‘আমার পেছনে লাগলে শুধু ভিকারুননিসা না, দেশ ছাড়া করব’-অধ্যক্ষের ফোনালাপ ফাঁস

করোনা
অধ্যক্ষ কামরুন নাহার (মুকুল)   © ফাইল ছবি

ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের (ভিএনএসসি) অধ্যক্ষ কামরুন নাহার (মুকুল) ও মীর সাহাবুদ্দিন টিপু নামে এক অবিভাবকের মধ্যকার ফাঁস হওয়া ফোনালাপ নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে।

ফোনালাপের একপর্যায়ে অধ্যক্ষকে বলতে শোনা যায় 'আমি বালিশের নিচে পিস্তল রাখি। কোনো .... বাচ্চা যদি আমার পেছনে লাগে আমি কিন্তু ওর পেছনে লাগব, আমি শুধু ভিকারুননিসা না আমি দেশছাড়া করব।' ৪ মিনিট ৩৯ সেকেন্ডের ফাঁস হওয়া ওই ফোনালাপের অডিওটি নিয়ে বেশ সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।

ফোনালাপে কামরুন নাহারকে বলতে শোনা যায়, 'আমি অনেক সহ্য করেছি। এই কালকে সচিবের কাছে বলে এসেছি। সচিব বলেছে মন্ত্রী তোমাকে খুব ভালোবাসে। তুমি এই জায়গায় থাকবা। তুমি যোগ্য, মন্ত্রী তোমাকে পছন্দ করেন।'

অভিভাবকের এক কথার উত্তরে তিনি আরো বলেন, 'কোন মেম্বার আর কোন মার ভাতার আমার দেখার বিষয় না। কোনো বাচ্চা যদি আমার পেছনে লাগে আমি কিন্তু ওর পেছনে লাগব। আমি তাকে শুধু ভিকারুননিসা না, দেশ ছাড়া করব।'
এছাড়াও ওই ফোনালাপে অধ্যক্ষ কামরুন নাহার বলেন, তা পক্ষে ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও মহিলা লীগ আছে। আলাপের একাধিক জায়গায় তাকে অশালীন শব্দ বলতেও শোনা গেছে।

ফাঁস হওয়া এই অডিও কথোপকথনকে ভিএনএসসির দীর্ঘদিনের সুনাম বিধি অনুযায়ী ও ঐতিহ্যের ওপর আঘাত বলে মন্তব্য করেছেন প্রতিষ্ঠানটির অনেক শিক্ষক, অভিভাবক, সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীরা। এ প্রসঙ্গে গভর্নিং বোর্ডের একাধিক সদস্য বলেন, এই অধ্যক্ষ বছরের প্রথম দিন যোগদান করেন। এরপর থেকেই তিনি প্রতিষ্ঠানে আসেননি বললেই চলে। কেউ যদি তাকে প্রতিষ্ঠানে আসার বিষয়ে অনুরোধ করেন, তিনি (কামরুন নাহার) সবাইকে দেখে নেওয়ার হুমকি দেন। তিনি শুধু শিক্ষক নন, বড় রাজনীতিক এবং ছাত্রলীগ, যুবলীগ, মন্ত্রী, সচিবালয় এবং সরকারের শীর্ষ পর্যায় পর্যন্ত তার পক্ষে লোক আছে বলেও দাবি করেন।

এ বিষয়ে গভর্নিং বড়ির নির্বাচিত সদস্য সিদ্দিকী নাসির উদ্দিন (মাধ্যমিক) বলেন, ' বছরের জানুয়ারির প্রথম দিন যোগদান করেছেন কামরুন নাহার। তিনি শুরু থেকেই প্রতিষ্ঠানবিমূখ। করোনাকালে অনেক শিক্ষার্থীর অভিভাবক মারা গেছেন। তারা কেউ ফুল ফ্রি বা হাফ ফ্রির আবেদন করে। সেগুলোর কোনো সুরাহা করতে অভিভাবকরা অধ্যক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি। গত ছয় মাসে অধ্যক্ষ কোনো প্ল্যান করেননি। অভিভাবকরা আমাদের কাছে নানা দাবি-দাওয়া নিয়ে আসে। আমরা অধ্যক্ষকে বললে তিনি খারাপ ব্যবহার করেন। অডিওটি নিয়ে শিক্ষা সচিবের সঙ্গে কথা বলব। অধ্যক্ষের ভাষা এটা হতে পারে না। আমি এ বিষয়ে গভার্নিং বোর্ডের সভাপতি বিভাগীর কমিশনার খলিলুর রহমানকে জানিয়েছি। তিনি বলেছেন, এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

মীর সাহাবুদিন টিপুর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, গত ১০ জুন কামরুন নাহারের সঙ্গে আমার কথা হয়। কিছুক্ষণ ভালোভাবে কথা বলার পরই অধ্যক্ষ এভাবে কথা বলতে শুরু করেন। এর কয়েক দিন পর অধ্যক্ষ নিজেই ১৫ বারের বেশি আমাকে ফোন করেন। তিনি আমাকে প্রতিষ্ঠানে অথবা তার বাসায় দেখা করতে বলেন। দুই জায়গাতেই সিসিটিভি ক্যামেরা আছে এবং কী থেকে কী হয়, এই ভেবে আমি অপারগতা প্রকাশ করি। কারণ এমনিতেই সবাই বলে আমি আপনাকে শেল্টার দিই। তাই অন্য কোনো জায়গায় দেখা করি। এরপর অফিসার্স ক্লাবে তার সঙ্গে দেখা হয়।'

তবে যুব মহিলা লীগে সভাপতি বলেন, 'গভার্নিং বোর্ডের কয়েকজন সদস্য ভর্তি বাণিজ্যসহ বিভিন্ন বিষয়ে কামরুন নাহারকে মানসিকভাবে নির্যাতন করে আসছে। তাকে অনেকে উত্তেজিত করে এই অডিও নিয়েছে।'

গত ১৯ জুলাই ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজে গরুর হাট বসিয়ে অনিয়ম করার অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ কামরুন নাহারের অপসারণ দাবি করেন অভিভাবকদের একাংশ। ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে ভিএনএসসি অভিভাবক ফোরাম আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি।

এছাড়াও এর আগে যেসব শিক্ষার্থীর অভিভাবক মারা গেছেন তাদের বিনা বেতনে পড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হলেও সে বিষয়ে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেননি অধ্যক্ষ। সভাপতি হিসেবে ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার স্কুলের জন্য সময় দিতে পারেন না এবং অধ্যক্ষ বেপরোযভাবে অনিয়ম করে যাচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে অভিভাবকরা বলেন, ভিকারুননিসার বেইলি রোড ক্যাম্পাসের মধ্যে ফখরুদ্দিনের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠ কলেজ খোলা থাকলে ক্যাম্পাসে তাদের ব্যবসা চলে। তারা অভিযোগ করেন, ১১ নম্বর গেট দিয়ে মেয়েদের প্রবেশ করতে হয়। এ সময় ফখরুদিন বিরিয়ানির কর্মচারীর খালি গায়ে ঘোরাফেরা করে। নোংরা পরিবেশ শিক্ষার্থীদের জন্য বিব্রতকর। আমরা অভিভাবকরা তার অপসারণ দাবি করছি।

বোর্ডের চেয়ারম্যানের নির্দেশে কলেজ পরিদর্শক অধ্যাপক আবু তালের মো. মোয়াজ্জেম হোসেন স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়েছে, ঢাকা মহানগরের ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের গভর্নিং বড়ির কতিপয় সদস্যের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ পাওয়া গেছে। তার মধ্যে শিক্ষকদের সঙ্গে অশোভন আচরণ, ভর্তিসহ কলেজের যাবতীয় আজে অযাচিত হস্তক্ষেপ, ভর্তিবাণিজ্য ও কলেজের উন্নন ও সংস্কারমূলক কাজে আর্থিক অনিয়মের চেষ্টাসহ বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ পাওয়া এতে আরও বলা হয়েছে, এসব অভিযোগ খতিয়ে দেখতে ১৮ জুলাই তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড।

আরও জানা গেছে, স্কুল-কলেজ ও সংরক্ষিত নারী আসনে নির্বাচিত মেট সাতজনের বিরুদ্ধে এ অভিযোগ তোলা হয়েছে। তারা হচ্ছেন মাধ্যমিকের অভিভাবক প্রতিনিধি সী নাসির উদ্দিন ওয়াহেদুজ্জামান মন্টু, কলেজ স্তরে অভিভাবক প্রতিনিধি মনিরুজ্জামান খোকন, বদরুল আলম, মোর্শেদ আক্তার এবং সংরক্ষিত নারী আসনে। নির্বাচিত রীনা পারভিন ও জান্নাতুল ফেরদৌস তার বিভিন্ন সময়ে অতিরিক্ত ভর্তি নিতে অধ্যক্ষকে চাপ সৃষ্টি করেন। অধ্যক্ষ তাতে রাজি না হলে তার সঙ্গে অশোভন আচারণসহ ভয়ভীতি দেখান বলে জানা গেছে।

 


মন্তব্য

সর্বশেষ সংবাদ