১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২০:০৭

রাজধানীতে আব্বাস-খোকার ‘রাজনৈতিক উত্তরসূরী’র অভাব বিএনপিতে

সাদেক হোসেন খোকা ও মির্জা আব্বাস  © টিডিসি সম্পাদিত

একসময় ঢাকার রাজনীতি মানেই ছিল রাজপথে দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের শক্তির মহড়া। রাজধানী নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখা নিয়ে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে ছিল তীব্র প্রতিযোগিতা। সেই প্রতিযোগিতায় বিএনপির অন্যতম প্রধান মুখ ছিলেন মির্জা আব্বাস ও সাদেক হোসেন খোকা। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের হয়ে ঢাকার রাজনীতিতে দীর্ঘদিন সক্রিয় ছিলেন মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, কামাল মজুমদারসহ কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা। পরবর্তী সময়ে আসাদুজ্জামান খান কামালও ঢাকার রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব তৈরি করেন।

কিন্তু ৫ আগস্ট পরবর্তী ঢাকার রাজনীতি কিছুটা শান্ত হলেও বিএনপির শক্তিমত্তা নিয়ে দেখা দিয়েছে প্রশ্ন। গণআন্দোলনের মুখে পতিত ও কার্যক্রমনিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ এবং অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীদের প্রকাশ্য দিনের আলোতে বিক্ষোভ এবং শক্তি প্রদর্শন এই প্রশ্নকে আরও জোরালো করেছে। গুলশানের মতো চরম নিরাপত্তাবেষ্টনী ঘেরা এলাকা,  যেখানে প্রধানমন্ত্রী সপরিবারে বসবাস করেন এবং সংবেদনশীল কূটনৈতিক জোন হিসেবে পরিচিত, সেখানে ওই দলটির নেতাকর্মীদের এ ধরনের মহড়া কিংবা উচ্চ আদালত এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনে ককটেল বিস্ফোরণ—এসব ঘটনায় বিএনপির রাজনৈতিক মাঠদখলের রাজনীতির ব্যর্থতাই ফুটে উঠেছে।

বিএনপি সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সময় বদলেছে। রাজনৈতিক বাস্তবতাও বদলেছে। কিন্তু রাজধানীর রাজনীতিতে বিএনপির পুরোনো সেই সাংগঠনিক ও জনসম্পৃক্ত নেতৃত্বের শূন্যতা এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বিশেষ করে খোকা ও আব্বাসের মতো ঢাকাকেন্দ্রিক রাজনৈতিক শক্তির বিকল্প তৈরি করতে না পারায় দলটির সামনে প্রশ্ন উঠছে—রাজধানীর রাজনীতিতে বিএনপির পরবর্তী প্রজন্মের নেতৃত্ব আসলে কারা?

নেতাকর্মীরা বলছেন, ঢাকার রাজনীতিতে সাদেক হোসেন খোকা ছিলেন ব্যতিক্রমী এক রাজনৈতিক চরিত্র। মুক্তিযোদ্ধা খোকা দীর্ঘ দেড় যুগেরও বেশি সময় ঢাকা মহানগর বিএনপির নেতৃত্বে ছিলেন। ২০০২ সালে অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হয়ে প্রায় এক দশক নগর রাজনীতির অন্যতম প্রধান মুখ ছিলেন। একই সঙ্গে জাতীয় রাজনীতিতেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। ফলে দলীয় সংগঠন, রাজপথের আন্দোলন এবং নগরবাসীর সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ—তিন ক্ষেত্রেই তার একটি আলাদা অবস্থান তৈরি হয়েছিল। ২০১৯ সালে ক্যান্সারে তার মৃত্যু বিএনপির জন্য শুধু একজন প্রবীণ নেতাকে হারানো নয়, ঢাকার রাজনীতিতে একটি পরীক্ষিত নেতৃত্বের অবসানও ঘটে।

অন্যদিকে মির্জা আব্বাসও দীর্ঘদিন ধরে ঢাকার রাজনীতিতে বিএনপির অন্যতম প্রধান শক্তি ও সাধারণ নেতাকর্মীদের আস্থার স্থল। বিএনপিতে চরম কট্টরপন্থী জাতীয়তাবাদী হিসেবে পরিচিতি লাভ করা দলটির স্থায়ী কমিটির এই সদস্য ঢাকার রাজনীতির সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি ঢাকা-৮ আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তবে চলতি বছর মার্চ মাসে পবিত্র রমজানে গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন থাকায় তার সক্রিয় রাজনৈতিক ভূমিকা অনেকটাই সীমিত হয়ে পড়েছে। অসুস্থ হওয়ার পর সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় চিকিৎসা ও পুনর্বাসন নিয়েছেন তিনি; জুনে দলীয় সূত্র তার শারীরিক অবস্থার উন্নতির কথা জানিয়েছিল। দীর্ঘ প্রায় সাড়ে ৫ মাস চিকিৎসা শেষে সম্প্রতি তিনি দেশে ফিরেছেন। সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিয়ে সংসদের বাজেট পরবর্তী অধিবেশনে হুইল চেয়ারে বসে যোগও দিয়েছেন। ফলে তাকে পুরোপুরি রাজনীতির বাইরে বলা ঠিক না হলেও মাঠের রাজনীতিতে আগের মতো সক্রিয় উপস্থিতি এখন আর দেখা যাচ্ছে না।

বেগম খালেদা জিয়ার বিশস্ত সহচর ছিলেন সাদেক হোসেন খোকা

বিএনপিতে আব্বাস-খোকার বিকল্প হিসেবে একসময় দলটির আরেক স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেলসহ কয়েকজন নেতার নাম সামনে আসত। কিন্তু বয়স, সাংগঠনিক অবস্থান ও জাতীয় রাজনীতির নানা সমীকরণে তাদের কেউই এখনো ঢাকার রাজনীতিতে খোকা-আব্বাসের মতো সর্বজনগ্রাহ্যতা তৈরি করতে পারেননি। জাতীয় নির্বাচনের আগে সরব থাকলেও নির্বাচনের পর গয়েশ্বর চন্দ্র রায় আগের তুলনায় অনেকটা নীরব। বিএনপির অন্যতম অঙ্গ সংগঠন জাতীয়তাবাদী যুবদলের এক সময়ের সফল সাধারণ সম্পাদক হিসেবে গয়েশ্বর বিএনপির নেতাকর্মীদের কাছে ব্যাপক গ্রহণযোগ্য। এরপর দলের যুগ্ম মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করে বর্তমানে দলটির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরামের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এক সময়ের সরব গয়েশ্বরের নীরবতা দলীয় রাজনীতিতে অনেক বার্তা দিচ্ছে বলে নেতাকর্মীদের ধারণা।

হাবিব উন নবী খান সোহেলও দীর্ঘদিন ধরে রাজপথের পরিচিত মুখ। বিএনপির অন্যতম ভ্যানগার্ড হিসেবে পরিচিত ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদের সভাপতি ও বিএনপির অঙ্গ সংগঠন স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় সংসদের সভাপতির দায়িত্ব পালন শেষে বর্তমানে দলটির অন্যতম যুগ্ম মহাসচিবের পদে রয়েছেন তিনি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ‘অপ্রত্যাশিত’ভাবে দলীয় প্রার্থী হিসেবে অংশগ্রহণের সুযোগ না পাওয়ায় সাধারণ নেতাকর্মীদের মধ্যেও প্রশ্ন দেখা দেয়। বিএনপি সরকার গঠন করার পরে মন্ত্রিপরিষদে সোহেলের ঠাঁই না পাওয়াও বিস্ময় সৃষ্টি করে। নির্বাচনে দলের টিকেট না পাওয়া এবং সরকারে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে দৃশ্যমান উত্থান না ঘটায় তার রাজনৈতিক সম্ভাবনা নিয়েও প্রশ্ন দিয়েছে।

আরও পড়ুন: বিশ্ববিদ্যালয়ের জাল সার্টিফিকেট নির্বাচনী হলফনামায়, অভিযোগ বিএনপি এমপি নয়নের বিরুদ্ধে

এই বাস্তবতায় খোকাপুত্র ইশরাক হোসেনকে ঘিরে বিএনপির একটি নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। বিশেষ করে তরুণদের একটি অংশের মধ্যে তার আলাদা পরিচিতি তৈরি হয়েছিল। ২০২০ সালের ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে পরাজয়ের পরও তিনি ফলাফল নিয়ে আইনি লড়াই চালিয়ে যান। ২০২৫ সালে নির্বাচনী ট্রাইব্যুনাল ওই নির্বাচনের ফল বাতিল করে তাকে মেয়র ঘোষণা করে এবং নির্বাচন কমিশনও সংশোধিত গেজেট প্রকাশ করে।

কিন্তু এরপরের ঘটনাপ্রবাহ ইশরাকের রাজনৈতিক ভাবমূর্তির জন্য জটিলতা তৈরি করে। শপথ না নিয়েই মেয়রের দায়িত্ব পালনের উদ্যোগ, নগর ভবনে কর্মসূচি, সমর্থকদের দিয়ে টানা অবরোধ, আন্দোলন এবং স্থানীয় সরকার উপদেষ্টার সঙ্গে প্রকাশ্য বাকবিতণ্ডা তাকে রাজনৈতিকভাবে আলোচনার কেন্দ্রে আনলেও সেই আলোচনার বড় অংশ ছিল বিতর্কনির্ভর। এমনকি তার সমর্থকদের কর্মসূচিতে নগর ভবন ও রাজধানীর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কে জনদুর্ভোগেরও সৃষ্টি হয়।

ফলে ইশরাকের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ শুধু খোকা পরিবারের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বহন করা নয়; বরং সেই উত্তরাধিকারকে নিজের স্বতন্ত্র গ্রহণযোগ্যতায় রূপ দেওয়া। একজন সম্ভাবনাময় তরুণ নেতা হিসেবে যে রাজনৈতিক পুঁজি তিনি তৈরি করেছিলেন, সাম্প্রতিক বিতর্কগুলো তার কতটা ক্ষতি করেছে—এ প্রশ্নও এখন দলের ভেতরে-বাইরে আলোচিত।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ঢাকার মতো রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ মহানগরে শুধু সংসদীয় আসনভিত্তিক নেতৃত্ব দিয়ে সংগঠন পরিচালনা করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন এমন নেতা, যিনি একদিকে দলীয় কর্মীদের সংগঠিত করতে পারবেন, অন্যদিকে সাধারণ নগরবাসীর মধ্যেও গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করবেন। খোকা-আব্বাসের সময়ে বিএনপির যে শক্তিশালী মহানগরভিত্তিক রাজনৈতিক কাঠামো ছিল, সময়ের সঙ্গে সেটি অনেকটাই দুর্বল হয়েছে।

আরও পড়ুন: দীর্ঘ চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে ক্ষমতায়, ৪৮-এ বিএনপি

আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আধিপত্যের অবসানের পর বিএনপির সামনে রাজধানীর রাজনীতিতে নতুন করে সংগঠন গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হয়েছে। কিন্তু সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে পুরোনো নেতৃত্বের শূন্যতা পূরণ করে নতুন প্রজন্মের মধ্যে এমন নেতাদের সামনে আনতে হবে, যাদের গ্রহণযোগ্যতা শুধু দলীয় কর্মীদের মধ্যে নয়, সাধারণ ঢাকাবাসীর মধ্যেও থাকবে।

বেগম খালেদা জিয়ার আস্থার একটি নাম মির্জা আব্বাস

কারণ ঢাকার রাজনীতি দখলে রাখা শুধু একটি মহানগরের সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণের বিষয় নয়; জাতীয় রাজনীতিতে জনমত, আন্দোলনের গতি এবং রাজনৈতিক শক্তির দৃশ্যমানতার সঙ্গেও এর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। সেই জায়গায় আব্বাস-খোকার অনুপস্থিতি বিএনপির জন্য এখন শুধু স্মৃতির বিষয় নয়—এটি একটি বাস্তব রাজনৈতিক শূন্যতা।

আরও পড়ুন: নয়াপল্টনের কর্মী থেকে মহাসচিবের চেয়ার— রিজভীর উত্থানের গল্প

রাজধানীর রাজপথ দখলে রাখার মতো বিএনপির শক্তির অভাব নেই মন্তব্য করে বিএনপির অন্যতম ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্যদিয়ে গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছে। বিরোধীদলে থাকাকালীন সেই আন্দোলন-সংগ্রামে রাজধানী ঢাকার রাজপথ নিয়ন্ত্রণে নিতে আব্বাস ভাই (মির্জা আব্বাস), খোকা ভাই (সাদেক হোসেন খোকা), গয়েশ্বর দা (গয়েশ্বর চন্দ্র রায়) সহ অন্য নেতাদের যেমন ভূমিকা ছিল, তেমনি নেতাকর্মীদের মাঝে তাদের নাম উচ্চারিত হত।

চুয়াডাঙ্গা-১ আসন থেকে দুইবারের নির্বাচিত প্রাক্তন সংসদ সদস্য শামসুজ্জামান দুদু আরও বলেন, খোকা ভাই মারা গেছেন, আব্বাস ভাই অসুস্থ। কিন্তু মনে রাখতে হবে, রাজনীতিতে শূণ্যপদ বলতে কিছু নেই। আব্বাস-খোকাদের শূণ্যস্থানে বিকল্প নেতা বিএনপিতে আছে, যা পরিবর্তিত রাজনীতিতে দেখা যাবে।