ঈদ সালামির টাকা ১০ থেকে ১৫ বার গুনে আবার লুকিয়ে রাখতাম

অধ্যাপক ড. কামাল উদ্দিন
অধ্যাপক ড. কামাল উদ্দিন  © টিডিসি সম্পাদিত

বছর ঘুরে আবারও এসেছে মুসলিম সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতর। আর ঈদ মানেই খুশি, ঈদ মানেই আনন্দ। শৈশব-কৈশরের ঈদ স্মৃতি ও ঈদ উল ফিতরের শিক্ষা, তাৎপর্য এবং বাস্তবতা নিয়ে দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাসের সঙ্গে কথা বলছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মো. কামাল উদ্দিন। সাক্ষাৎকারের চম্বুক অংশ তুলে ধরেছেন চবি প্রতিনিধি সুমন বাইজিদ-

দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাস: আপনার শৈশবের ঈদ কেমন ছিল? সে সময়ের ঈদের আনন্দের কিছু বিশেষ মুহূর্ত কি মনে পড়ে? 

অধ্যাপক ড. কামাল উদ্দিন: শৈশবের ঈদ প্রতিটি মানুষের জীবনেই আনন্দের। আমারও শৈশবের ঈদটা অনেক আনন্দের ছিল। আমরা ছয় ভাই ও দুই বোন। সবার সাথে ঈদ কাটানো এটা খুবই আনন্দের বিষয়। আমার বন্ধু-বান্ধব থেকে শুরু করে সবাই আমাকে খুব বেশি আদর করত। আমি একটু দুষ্ট প্রকৃতির ছিলাম এবং যে কোন কাজেই আমি অংশগ্রহণ করতাম। বন্ধুরা সবাই আমাকে অনেক গুরুত্ব দিত। তবে, আমার ঈদের আনন্দের মধ্যেও একটা বিষাদ ছিল এবং আছে। খুব ছোট বয়সেই মাকে হারিয়েছি। ঈদে মা থাকাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারের সবাই থাকলেও মা না থাকাতে শৈশবের ঈদ আনন্দ মলিন ছিল। মায়ের ঘাটতি সবসময় মনে পড়ে। ঈদের আনন্দের মধ্যে সবচেয়ে বড় যে বিষয়টি ছিল তা হলো ঈদের নতুন কাপড় কেনাকাটা করা। অন্যদের সাথে তুলনা করতাম কার কাপড়টা কত ভালো হয়েছে। বাজার থেকে আব্বা কোনো কিছু কিনে রাতে আমাদেরকে জাগিয়ে দিতেন। সারারাত একটু করে কাপড় দেখতাম আর ঘুমাতাম। যা অন্যরকম একটা আনন্দ হত। এগুলো এখন আর নাই!

দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাস: আপনার শৈশবের ঈদকে কীভাবে বর্ণনা করবেন? বিশেষ কোন স্মৃতি এখনও আপনার মনে পড়ে?

অধ্যাপক ড. কামাল উদ্দিন: রমজানের শেষ দিক থেকেই ঈদের প্রস্তুতি নিতাম। বাংলাদেশ গ্রামীণ অঞ্চলের ধর্মপ্রাণ পরিবারগুলোর মতই আমার পরিবার। ছোট থেকেই নামাজ পড়তাম, সন্ধ্যার পরে বাইরে থাকাটা একধরনের অপরাধ ছিল। আমি খুব ছোট থেকেই তারাবির নামাজ পড়া, রোজা রাখা এগুলো নিয়মিত করতাম। যিনি আমাদের মসজিদের হাফেজ ছিলেন তিনি আমাদের বাড়িতে থাকতেন। সেই হিসেবে তার সাথে একটা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। একসাথে সেহেরি, ইফতার এগুলো করতাম। এই স্মৃতিগুলো খুব বেশি মনে পড়ে। এখন দায়িত্বের কারণে ঠিকমতো এগুলো হয়না। আমাদের সময় রমজান ও ঈদের যে দাওয়াতগুলো এখনকার সময় সেগুলো একদমই আলাদা। ঈদের দিন ভোরে ঘুম থেকে উঠতাম। সকালবেলা মা রান্না করতো আমরা বসে থাকতাম। এভাবেই শুরু হত আমার শৈশবের ঈদ। মসজিদে যাওয়া এবং সবার সাথে কোলাকুলি করা ছিল বিশেষ স্মৃতি। সবাই মিলে কবর জিয়ারত করতে যেতাম। আত্মীয়-স্বজনসহ এলাকার যেসব মুরুব্বি ছিলেন সবাইকে পা ছুঁয়ে সালাম করতাম। তারা আমাদেরকে আদর করত এগুলো এখন খুব মনে পড়ে। এখন এগুলো একদমই নাই। নামাজ শেষে সবার সাথে কোলাকুলি না করে আমরা বাড়ি যেতাম না। এখন দেখা যায় যে যার যার মত চলে যাই, এগুলো খুব কষ্ট লাগে!

দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাস: শৈশবে ঈদ উদযাপনের সময় আপনার পরিবার বা গ্রামের বিশেষ কোনো রীতি বা পরম্পরা ছিল কি?

অধ্যাপক ড. কামাল উদ্দিন: নোয়াখালীর একটা প্রত্যন্ত অঞ্চলে আমি বড় হয়েছি। সেখানে একটি আবহমান কালচার আছে সেটি হলো ঈদে আত্মীয়স্বজন সবাই একসাথেই চলে আসত। বিশেষ করে রমজানের ঈদ পরিবারের সবাই মিলে একসাথে কাটাতো। ঈদের নামাজ পড়তে বাড়ি থেকে অনেক দূরে পায়ে হেঁটে। এখন বাড়ির দরজায় মসজিদ সেখানেই ঈদের নামাজ হয়। আগের সে আনন্দ আর নেই। তখন কোন মোবাইল ছিল না। আমরা অনেক বেশি সময় পেতাম এবং মজা করতাম। ঈদের নামাজ শেষ করে এসে হালকা খাওয়া-দাওয়া করে আবার বন্ধু-বান্ধব সবাই মিলে বের হতাম এটাই আসলে গ্রামীণ কালচার। গ্রামের মুরুব্বি যারা মারা গেছেন তাদের কবর জিয়ারত করতে যেতাম, আত্মীয়-স্বজনদের বাসায় বেড়াতে যেতাম। যেখানে যেতাম খালি মুখে আমরা ফেরত আসতাম না। ছোটবেলায় আমরা সাইকেলে করে দূরের আত্মীয়-স্বজনদের বাড়িতে বেড়াতে যেতাম। অনেক আনন্দে সময়গুলো কাটত। 

দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাস: ঈদের দিন আপনার বাড়িতে কী ধরনের খাবার প্রস্তুত করা হতো? কোনো বিশেষ মিষ্টি বা খাবারের প্রতি আপনার প্রবণতা ছিল কি?

অধ্যাপক ড. কামাল উদ্দিন: মা-খালারা ঈদে সেমাই, হাতে কাটা ছোট পিঠা বানাত। এগুলো খেতে খুব পছন্দ করতাম। এগুলোকে নানা ভাবে নানা কৌশলে রান্না করা হত। ঈদের দিনে দেশি মুরগি খেতে পছন্দ করতাম। সত্যি বলতে মায়ের হাতের সব রান্নাই খুবই ভালো লাগত। ঘরোয়া পরিবেশের খাবারগুলো পছন্দ করতাম। সবচেয়ে বেশি ভালো লাগার বিষয়টি হলো বন্ধুদের বাড়িতে গিয়ে দাওয়াত খাওয়া। এগুলো অনেক এনজয় করতাম।

দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাস: ঈদ উপলক্ষে আপনি কি কোনো বিশেষ কাজ বা অনুষ্ঠান আয়োজন করতেন? এখন কোনো অনুষ্ঠান করেন কি-না?

অধ্যাপক ড. কামাল উদ্দিন: এটা আমি এখনো করি। শৈশব থেকে এখন পর্যন্ত বন্ধুরা মিলে ঈদের দিন ফুটবল খেলতাম। গ্রামের দুষ্টু ছেলেরা তাস অন্যান্য খারাপ কাজে জড়িয়ে পড়ত। কিন্তু আমরা নামাজ পড়ে বিকেলের দিকে বিভিন্ন খেলা, বা অনুষ্ঠান আয়োজন করতাম। আমাদের ঈদ আসলে একদিনের ছিল না, আমাদের ঈদ ছিল কয়েকদিন। একেক দিন একেক জায়গায় যেতাম একেক অনুষ্ঠান আয়োজন করতাম। আমরা এখনো এই কাজটা করি। এবছর আমার একটু ব্যস্ততা থাকার কারণে আমি এবার বাড়িতে যেতে পারছি না, তবে আমার অন্যান্য বন্ধু  যারা আছে তারা এটা আয়োজন করবে। আমাদের সময় টেলিভিশনে বাংলা ছায়াছবির গান হতো। রাতে আমরা সেগুলো শুনতে যেতাম। এগুলো আসলে অন্যরকম ভালো লাগার সময় ছিল। 

দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাস: শৈশবের ঈদে সঙ্গী-সাথীদের সাথে কোন ধরনের খেলা বা আনন্দের সময় কাটিয়েছিলেন?

অধ্যাপক ড. কামাল উদ্দিন: হ্যাঁ। ঈদে আমরা বিভিন্ন ধরণের খেলার আয়োজন করতাম। আমাদের এলাকার বাজারে হ্যাজাক লাইটের আলোতে রাতে পর্যন্ত খেলার আয়োজন করতাম। বন্ধুরা সবাই মিলে একসাথে হয়ে এটি করতাম, এখনো করি। এটি আনন্দের সময় ছিল।  

দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাস: আপনার শৈশবের ঈদ নিয়ে পরিবারের সদস্যদের কোন স্মৃতি বা গল্প এখনও শোনা যায়?

অধ্যাপক ড. কামাল উদ্দিন: হ্যাঁ এগুলো খুব বেশি শুনি। আমি একটু অভিমানী প্রকৃতির ছিলাম। আমার আত্মীয়-স্বজনরা এখনো এটা বলে। আমি যেকোনো জিনিসের জন্য প্রতিযোগিতা করতাম। আমার ভাইয়ের জিনিসটা আমার ভালো লাগতো, নিজেরটা কম পছন্দ হতো। এই কথাগুলো এখন পরিবার আমাকে স্মরণ করিয়ে দেয়। ভাই-বোনদের জন্য আব্বা কাপড় নিয়ে আসলে আমি সেগুলো লুকিয়ে রাখতাম। সকালে পর্যন্ত তারা খুঁজে পেত না। এভাবেই কাটত শৈশবের ঈদ।

দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাস: ঈদ উদযাপন কীভাবে আপনার শিক্ষা জীবনকে প্রভাবিত করেছে, বিশেষ করে ঐক্য, সংহতি বা উদারতা?

অধ্যাপক ড. কামাল উদ্দিন: ঈদের পর সব সময় ঈদ আড্ডা করি। বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকেই এটা হয়ে আসছে। আমাদের অঞ্চলের যত গ্র্যাজুয়েট আছে তারা সবাই এই আড্ডায় অংশগ্রহণ করে। দল মত নির্বিশেষে এটি অন্যরকম একটা আনন্দ দেয়। সবাই সবার মতামত ব্যক্ত করে, আমরা একে অন্যের আইডিয়াগুলো শেয়ার করি। দরিদ্র মানুষের জন্য আমরা কাজ করি। শিক্ষার্থীদেরকেও আমরা বিভিন্ন সহযোগিতা করি। পাবলিক এবং প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের নিয়ে এই আড্ডাটা করি। এর মাধ্যমে আমাদের মধ্যে একটা সম্প্রীতি তৈরি হয়। 

দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাস: শৈশবে ঈদে সবচেয়ে বেশি যা উপভোগ করেছেন, তা কী ছিল—পারিবারিক মিলনমেলা, মিষ্টি খাবার, নাকি অন্য কিছু?

অধ্যাপক ড. কামাল উদ্দিন: শৈশবের ঈদে উপভোগের একক কোন বিষয় ছিল না। পারিবারিক মিলন মেলা, ঈদে কি কি নতুন কাপড় আসছে তা বন্ধুদের সাথে ঘুরে ঘুরে দেখা, ঘুরতে যাওয়া, খেলাধুলা করা, মজার খাবার ইত্যাদি সবই উপভোগ করতাম। বলা যায় প্রায় সবই।

দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাস: আপনার শৈশবের ঈদের অভিজ্ঞতা বর্তমান সময়ের ঈদ উদযাপনের সাথে কীভাবে তুলনা করবেন?

অধ্যাপক ড. কামাল উদ্দিন: আসলে শৈশবে পরিপূর্ণভাবে ঈদ ছিল আমার। এখন ঈদ আর আমার নেই, সন্তানদের, ভাই-বোনের ছেলে-মেয়েদের, ভাতিজাদের ইত্যাদি। আমি ঈদে যে সালামি পেতাম তা দিনে ১০ থেকে ১৫ বার করে গুনে রাখতাম, এগুলো আবার লুকিয়ে রাখতাম। নতুন টাকা যাতে কোনো ভাজ না পড়ে যায় তাই অনেক যত্নে মাটির ব্যাংকে রাখতাম। আর এখন হলো সালামি দেওয়ার, সবাইকে খুশি করার সময়। সবার জন্য কাপড় কেনা, দায়িত্ব পালন করা এটাই মূলত পার্থক্য। আগে নিজে কত বেশি আনন্দ পেতাম আর এখন অন্যকে কত বেশি আনন্দ দেওয়া যায় এটাই মূল বিষয়। এখনতো দায়িত্বের কারণে অনেকসময় পরিবারের সাথে ঈদও করতে পারিনা।

দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাস: এবার পরিবারের সাথে গ্রামে ঈদ করার পরিকল্পনা আছে?

অধ্যাপক ড. কামাল উদ্দিন: এবার পরিবারের সাথে গ্রামে ঈদ করা হচ্ছে না। তবে, আমি আব্বার সাথে দেখা করে এসেছি। ঈদে আমি গ্রামে যাবোই। তবে সেটা ঈদের দিন সম্ভব হবে না, হয়তো কয়েকদিন পরে যেতে পারবো।


সর্বশেষ সংবাদ