকে ফোন দেওয়া হলে তিনি এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট শাখার কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগের পরামর্শ দেন।

পরে এ বিষয়ে জানতে অধিদপ্তরের ফিন্যান্স এন্ড প্রকিউরমেন্ট উইং এর পরিচালক প্রফেসর সিরাজুল ইসলাম খানকে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।


x

সর্বশেষ সংবাদ