০৮ মার্চ ২০২৬, ২১:৫১

ছুটির আগেই বাড়ি যাওয়ার ‘ট্রেন্ড’ মেডিকেল শিক্ষার্থীদের, কঠোর হচ্ছে স্বাস্থ্য শিক্ষা প্রশাসন

ছুটির আগেই বাড়ি যাওয়ার ‘ট্রেন্ড’ মেডিকেল শিক্ষার্থীদের, কঠোর হচ্ছে স্বাস্থ্য শিক্ষা প্রশাসন  © প্রতীকী ছবি

সরকারি ছুটি ঘোষণার আগেই ‘অটো ভ্যাকেশন’ নিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ত্যাগ করার প্রবণতা বাড়ছে মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে। এ অবস্থায় কলেজ কর্তৃপক্ষসহ স্বাস্থ্য শিক্ষা প্রশাসন কঠোর হওয়ার চিন্তা-ভাবনা করছে। এ নিয়ে সরকারি মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষদের সঙ্গে বৈঠক করেছে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নির্ধারিত ছুটির বাইরেও ‘অটো ভ্যাকেশন’ নিয়ে চলে যাওয়ার চল মেডিকেল কলেজ শিক্ষার্থীদের মধ্যে দীর্ঘদিনের। নৈমিত্তিক কড়াকড়ি, টানা ক্লাস-পরীক্ষা আর পড়াশোনার চাপ থেকে মুক্তি পেতে নির্ধারিত ছুটির আগে-পরে অতিরিক্ত কয়েকদিন ছুটি কাটান তারা। এ কাজটি হয় সম্মিলিতভাবে, ব্যাচভিত্তিক।

তবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর এ প্রবণতা অধিক হারে বেড়েছে বলে মনে করছেন স্বাস্থ্য শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, শিক্ষার্থীদের এই অটো ভ্যাকেশনের বিষয়টি এখন ট্রেন্ডে পরিণত হয়েছে। এতে মেডিকেলের একাডেমিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি খোদ এসব শিক্ষার্থী পিছিয়ে পড়ছেন অন্যদের থেকে।

গত ২ মার্চ রংপুর মেডিকেল কলেজের (রমেক) দুটি ব্যাচের ৫০০ শিক্ষার্থী ক্যাম্পাস ত্যাগ করে বাড়ি চলে যাওয়ার পর বিষয়টি জোরেশোরে আলোচনায় আসে। ওই ঘটনায় দৈনিক ৫০০ টাকা হারে জরিমানা ঘোষণা করেছে রমেক প্রশাসন। এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফিরতেও বলা হয়েছে ওই নোটিশে। আর জরিমানার অর্থ নির্দেশনা মোতাবেক না দিলে পরীক্ষার ফরম পূরণকালে সমন্বয় করে নেওয়া হবে বলেও নোটিশে উল্লেখ করা হয়।

আরও পড়ুন: ঈদের ছুটি নির্ধারণের আগেই লাপাত্তা শিক্ষার্থীরা, দিনপ্রতি ৫০০ টাকা জরিমানা

এদিকে আরও কয়েকটি মেডিকেল কলেজে এ ধরনের নোটিশ জারি করা হয়েছে। গতকাল শনিবার (৭ মার্চ) এ সংক্রান্ত নোটিশ দিয়েছে চাঁদপুর মেডিকেল কলেজ। অধ্যক্ষ স্বাক্ষরিত নোটিশে বলা হয়, ৩ মার্চ অনুষ্ঠিত শৃঙ্খলা কমিটির সুপারিশ এবং ২৮ ফেব্রুয়ারি ৪৬তম বর্ধিত একাডেমিক কাউন্সিলের সভার সিদ্ধান্ত মোতাবেক শিক্ষার্থীদের বিনা অনুমতিতে অনুপস্থিতির জন্য প্রতিদিনের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ হাজিরা কর্তন ও আর্থিক জরিমানার সিদ্ধান্ত গ্রহন করা হয়। সে মোতাবেক সকল শিক্ষার্থীদের নির্দেশনা মেনে চলার জন্য নির্দেশ প্রদান করা হল।

হাজিরা কর্তন ও জরিমানার সিদ্ধান্ত জানিয়েছে যশোর মেডিকেল কলেজও। একই সঙ্গে অটো ভ্যাকেশন নিতে উস্কানি দিলে বহিষ্কারের হুমকিও দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। আজ রবিবার অধ্যক্ষ স্বাক্ষরিত এক নোটিশে এ তথ্য জানানো হয়। নোটিশ অনুযায়ী, কোন অজুহাতে পূর্বানুমতি ব্যতিরেকে যে কোন ক্লাস ও পরীক্ষা দলগতভাবে বর্জন করা যাবে না। সরকার ঘোষিত ছুটির সাথে কলেজ কর্তৃপক্ষ কর্তৃক বর্ধিত ছুটির পূর্বে বা পরে কোন অবস্থাতেই দলগত সিদ্ধান্তে ছুটি যোগ করা যাবে না। ক্লিনিক্যাল ক্লাস এবং পরীক্ষা (ওয়ার্ড ফাইনাল) নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করে আবশ্যিক ভাবে নির্ধারিত দিনে পরবর্তী ওয়ার্ডের ক্লাসে উপস্থিত থাকতে হবে। যে কোন এক বিভাগের পরীক্ষার অজুহাতে অন্য বিভাগের নির্ধারিত ক্লাস থেকে বিরত থাকা যাবে না।

আরও পড়ুন: কাল থেকে সব বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ

এই নোটিশে আরও বলা হয়, এসব নির্দেশনা অনুসরণের ব্যত্যয় ঘটলে দোষীদের চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তি প্রদান করা হবে। নির্ধারিত শাস্তিগুলো হল— ন্যূনতম শাস্তি ৫টা থেকে ২০টা পর্যন্ত হাজিরা কাটা, ফরম ফিলআপের জন্য ছাড়পত্র প্রদান না করা এবং নির্দেশনা অমান্য করায় মদত প্রদানকারী কেউ চিহ্নিত হলে তাকে সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে কলেজ থেকে বহিঃস্কারাদেশ দেওয়া হতে পারে।

এ বিষয়ে গত ৫ মার্চ রংপুর মেডিকেল কলেজ অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মো. নজরুল ইসলাম দ্য ক্যাম্পাসকে বলেন, শিক্ষার্থীরা অনোনুমোদিতভাবে চলে যাওয়ায় একাডেমিক কার্যক্রম বিঘ্নিত হচ্ছে। এজন্য আমরা এ নোটিশ দিয়েছি।

রবিবার বিকেলে চাঁদপুর মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. সাহেলা নাজনীন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, শিক্ষার্থীরা মাঝে মাঝে ছুটি ছাড়ােই বাড়ি চলে যায়; ১৫-২০ দিন। এরকম করে ইলেকশনের আগেও অনেক বন্ধ ছিল। ওরা যখন লং টার্ম চলে যায় ছুটি ছাড়া, তখন আমরা কোর্স কমপ্লিট করতে পারি না। ওদের কোর্স কমপ্লিট হবে না, তাহলে ওরা কি ভাল ডাক্তার হবে? পরীক্ষা কেমনে বসবে? ইউনিভার্সিটির নিয়ম অনুযায়ী, ৭৫ শতাংশের ওপর উপস্থিতি থাকতে হবে, না হলে ইউনিভার্সিটি ফর্ম ফিলআপ করে না।

অধ্যক্ষ আরও বলেন, এটা ট্রেন্ড হয়ে যাচ্ছে। ১৫ দিন, ২০ দিন, এক মাস, দুই মাস— এভাবে এভাবে চলে যায়। তাহলে তো ওরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আপনি কি ফাঁকি দিয়ে চিকিৎসক তৈরি করবেন? আমাদের সিলেবাসে ভাগ করা আছে কোন টার্মে আপনি কী কী পড়াবেন; এখন আমার স্টুডেন্ট চলে গেল কিন্তু অন্য মেডিকেল থাকল— তাহলে তো আমার ছেলেমেয়েরা যারা চলে যাচ্ছে, তারা নিজেরাই পিছিয়ে যাচ্ছে।

স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, রবিবার সকালে মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষদের সঙ্গে অনলাইনে বৈঠক হয়েছে। এতে অটো ভ্যাকেশনের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।

আরও পড়ুন: মেডিকেল কলেজ বন্ধের বিষয়ে সিদ্ধান্ত কবে, যা জানা গেল

এ বিষয়ে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (চিকিৎসা শিক্ষা) অধ্যাপক ডা. রুবীনা ইয়াসমিন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, আমাদের তরফ থেকে একটা সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যে সবাই চিন্তা করুক— এটাকে কিভাবে প্রিভেন্ট করা যায়। আগস্ট পরবর্তী এই জিনিসটা অনেক বেশি হচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে পরবর্তী সময়ে স্টেক হোল্ডারদের সাথে কথা বলে একটা সমন্বিত উদ্যোগ নিব। আসলেই একটা সমন্বিত ব্যবস্থাপনা থাকা উচিত।

বিভিন্ন মেডিকেলের আর্থিক জরিমানা, ফিরে আসা ও হাজিরা কর্তনের নোটিশ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এই বিষয়ে শাস্তি যদি মেডিকেলের প্রিন্সিপালরা দিয়ে থাকেন, এটা হয়ত এরকমই বলবৎ থাকবে। স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের তরফ থেকে এ বিষয়ে ইতিবাচক বা নেতিবাচক কিছু বলা হয়নি।