বিশ্ববিদ্যালয়ে অপরাধের জাল ও সন্ত্রাসের ফাঁদ: নবীন শিক্ষার্থীরা কীভাবে নিরাপদ থাকবেন
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পাওয়া বাংলাদেশের লাখো তরুণ-তরুণীর জীবনের অন্যতম বড় অর্জন। বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রম, অসংখ্য পরীক্ষার প্রতযোগিতা আর পরিবার-স্বজনের প্রত্যাশা পেরিয়ে তারা পৌঁছান উচ্চশিক্ষার সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে। নতুন ক্যাম্পাসে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় নতুন জীবন, নতুন বন্ধু, নতুন স্বাধীনতা, নতুন স্বপ্ন।
এই নতুন জীবনের আরেকটি দিকও আছে, যা ভর্তি নির্দেশিকা কিংবা ওরিয়েন্টেশন ক্লাসে খুব বেশি আলোচিত হয় না। সেটি হলো ক্যাম্পাসের অপরাধচক্র, সহিংস রাজনীতি, মাদক, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, অনলাইন জুয়া, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং নানা ধরনের প্রভাববলয়ের অদৃশ্য জাল। প্রতি বছরই কিছু শিক্ষার্থী এই জালে জড়িয়ে পড়েন। কেউ নিজের অজান্তে, কেউ সহজে অর্থ উপার্জনের লোভে, কেউ নিজেকে নিরাপদ রাখার ভুল কৌশলে, আবার কেউ ক্ষমতার মোহে।
একসময় সেই শিক্ষার্থীরে কেউ হয়ে ওঠেন হামলার বা সংঘর্ষের সামনের সারির কর্মী, কেউ চাঁদাবাজ, কেউ বা ছিনতাইকারী। যে তরুণকে একসময় পরিবার বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠিয়েছিল মানুষ হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে, কয়েক বছর পর তাকেই খুঁজতে হয় থানার জিডি, সংবাদ শিরোনাম কিংবা আদালতের মামলার তালিকায়।
প্রশ্ন হলো, একজন শিক্ষার্থীর এই পরিবর্তন কীভাবে ঘটে? কেন স্কুল-কলেজের মেধাবী, ভদ্র ও স্বপ্নবাজ একজন তরুণ বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে পথ হারান? আর নতুন শিক্ষার্থীরা কী করলে এই ফাঁদগুলো এড়িয়ে নিরাপদ থাকতে পারবেন?
আরও পড়ুন: ভুল সিদ্ধান্তে থমকে যেতে পারে ক্যারিয়ার, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আগে যেসব সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ
এ প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতেই বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শিক্ষক, মনোবিজ্ঞানী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরে সঙ্গে কথা বলেছেন এই লেখক। পাশাপাশি সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনার বিশ্লেষণ করে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক এক বাস্তবতা। অপরাধের পথে যাত্রা সাধারণত বড় কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে শুরু হয় না; শুরু হয় ছোট একটি আপস, ভুল বন্ধুত্ব কিংবা 'একটু কাজ' করার, ‘একটু দেখিয়ে দেওয়ার’ প্রলোভন থেকে।
একটুর সঙ্গে আসা ঝুঁকি
স্কুল ও কলেজজীবনে একজন শিক্ষার্থী সাধারণত পরিবার ও শিক্ষকরে নিবিড় তত্ত্ব¡তত্ত্বাবধানে থাকেন। কোথায় যাচ্ছেন, কার সঙ্গে মিশছেন, কখন বাসায় ফিরছেন- এসব বিষয়ে কমবেশি নজরে থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর সেই কাঠামো বেশিরভাগ ক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবেই বদলে যায়। অনেকেই প্রথমবারের মতো পরিবার ছেড়ে হলে বা মেসে ওঠেন। নিজের সিদ্ধান্ত নিজেকেই নিতে হয়। নতুন বন্ধু, নতুন পরিবেশ, নতুন সামাজিক পরিচয়ের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চাপও তৈরি হয়। এই সময়টিই একজন শিক্ষার্থীর জীবনের সবচেয়ে সংবেদনশীল অধ্যায় বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
কারণ, এই পর্যায়ে একজন তরুণ নিজের পরিচয় খুঁজতে থাকেন। তিনি কোন দলের সঙ্গে থাকবেন, কাদের বন্ধু হবেন, কী ধরনের জীবনযাপন করবেন- এসব সিদ্ধান্তই ধীরে ধীরে তার ভবিষ্যৎ গড়ে দেয়। এই সময় ভুল মানুষদের সংস্পর্শে চলে গেলে ক্ষতির শুরুটা অনেক সময় বোঝাই যায় না। প্রথমে হয়ত একজন সিনিয়র সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। হলে একটি সিটের ব্যবস্থা করে দেন, টিউশন খুঁজে দেওয়ার আশ্বাস দেন কিংবা ক্যাম্পাসে পরিচিতি বাড়ানোর কথা বলেন।
সম্পর্ক যত গভীর হয়, ততই বাড়তে থাকে নির্ভরশীলতা। একসময় সেই নির্ভরশীলতাই পরিণত হয় নিয়ন্ত্রণে। এমনকি নিজের নাম চেনাতে কিংবা ‘বড় ভাইয়ের’ আস্থাভাজন হতে আপাতত তেমন ক্ষতিকর নয় বা নগণ্য নেতিবাচক কাজ মনে করে জড়িয়ে অপরাধের জাল এরপর বড় হতে থাকে। এরপর আসে ছোট ছোট অনুরোধ বা নরম নির্শে। যেমন: একটু সঙ্গে চল, একটু দাঁড়িয়ে থাকলেই হবে, একটা মিছিল আছে- চল, একটা বিষয় ম্যানেজ করতে হবে। এই 'একটু' নিয়েই অপরাধচক্রে প্রবেশের দরজা খুলে যায়।
বদলে যায় যেভাবে
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অভির (ছদ্মনাম) গল্পটি এ বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর পারিবারিক আর্থিক সংকট কাটাতে একজন সিনিয়রের মাধ্যমে একটি পত্রিকায় কাজের চেষ্টা করেছিলেন তিনি। উদ্দেশ্য ছিল পড়াশোনার পাশাপাশি কিছু আয় করা। কিন্তু সেটি আর হয়নি। পরিচিতরে ধারণা ছিল, অন্য শিক্ষার্থীদের মতো তিনিও হয়ত টিউশন করেই বিশ্ববিদ্যালয়জীবন শেষ করবেন। কিন্তু এক বছরের ব্যবধানে অভিকে আর চেনার উপায় ছিল না। দামি মোটরসাইকেল, ব্যয়বহুল ক্যামেরা, ব্র্যান্ডের পোশাক, চোখে পড়ার মতো জীবনযাপন। সব মিলিয়ে তার জীবনযাত্রায় আসে অস্বাভাবিক পরিবর্তন। অথচ পরিচিতদের কেউই জানতেন না, এত অল্প সময়ে এই বিপুল অর্থের উৎস কোথায়।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক শিক্ষার্থী তানভীর (ছদ্মনাম)। বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার পর নিয়মিত ক্লাসে অংশগ্রহণ করতেন। চলতেন চুপচাপ। হঠাৎ একদিন ক্যাম্পাসে এক ছাত্র সংগঠনের মারামারিতে তাকে আগ্নেয়াস্ত্র (পিস্তল) হাতে দেখা যায়। সেই দৃশ্য দেখে তার উচ্চমাধ্যমিকের সহপাঠী বান্ধবী অবাক হয়ে বলেন, তানভীর কলেজের সবচেয়ে ভদ্র ছেলে হিসেবে পরিচিত ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে অনেকেরই হঠাৎ নিজেকে ‘জাহির করার’ প্রবণতা তৈরি হয়। এরপর এলাকাসূত্রে পরিচিত হলের এক বড় ভাইয়ের মাধ্যমে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। শুরুতে বিষয়টি তেমন সমস্যা তৈরি না করলেও ধীরে ধীরে ক্লাস মিস করার প্রবণতা বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে ক্যাম্পাস ও এর আশপাশের বিভিন্ন দোকানসহ ক্যাম্পাসের বাইরেও প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা শুরু হয়। প্রশ্নফাঁস চক্রের সঙ্গেও তার নাম জড়িয়ে যায়। এমনকি নিজের এক সহপাঠীর গায়ে হাত তোলে এবং অপর সহপাঠীকে জিম্মি করে টাকা আদায় করে। ওর দিকে আর তাকানো যেত না।
নতুন পরিবেশ, পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ কমে যাওয়া, আর্থিক চাপ, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর দূরুত্ব এবং দ্রুত সফল হওয়ার মানসিকতা সব মিলিয়ে কিছু শিক্ষার্থী ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করেন—ড. মো. কামাল উদ্দিন, অধ্যাপক মনোবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
ঢাকা কলেজের অনার্সের আরেক শিক্ষার্থী সৌম্য (ছদ্মনাম)। শিক্ষকের ছেলে সৌম্য কলেজের এক বড় ভাইয়ের সঙ্গে চলতে শুরু করেন প্রথম বর্ষের শেষ দিক থেকে। সেই বড় ভাই ক্ষমতাসীন এক নেতার ও এক ব্যাবসায়িক গ্রুপের হয়ে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তারের জন্য ‘মাঠের প্রভাবক’ হিসেবে কাজ করতেন। দ্বিতীয় বর্ষের শেষ দিকে টেন্ডারকেন্দ্রিক মারামারিতে সৌম্যের নামও জড়িয়ে পড়ে। ভর্তি হওয়ার সাত বছর পেরিয়ে গেলেও সৌম্যর অনার্স আর শেষ হয়নি।
অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক ক্ষেত্রেই এমন আকস্মিক পরিবর্তনের পেছনে কাকে ক্ষমতার বলয়, অবৈধ আয়ের উৎস কিংবা সংঘবদ্ধ চক্রের সঙ্গে সম্পৃক্ততা। আর সেখান থেকেই শুরু হয় একজন শিক্ষার্থীর নৈতিক বিচ্যুতি। বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘটিত অধিকাংশ বড় অপরাধের পেছনে শুরুতে বড় কোনো উদ্দেশ্য কাকে না। থাকে সহজে অর্থ উপার্জনের আকাঙ্ক্ষা, প্রভাবশালী হওয়ার ইচ্ছা কিংবা বন্ধুদের কাছে নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ করার মানসিকতা।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বাস্তবতায় ছাত্ররাজনীতিকে ঘিরে অনেক জায়গায় গড়ে উঠেছে নানা ধরনের আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক ক্ষমতার কাঠামো। এই কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত কিছু ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নতুন শিক্ষার্থীরে নিজেদের বলয়ে টানার চেষ্টা করে। কেউ প্রতিশ্রুতি দেন নিরাপত্তার, কেউ দেন আবাসনের, কেউ দেন আর্থিক সহায়তার, কেউ ক্ষমতা চর্চা। বিনিময়ে ধীরে ধীরে তাদের কাছ থেকে প্রত্যাশা করা হয় আনুগত্য। সে আনুগত্যের পথ ধরে অপরাধে জড়ান অনেকে।
আরও পড়ুন: মায়ের অসমাপ্ত স্বপ্ন, নীলার ছয় বছরের লড়াই আর একটি থিসিস ডিফেন্সের গল্প
এখানেই সবচেয়ে বড় বিষয়। কারণ অপরাধের পথে হাঁটা বেশিরভাগ শিক্ষার্থী শুরুতেই নিজেকে অপরাধী মনে করেন না। বরং তারা বিশ্বাস করেন, তারা কেবল ‘ভাইরে কথা’ রাখছেন বা ‘সংগঠনের কাজ’ করছেন। কিন্তু ধাপে ধাপে সেই সীমারেখা মুছে যায়। ছোট ভুল বা অপরাধ থেকে বড় অপরাধের দিকে ধাবিত হতে থাকেন। একসময় যে কাজকে স্বাভাবিক মনে হয়েছিল, সেটিই পরিণত হয় আইনের চোখে অপরাধে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে অপরাধের জাল
সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় সাবেক কয়েকজন শিক্ষার্থীকে মারধর ও ছিনতাইয়ের অভিযোগে যারে নাম সামনে আসে, তাদের বেশিরভাগই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। অভিযোগ অনুযায়ী, একই ভুক্তভোগীরা কয়েক মাসের ব্যবধানে একাধিকবার একই ধরনের ঘটনার শিকার হয়েছেন এবং অভিযুক্তদের কয়েকজনের নাম দুই ঘটনাতেই মিলেছে। এই ঘটনাটি শুধু একটি অপরাধের বর্ণনা নয়; এটি আরও বড় একটি প্রশ্ন সামনে আনে।
যে তরুণরা মাত্র এক বা দুই বছর আগে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছেন, তারা কীভাবে এত দ্রুত সহিংসতা ও ছিনতাইয়ের মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়লেন? চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়েও সম্প্রতি এক সাবেক শিক্ষার্থী স্ত্রীকে নিয়ে ক্যাম্পাসে ঘুরতে এসে ছিনতাইয়ের শিকার হন।
শিক্ষাবিদরা বলছেন, এটি কোনো ব্যক্তির বিচ্ছিন্ন ব্যর্থতা নয়। বরং দীর্ঘ দিন ধরে গড়ে ওঠা কিছু অসুস্থ ক্যাম্পাস সংস্কৃতির ফল। এ ধরনের ঘটনা শুধু আর্থিক ক্ষতি নয়; বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি ও নিরাপত্তা নিয়েও বড় প্রশ্ন তোলে। কারণ একটি বিশ্ববিদ্যালয় শুধু শিক্ষার স্থান নয়, এটি হাজারো শিক্ষার্থীর মানসিক বিকাশ ও সামাজিক আস্থার জায়গা। সেখানে অপরাধের সংস্কৃতি স্বাভাবিক হয়ে উঠলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো প্রজন্ম।
কেন জড়িয়ে পড়েন মেধাবী শিক্ষার্থীরাও
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী নাজমুল হাসান মনে করেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে একজন শিক্ষার্থী প্রথমবারের মতো দীর্ঘ সময় পরিবারের সরাসরি তত্ত্ববধানের বাইরে থাকেন। এই স্বাধীনতার সঙ্গে সঠিক দিকনির্দেশনা না থাকে, তাহলে ভুল বন্ধুত্ব, প্রভাবশালী গোষ্ঠী কিংবা অর্রে লোভ সহজেই তাকে প্রভাবিত করতে পারে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী আনজুম শাহরিয়ারও একই ধরনের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, ক্যাম্পাসের সামগ্রিক পরিবেশ, মাদক এবং কিছু রাজনৈতিক গোষ্ঠীর প্রভাব অনেক সময় শিক্ষার্থীরে ঝুঁকিপূর্ণ কর্মকান্ডের দিকে নিয়ে যায়। যদিও সব বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিস্থিতি এক নয়, তবুও যেখানে প্রভাববলয় শক্তিশালী, সেখানে ঝুঁকিও বেশি।
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, কোনো শিক্ষার্থী একদিনে অপরাধী হয়ে ওঠেন না। প্রথমে বদলায় তার চিন্তার ধরন। এরপর বদলায় বন্ধুরে পরিধি। তারপর বদলায় জীবনযাপনের মান। সবশেষে বলে যায় নৈতিকতার সীমারেখা। কেউ কেউ পড়েন ফাঁদে তাই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে এবং সরকারি সংস্থাগুলোকে এ বিষয়ে সক্রিয়, সচেতন ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. কামাল উদ্দিনের বলেন, নতুন পরিবেশ, পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ কমে যাওয়া, আর্থিক চাপ, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর দূরুত্ব এবং দ্রুত সফল হওয়ার মানসিকতা সব মিলিয়ে কিছু শিক্ষার্থী ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করেন। অনেক সময় তারা মনে করেন, অন্যরা যখন ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন তাদেরও দ্রুত কিছু অর্জন করতে হবে। এই মানসিকতাই শর্টকাট পথের প্রতি আকর্ষণ তৈরি করে। তিনি মনে করেন, সমস্যার সমাধান শুধু আইন প্রয়োগে নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী-শিক্ষক সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করা, বৈধ উপায়ে আর্থিক সহায়তা বাড়ানো, কাউন্সেলিং ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং মূল্যবোধভিত্তিক ক্যাম্পাস সংস্কৃতি গড়ে তোলাও সমান গুররুত্বপূর্ণ।
শিক্ষার্থীরা যেভাবে নিজেকে নিরাপদ রাখবেন
অপরাধের ফাঁদে না পড়ার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো শুরুতেই ঝুঁকির লক্ষণগুলো চিনতে শেখা। সে অনুযায়ী পরামর্শগুলোর মধ্যে রয়েছে:
১. প্রথম ছয় মাস শুধু পর্যবেক্ষণ করুন
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর সবচেয়ে বড় ভুলগুলোর একটি হলো খুব দ্রুত কোনো গ্রুপ বা বলয়ের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে ফেলা। কে প্রভাবশালী, কে জনপ্রিয়, কে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় এসব দেখে সিদ্ধান্ত নেবেন না। প্রথম কয়েক মাস ক্যাম্পাসকে জানুন, মানুষকে বুঝুন, তারপর সম্পর্ক গড়ে তুলুন। যে মানুষ প্রথম দিন থেকেই আপনার কাছ থেকে আনুগত্য চায়, তাকে নিয়ে সতর্ক থাকুন। নিজের ব্যক্তিত্ব বজায় রেখে চলুন।
২. ‘সহজ আয়’ বলে কিছু নেই
বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে অর্থসংকট অস্বাভাবিক নয়। হাজারো শিক্ষার্থী টিউশনি করেন, খণ্ডকালীন চাকরি করেন, ফ্রিল্যান্সিং করেন, রিমোট জব করেন। যারা ঝুঁকি নিতে পারেন তারা স্বল্প পুঁজি দিয়ে ক্ষুদ্র ব্যবসাও শুরু করেন। এগুলোই স্বাভাবিক পথ। কিন্তু কেউ বলতে পারে একটু কাজ করলেই কয়েক হাজার টাকা পাবেন, শুধু সঙ্গে থাকলেই হবে, কিছুই করতে হবে না, শুধু উপস্থিত থাকবেন, অনলাইন জুয়ায় অংশ নিলেই হবে। তাহলে বুঝতে হবে, সেটি ঝুঁকিপূর্ণ প্রস্তাব। মনে রাখবেন, যে আয় ব্যাখ্যা করা যায় না ও স্বীকৃতিও না, সেই আয় একদিন বিপদ ডেকে আনে।
৩. নিজের পরিচয় নিজেই তৈরি করুন
অনেক শিক্ষার্থী মনে করেন, কোনো প্রভাবশালী সিনিয়রের সঙ্গে থাকাকালে ক্যাম্পাসে সুবিধা পাওয়া যাবে। স্বল্পমেয়াদে হয়ত কিছু সুবিধা মিলতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এতে নিজের স্বাধীন পরিচয় হারিয়ে যায়। পরে সেই সম্পর্ক থেকে বের হওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ে সবচেয়ে বড় শক্তি কোনো গ্রুপ বা ভাই নয়; আপনার নিজের সুনাম।
৪. বন্ধুত্ব করুন চরিত্র দেখে
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ ভালো বন্ধু। যে বন্ধু নিয়মিত ক্লাস করে, পড়াশোনায় মনোযোগী, অন্যকে সম্মান করে, পরিবার নিয়ে কথা বলে, ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিকল্পনা করে তার সঙ্গে থাকুন। আর যে বন্ধু সবসময় সংঘর্ষ, ক্ষমতা কিংবা প্রভাবের গল্প করে বা অনৈতিক সম্পর্ক তৈরির কথা বলে তাকে দূর থেকেই সম্মান জানান। নিজে আত্মবিশ্বাসী হলে তাকে শোধরানোর লক্ষ্যে আরও কয়েকজন বন্ধু মিলে চেষ্টা করতে পারেন। সেক্ষেত্রে অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে যেন যে ভুল থেকে তাকে উদ্ধারে গিয়েছেন সে ভুলে যেন নিজেই ডুবে না যান।
৫. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও দায়িত্বশীল থাকুন
আজকের একটি মন্তব্য, একটি ছবি কিংবা একটি লাইভ ভিডিও অনেক বছর পরও আপনার পরিচয়ের অংশ হয়ে থাকতে পারে। সংঘর্ষ, ঘৃণা, হুমকি বা সহিংসতাকে উৎসাহিত করে এমন কোনো পোস্ট, মন্তব্য বা ভিডিও শেয়ার করবেন না। জেন্ডার সমতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকুন। সব ধর্ম ও মতের প্রতি শ্রদ্ধা রাখুন।
৬. মাদক ও জুয়া থেকে দূরে থাকুন
বিশ্ববিদ্যালয়ে মাদক নিয়ে সবচেয়ে প্রচলিত বাক্যটি হলো একবার চেষ্টা করলে কিছু হবে না। বাস্তবে অনেকের পতনের শুরু এখান থেকেই। মাদক শুধু স্বাস্থ্য নষ্ট করে না; এটি বিচারবোধ, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও দুর্বল করে। আর তখনই অপরাধচক্র একজন মানুষকে সহজে ব্যবহার করতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে সশরীরে বা অনলাইন জুয়ার ফাঁদে পড়ে শিক্ষাজীবন থেকে ঝরে যেতে দেখা গেছে অনেক তরুণ ও তরুণীকে। এটি থেকে শতভাগ দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। জুয়ার ফাঁদে পড়ে নিজেকে ও পরিবারকে বিপদে ফেলবেন না। স্মার্টফোন ও সহজলভ্য ইন্টারনেটকে অ্যাকাডেমিক কাজে ব্যবহারে মনোযোগ দিন।
৭. বিপদে পড়লে নীরব থাকবেন না
কেউ ভয় দেখালে, চাঁদা চাইলে, জোর করে কোনো কর্মসূচিতে নিতে চাইলে বা অপরাধমূলক কাজে যুক্ত করতে চাইলে বিষয়টি একা সামলানোর চেষ্টা করবেন না। বিশ্বস্ত শিক্ষক, হল প্রশাসন, প্রক্টর অফিস, পরিবার কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তা নিন। বিশ্বাসযোগ্য কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা অনলাইন প্ল্যাটফর্মেরও সহযোগিতা নিতে পারেন। প্রথম দিন অভিযোগ করতে সংকোচ লাগলেও, পরে সেই নীরবতার মূল্য অনেক বড় হতে পারে।
৮. শিক্ষককে শুধু পরীক্ষার সময় মনে করবেন না
বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন শিক্ষক শুধু ক্লাস নেওয়ার জন্য নন। একজন ভালো শিক্ষক হতে পারেন আপনার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পরামর্শদাতা। নিজ বিভাগের অন্তত একজন শিক্ষকের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখুন। কোনো সমস্যায় পড়লে আগে তার সঙ্গে কথা বলুন।
৯. পরিবার থেকে দূরে, কিন্তু পরিবারের বাইরে নয়
বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে অনেকেই পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ কমিয়ে নেয়। এটি ভুল। প্রতিদিন না হলেও নিয়মিত বাবা-মা বা অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলুন। ভালো লাগা মন্দ লাগা শেয়ার করুন। আপনার বন্ধু, বাসস্থান, সমস্যা ও পরিকল্পনা সম্পর্কে তাকে জানান। অনেক বিপদই শুরুতেই ঠেকানো যায়, যেন পরিবার সময়মতো বিষয়টি জানতে পারে।
১০. ‘না’ বলতে শিখুন
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতাগুলোর একটি হলো প্রয়োজন হলে ‘না’ বলতে পারা। যে কাজ আপনার নৈতিকতা, নিরাপত্তা বা ভবিষ্যৎকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে, সেটি কোনো সিনিয়র, বন্ধু বা পরিচিত ব্যক্তি বললেও প্রত্যাখ্যান করুন। একটি দৃঢ় উচ্চারণের ‘না’ অনেক সময় একটি জীবন বাঁচিয়ে দিতে পারে।
আরও খবর: ইবিতে অস্ত্র-রামদা হাতে মহড়া, শনাক্ত ১৯ জনই বিএনপি-ছাত্রদল-যুবদলের
১১. ব্যক্তিত্ব গঠন ও ফলাফল উন্নয়নে মনোযোগ দিন
ক্যাম্পাস জীবনের শুরু থেকেই ব্যক্তিত্ব গঠনে এবং পরীক্ষার ফলাফলে ভালো করতে মনোযোগী হোন। যেখানে নম্র থাকা দরকার, সেখানে নম্র হোন; যেখানে কঠোরতা দরকার, সেখানে কঠোর হোন। ভালো বন্ধুদের সার্কেল গড়ে তুলে একসঙ্গে পড়ুন, আড্ডা দিন, ঘুরুন, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করুন। প্রথম বর্ষে খারাপ ফলাফল হলে সেটি থেকে উত্তরণ ঘটাতে বাড়তি চেষ্টা লাগে। এমনকি অনেক সময় সেটি সহজও নয়। তবে প্রথম সেমিস্টার ও প্রথম বর্ষে ভালো ফলাফল করলে বাকি বছরগুলোতে জিপিএ ভালো করার জন্য আলাদা তাড়না তৈরি হবে এবং তা আপনাকে এগিয়ে দেবে।
যে লক্ষণগুলো দেখলে সতর্ক হবেন
কিছু আচরণ কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর মধ্যে নিয়মিত খেলে দূরে থাকাই ভালো। সেগুলো হলো- অস্বাভাবিক অর্থের উৎস, নিয়মিত অস্ত্র বা সহিংসতার আলোচনা, মাদকসেবন বা মাদক বিক্রির সঙ্গে সম্পৃক্ততা, অন্যদের ভয় দেখিয়ে কাজ আদায় করা, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয় ব্যবহার করে ব্যক্তিগত সুবিধা নেওয়া, প্রশাসন বা আইনকে তুচ্ছ করে কথা বলা, সব সময় নতুন শিক্ষার্থীদের নিজেদের দলে টানার চেষ্টা করা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের চার-পাঁচ বছর একজন মানুষের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই সময়েই তৈরি হয় পেশাগত পরিচয়, সামাজিক নেটওয়ার্ক, মূল্যবোধ এবং নেতৃত্বের ভিত্তি। তাই এই সময়ে ভুল সিদ্ধান্তের মূল্যও সবচেয়ে বেশি। একটি মারামারির ভিডিও, একটি ফৌজদারি মামলা, একটি ছিনতাইয়ের অভিযোগ কিংবা একটি মাদক-সংক্রান্ত গ্রেপ্তার বা অসদুপায় অবলম্বনের কারণে এক সেমিস্টার ড্রপআউট সবই ভবিষ্যতের চাকরি, উচ্চশিক্ষা, এমনকি ব্যক্তিগত জীবনেও দীর্ঘ কালো ছায়া ফেলে।
অন্যদিকে একই সময়ে যদি একজন শিক্ষার্থী ভালো বন্ধু বেছে নেন, ক্ষমতা অর্জন করেন, শিক্ষক-গবেষকদের সঙ্গে কাজ করেন, স্বেচ্ছাসেবায় যুক্ত হন এবং নিজের চরিত্রকে শক্ত ভিত্তির ওপর গড়ে তোলেন, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়েই গড়ে উঠে তার জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি।
বিশ্ববিদ্যালয় কোনো যুদ্ধক্ষেত্র নয়; এটি জ্ঞান, যুক্তি ও মানবিকতা গড়ে তোলার জায়গা। এ জন্য উপযুক্ত ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রশাসনের দায়িত্ব। তবে নিজ থেকে সচেতন, সতর্ক ও দায়িত্বশীল হয়ে চলতে হবে শিক্ষার্থীদেরও। তরুণদের হাতে দেশের ভবিষ্যৎ। সেই হাত যদি কলম-বইয়ের বদলে অস্ত্র ধরে, যুক্তির বদলে সহিংসতায় বিশ্বাস করে কিংবা পরিশ্রমের বদলে শর্টকাটকে বেছে নেয়, তাহলে ক্ষতি শুধু একজন শিক্ষার্থীর নয়; ক্ষতি হয় পরিবারের ও সমাজের। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরীক্ষায়ও উত্তীর্ণ হওয়া প্রয়োজন।