০৪ মে ২০২৬, ২২:৫৫

সেই ‘এক্টিং প্রভোস্ট’ ছাত্রদল নেতাই নবীনদের সিট দিলেন

লটারির মাধ্যমে সিট বণ্টনকালে ছাত্রদলের দপ্তর সম্পাদক নোমান ভূঁইয়া (গোল চিহ্নিত) ও ডা. সৈয়দ ইমরান আশফাক সিসিল (বেগুনি রঙের শার্ট পরিহিত)  © সংগৃহীত ও সম্পাদিত

বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজে (শেবাচিম) ‘ভারপ্রাপ্ত হল প্রভোস্ট’ পরিচয় দেওয়া সেই ছাত্রদল নেতাই নবীন শিক্ষার্থীদের হোস্টেলের সিট বণ্টন করেছেন। এ সময় প্রশাসন ও শিক্ষকদের মধ্যে মাত্র একজন শিক্ষক উপস্থিত ছিলেন। মেধার ভিত্তিতে সিট বণ্টন না হওয়ার পাশাপাশি নবীন শিক্ষার্থীদের সিট পেতে নানা হয়রানির মুখে পড়তে হয়েছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। আসবাবপত্র নিয়ে বৃষ্টিতে ভিজে সাড়ে তিন ঘণ্টার অপেক্ষা শেষে সিট বুঝে পেয়েছেন তারা।

অভিযোগ, অন্যান্য বছর ওরিয়েন্টেশন অনুষ্ঠানেই এ কাজটি করা হয়ে থাকলেও এবার অ্যালটমেন্ট পেতে এ ভবন-ও ভবন ছোটাছুটি করতে হয়েছে শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের। সাড়ে ১২টায় অনুষ্ঠান শেষ হলেও সিট বুঝে পেতে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অপেক্ষা করতে হয়েছে বিকেল সাড়ে ৩টা পর্যন্ত।

মেডিকেল সূত্র বলছে, গতকাল রবিবার (৩ মে) সারাদেশে একযোগে ১১২টি মেডিকেল কলেজের ‍ওরিয়েন্টেশন অনুষ্ঠিত হয়। এদিন শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজের অডিটোরিয়ামে এই অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। সাধারণত, এই অনুষ্ঠানে নবীন শিক্ষার্থীদের সিট বণ্টন করা হয়ে থাকলেও এবার সেটি করা হয়নি।

আরও পড়ুন: নবীন ছাত্রদের সিট দিচ্ছেন ছাত্রদল নেতারা, দপ্তর সম্পাদক বললেন— ‘আমি তোমাদের এক্টিং প্রভোস্ট’

দীর্ঘদিন থেকে নবীন ছাত্রদের জন্য কলেজের দ্বিতীয় হোস্টেল বরাদ্দ রাখা হয়েছে। তবে উন্নয়ন কার্যক্রমের জন্য এই হোস্টেলটি সম্প্রতি ভেঙে ফেলায় স্টাফ কোয়ার্টারে তাদের আবাসনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সেখানে ২৪টি কক্ষে ৮০ ছাত্রের অ্যালটমেন্ট দেওয়ার কথা। কিন্তু নবীন শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ছাত্রদের সংখ্যা সাপেক্ষে পর্যাপ্ত কক্ষ থাকলেও ওরিয়েন্টেশন প্রোগ্রামে সিটের ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি। এতে বাড়ি ছেড়ে আসবাবপত্র নিয়ে আসা শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা অনিশ্চয়তায় পড়েন।

তারা বলছেন, কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থী বা অভিভাবকদের সুস্পষ্ট কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। ফলে বৃষ্টির মধ্যে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা এদিক-ওদিক ঘোরাঘুরি করছিলেন। এ সময়ে ছাত্রদের সিট বণ্টনের দায়িত্বে থাকা ডা. সৈয়দ ইমরান আশফাক সিসিল এবং ডা. কাশেদুল ইসলাম নয়নকেও পাওয়া যায়নি। উভয়েই বিএনপিপন্থী চিকিৎসকদের সংগঠন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) আজীবন সদস্য।

আরও পড়ুন: হোস্টেলে যাওয়া-আসার পথে জুনিয়রদের ইভটিজিংয়ের শিকার সিনিয়র ছাত্রীরা

নবীন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রায় এক ঘণ্টা পরে ৫৪তম ব্যাচের শিক্ষাথী ও ছাত্রদলকর্মী মেহেদী হাসান আকাশ নবীন শিক্ষার্থীদের নিয়ে খোলা ম্যাসেঞ্জার গ্রুপে একটি ম্যাসেজ দেন। এতে তাদেরকে অধ্যক্ষের কক্ষের সামনে যাওয়ার জন্য বলা হয়। আরও বলা হয়, সেখানে অ্যালটমেন্ট দেওয়া হবে। এ জন্য শিক্ষার্থীদের তরফ থেকে আবেদন করতে হবে বলেও জানানো হয়। এই ম্যাসেঞ্জার গ্রুপটি খুলেছিলেন ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা।

তবে ম্যাসেঞ্জার গ্রুপের নির্দেশনা অনুসরণ করে শিক্ষার্থীরা সেখানে না যাওয়ায় সিট বণ্টনের দায়িত্বে থাকা ডা. সৈয়দ ইমরান আশফাক সিসিল এগিয়ে আসেন। তিনি শিক্ষার্থীদের নিয়ে এক রুম থেকে অন্য রুমে ছুটাছুটি করতে থাকেন। কিন্তু তখনও শিক্ষার্থীদের স্পষ্ট কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। এ সময় প্রথমে ডা. সিসিল ৩ জন করে রুমমেট সিলেক্ট করে আবেদন জমা দিতে বলেন। তিনি জানান, প্রথমে ৩ জন করে রুম নির্ধারণ করা হবে, পরবর্তীতে যারা বাকি থাকবে তাদের একজন করে ৩ জনের রুমগুলোতে দেওয়া হবে। যদিও আবেদন নয়, স্বাভাবিকভাবেই নির্ধারিত সিট পাওয়ার কথা শিক্ষার্থীদের। তবে পরবর্তীতে আবেদনের প্রয়োজন নেই বলেও জানান ডা. সিসির। শুধু নাম আর রোল জমা দিতে বলেন।

আরও পড়ুন: কাউকে কান ধরিয়ে, কারও হাত উঁচিয়ে— ২৬ শিক্ষার্থীকে রাতভর র‌্যাগ দিলেন ছাত্রদল নেতারা

এদিকে নবীন শিক্ষার্থীদের নিয়ে খোলা ম্যাসেঞ্জার গ্রুপে ছাত্রদল নেতাদের আলাপ-আলোচনাই বাস্তব হয়েছে সিট বণ্টনের ক্ষেত্রে। গত দুই বছর ধরে হয়ে আসা মেধার ভিত্তিতে সিট বণ্টনে এবার ছেদ পড়েছে। প্রথমে কক্ষের মধ্যে বসে আধা ঘণ্টা ধরে লটারির প্রস্তুতি নেওয়া, পরে হলের বাইরে জড়ো হয়ে লটারি করার ক্ষেত্রেও হয়রানি হয়েছে বলে অভিযোগ তাদের। এই পুরো প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিলেন শাখা ছাত্রদলের দপ্তর সম্পাদক নোমান ভূঁইয়াসহ অন্যান্য নেতাকর্মীরা। শিক্ষক ও কলেজ প্রশাসনের পক্ষ থেকে শুধুমাত্র ডা. সিসিল উপস্থিত ছিলেন।

এর আগে গত ২ মে ম্যাসেঞ্জার গ্রুপের বেশ কয়েকটি স্ক্রিনশট ফাঁস হয়। সেখানে নোমান ভূঁইয়াকে নিজেকে নবীন শিক্ষার্থীদের এই হোস্টেলের ভারপ্রাপ্ত প্রভোস্ট বলে পরিচয় দিতে দেখা যায়। ওই ম্যাসেজে তিনি লিখেছিলেন, ‘আমি মুহাম্মদ নোমান। ৫৩তম ব্যাচ। আমি তোমাদের হলের এক্টিং প্রোভোস্ট। আমি তোমাদের হলের এলটমেন্ট এবং ডাইনিংয়ের দায়িত্বে আছি।’

আরও পড়ুন: সোহরাওয়ার্দী মেডিকেলে অধ্যক্ষের কক্ষে শিক্ষার্থীকে ছাত্রদল নেতার চড়-থাপ্পড়, চেয়ার ছুড়ে মারধর

এসব বিষয়ে জানতে মুঠোফোনে কল দেওয়া হলে সিট বণ্টনের দায়িত্বে থাকা ডা. সৈয়দ ইমরান আশফাক সিসিল কথা বলতে রাজি হননি। শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজের ২ নং হোস্টেল প্রভোস্ট ডা. মো. আমিরুল ইসলাম দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, অধ্যক্ষ এবং ডা. সৈয়দ ইমরান আশফাক সিসিল সিট বণ্টন করেছেন।

প্রভোস্ট বলেন, যখন আপনি আমাকে ফোন দিয়েছেন (২ মে), তখন আমি জিনিসটা সম্পর্কে সাবধান হয়েছি। আপনি যদি একদিন আগে আমাকে ফোন দেন যে এখানে একটা অনিয়ম হচ্ছে, তখন আমার কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে। জানানোর পরে, যেহেতু আপনাদের কাছে অভিযোগ করেছে, এর ফলে স্যাররা স্যাররা ওদের সঙ্গে কথা বলেছেন। জানতে চেয়েছেন, ওরা কী চায়? সে অনুযায়ী করতে হয়েছে। এজন্য তো একটু দেরি হবেই। আমরা এটা বুঝে গেলাম যে এভাবে করলে পরে এভাবে করা যায়। শিক্ষার্থীরা যেভাবে চেয়েছে, সেভাবে দেওয়া হয়েছে। যা কিছু হয়েছে, সবার সামনে হয়েছে।

‘এক্টিং হল প্রভোস্ট’ পরিচয় দেওয়া ছাত্রদল নেতা ও অন্যান্য নেতাকর্মীদের উপস্থিতি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সে থাকলে থাকবে। কিন্তু তাকে তো আমরা কোন কিছুর মধ্যে রাখি নাই।