এক বছরে তিন চাকরি, দিনে মাত্র ২-৩ ঘণ্টা পড়ার সুযোগ পেয়েই জজ তানিয়া
দীর্ঘ প্রস্তুতি, একাধিক চাকরি, শিক্ষকতার ব্যস্ততা এবং একবারের ব্যর্থতা—কোনোটিই বিচারক হওয়ার স্বপ্ন থেকে তানিয়া মুস্তারীকে সরিয়ে দিতে পারেনি। ১৬তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) পরীক্ষায় স্বপ্নভঙ্গ হলেও হাল ছাড়েননি তিনি। অবশেষে ১৮তম বিজেএস পরীক্ষায় সহকারী জজ হিসেবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়ে পূরণ করেছেন দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন। তার এই পথচলা, প্রস্তুতি, সংগ্রাম ও ভবিষ্যৎ ভাবনা নিয়ে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি।
রাজশাহী জেলার রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মতিহার থানার অন্তর্গত ডাঁশমারী গ্রামে তার জন্ম। ছোটবেলায় কিছুটা অন্তর্মুখী ছিলেন। মায়ের আঁচল ধরে চলা শিশুর মতোই ছিলেন তিনি। নেতিবাচক কিছু সহজে গ্রহণ করতে পারতেন না। অল্পতেই কষ্ট পেয়ে কেঁদে ফেলার কারণে স্কুলজীবনে তার সম্পর্কে অনেকের মধ্যে বিরূপ ধারণাও তৈরি হয়েছিল। তবে পড়াশোনায় বরাবরই ভালো ছিলেন। স্কুলজীবনে নিয়মিত প্রথম হওয়ার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও সক্রিয় ছিলেন।
১৮তম বিজেএসে সফল হওয়ার অনুভূতি জানতে চাইলে তিনি বলেন, অনুভূতিটা অসাধারণ। প্রথমবার পরীক্ষা দেওয়ার সময় যে ধরনের উত্তেজনা ছিল, এবার তা না থাকলেও তার সাফল্যে পরিবার, আত্মীয়স্বজন, বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের আনন্দিত হতে দেখে তিনি অত্যন্ত খুশি হয়েছেন।
আরও পড়ুন: মেরিন ইঞ্জিনিয়ারের স্বপ্ন থেকে বিচারক, লীনা বললেন—‘জীবন কতটা আনপ্রেডিক্টেবল’
বিচারক হওয়ার স্বপ্নের শুরুটা হয়েছিল পরিবারের একটি স্বপ্নের সঙ্গে। তার মেজবোন ২০১৩-১৪ সালের দিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিষয়ে পড়তে চেয়েছিলেন। অল্প কিছু নম্বরের ব্যবধানে সে সুযোগ না পাওয়ায় তিনি বলেছিলেন, মেজবোনের আইনে পড়ার স্বপ্ন তিনি পূরণ করবেন। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিষয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পাওয়ার মাধ্যমে সেই স্বপ্ন পূরণের পথে এগিয়ে যান। তবে তখনো আইন নিয়ে পড়াশোনা শেষে কী করবেন, তা নিশ্চিত ছিলেন না।
তৃতীয় বর্ষে পড়ার সময় এক ভাগ্নি নিখোঁজ হলে তাকে খুঁজতে কয়েকদিন বিভিন্ন থানা ও আদালতে যেতে হয়। ওই সময় বিচারব্যবস্থার খুব কাছ থেকে বিচারপ্রার্থীদের সহায়তা করার সুযোগ দেখেন তিনি। রাজশাহী চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের সামনে দাঁড়িয়ে বিচারকের আসনটি তাঁর মনে গভীরভাবে গেঁথে যায়। সেখান থেকেই বিচারক হওয়ার স্বপ্ন দৃঢ় হয়।
তানিয়া বলেন, এই সাফল্যের জন্য সবার আগে মহান আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। ১৬তম বিজেএসে স্বপ্নভঙ্গের পরও আমি ভেঙে পড়িনি। বরং আরও শক্তভাবে এগিয়ে যাওয়ার সাহস পেয়েছি। এরপর জীবনে আরও তিনটি চাকরি করার সুযোগ পেয়েছি, যেগুলোর অভিজ্ঞতা আমাকে বিচারক হওয়ার জন্য প্রস্তুত হতে অনেকটা সহায়তা করেছে।
তিনি আরও বলেন, বাবা-মা ও পরিবারের অবদানও অনেক। ২০২৬ সালে প্রথমবার অনার্সে ওঠার পর ১৮তম বিজেএসের লিখিত পরীক্ষাসহ কোনো পরীক্ষাই মায়ের ছায়া থেকে দূরে গিয়ে দিতে হয়নি। বাবা ও ভাইবোনদের সার্বক্ষণিক সমর্থন ও বিশ্বাস তাঁকে এগিয়ে যেতে সহায়তা করেছে।
স্বামীর অবদানকেও বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন তিনি। তানিয়া বলেন, স্বামী তার জীবনের ‘গুড-লাক’। বিয়ের পর থেকেই একে একে সাফল্যের দিকে জীবনের মোড় ঘুরেছে। এক বছরের মধ্যেই আইন শিক্ষক থেকে অ্যাডভোকেট, আইন কর্মকর্তা এবং শেষ পর্যন্ত বিচারক হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন তিনি।
এ ছাড়া শিক্ষক, বন্ধুবান্ধব ও শিক্ষার্থীরাও সবসময় তার জন্য মঙ্গল কামনা করেছেন। বিশেষভাবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক নজরুল ইসলাম মন্ডল স্যারের কথা উল্লেখ করেন তিনি। অনার্স থেকে এখন পর্যন্ত শিক্ষক তাঁকে সবসময় আশাবাদী করেছেন। তার মুখে একটি কথাই বারবার শুনেছেন—‘তোমাকে ন্যায়বিচারক হতে হবে, মা।’
নিজের সাফল্যের পেছনে আত্মবিশ্বাস, পরিশ্রম ও লেগে থাকার মানসিকতাকেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি।
বিজেএসের প্রস্তুতির অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, মাস্টার্স চলাকালে ১৬তম বিজেএস পরীক্ষার সময় ঘুম ও খাওয়া বাদ দিয়ে প্রায় পুরো সময়ই পড়াশোনা করেছেন। তবে ২০২৪ সাল থেকে তার জীবন অনেকটাই পরিবর্তিত হয়। শিক্ষকতা পেশায় থাকায় বিজেএসের সিলেবাসের বাইরের বিভিন্ন বিষয় পড়তে ও পড়াতে হয়েছে। ফলে নিজের পড়াশোনার জন্য সময় কমে যায়। এরপরও প্রায় প্রতিদিন কিছু না কিছু পড়ার চেষ্টা করেছেন এবং ছুটির দিনগুলোতে বেশি সময় পড়াশোনার জন্য রেখেছেন।
তানিয়া বলেন, অনেক সময় এমনও হয়েছে, শনিবার সারাদিন টেবিলে বসে পড়াশোনা করতে গিয়ে রান্না করে খাওয়ারও সময় পাইনি। ১৮তম বিজেএসের লিখিত পরীক্ষার সময়টাকে নিজের জন্য সবচেয়ে কঠিন সময় ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের কোর্স শেষ করানো, চাকরি পরিবর্তনের জন্য চাকরি ছাড়ার আবেদন এবং ছাড়পত্র সংগ্রহের দৌড়াদৌড়ির মধ্যে একসময় আমার মনে হয়েছিল, এবার হয়ত লিখিত পরীক্ষাই দিতে পারব না।
দীর্ঘ চাপের কারণে অনেক রাতে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে বন্ধুদের ফোন করতেন। বন্ধুরা তাকে আশ্বস্ত করতেন, সব ঠিক হয়ে যাবে। এ কারণে ১৮তম বিজেএসের লিখিত পরীক্ষার প্রস্তুতিতে গড়ে প্রতিদিন মাত্র দুই থেকে তিন ঘণ্টা পড়তে পেরেছেন বলে জানান তিনি। বিজেএসের ভাইভা দিয়েছেন দুইবার। ১৬তম বিজেএসে প্রথমবার ভাইভায় অংশ নেন। এরপর ১৮তম বিজেএসে দ্বিতীয়বার ভাইভা দিয়ে সফল হন।
তিনি বলেন, ভাইভার প্রস্তুতির জন্য খুব বেশি সময় পাইনি। এর মধ্যে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র গুছিয়ে নিতেই অনেকটা সময় চলে যায়। এরপরও পাঠ্যসূচির সব বিষয় একবার করে দেখে নেওয়ার চেষ্টা করি এবং মক ভাইভার মাধ্যমে নিজেকে প্রস্তুত করেছিলাম। শুধু পাঠ্য বিষয়ের প্রস্তুতিই নয়, নিজের সম্পর্কেও ভালোভাবে জানা জরুরি। নিজের বিশ্ববিদ্যালয়, নিজ এলাকা, নিজের গুণাবলি, শখসহ বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা রাখা প্রয়োজন। পাশাপাশি মনোবল ধরে রাখা এবং নিজের কর্মজীবনের অভিজ্ঞতাও তাঁকে ভাইভায় এগিয়ে দিয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
আরও পড়ুন: মায়ের অসমাপ্ত স্বপ্ন, নীলার ছয় বছরের লড়াই আর একটি থিসিস ডিফেন্সের গল্প
বিজেএস পরীক্ষাকে আইন শিক্ষার্থীদের জন্য বিসিএস কিংবা তার চেয়েও বেশি কিছু হিসেবে দেখেন তিনি। তানিয়া বলেন, বিচারক হওয়ার মাধ্যমে অল্প কিছু মানুষ তাদের পড়াশোনার বিষয়কে বাস্তবে প্রয়োগ করার সুযোগ ও সম্মান পান।
তবে বিচারক হওয়ার পথকে তিনি দীর্ঘ যাত্রা হিসেবে দেখেন। তিনি বলেন, বিচারক হওয়ার প্রস্তুতি নেওয়ার আগে একজন প্রার্থীকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে প্রস্তুতি থেকে শুরু করে অবসর পর্যন্ত এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার জন্য তিনি মানসিকভাবে প্রস্তুত কি না। এরপরই প্রস্তুতি শুরু করা ভালো।
ইতিবাচকতা ও আত্মবিশ্বাস দ্রুত সফলতার পথে এগিয়ে নেয়। অন্যদিকে দ্বিধা থাকলে মনোবল ভেঙে পড়ে এবং তখন কাঙ্ক্ষিত কিছু অর্জন করা কঠিন হয়ে যায়। বিচারক হিসেবে দেশের জন্য কী করতে চান এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিচারক জীবনের প্রথম দিন থেকে শেষ দিন পর্যন্ত নিজের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে চান, যাতে প্রতিটি দিন অর্থবহ হয়। কোয়ান্টামের একটি প্রচলিত কথায় আমি বিশ্বাস করি—‘নিজের কাজ সৎভাবে করাই দেশপ্রেম।’