হামের জেনেটিক পরিবর্তন হয়নি, ভ্যাকসিনের কার্যকর প্রভাব মিলেছে
বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়া হামের ভাইরাসে বিদ্যমান ভ্যাকসিনের সুরক্ষা ব্যাহত করার মতো কোনো জিনগত বা জেনেটিক পরিবর্তনের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। গবেষণায় দেখা গেছে, সন্দেহভাজন রোগীদের মধ্যে যাদের ভ্যাকসিনের দুটি ডোজই নেওয়া ছিল, তাদের আক্রান্ত বা পজিটিভ হওয়ার হার তুলনামূলক কম পাওয়া গেছে। আর জিনগত বিশ্লেষণ বলছে, বর্তমানে ছড়িয়ে পড়া ভাইরাসটি ‘বি৩’ জেনোটাইপের অন্তর্ভুক্ত, যা বিশ্বের অন্যান্য দেশের হামের প্রাদুর্ভাবগুলোতেও দেখা গেছে।
আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআর,বি) প্রাথমিক গবেষণায় এমন চিত্র উঠে এসেছে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, আইসিডিডিআর,বি এবং বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের গবেষকরা চলতি বছরের ২০ এপ্রিল থেকে ২১ মের মধ্যে হাসপাতালটিতে হামের লক্ষণ নিয়ে ভর্তি হওয়া ১৪ বছর বয়সী বা তার চেয়ে ছোট ৩৪১ জন শিশুর ওপর এই গবেষণা চালান। ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় তাদের মধ্যে ৩২৪ জন শিশুর হাম নিশ্চিত হয়। আক্রান্তদের মধ্যে ৩ থেকে ৮ মাস বয়সী শিশুদের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি ছিল, যাদের মধ্যে ১৩৭ জনের হাম নিশ্চিত করা গেছে।
গবেষকরা বলছেন, হামের প্রাদুর্ভাবের ব্যাপ্তি দেখে অনেকের মনে প্রশ্ন জেগেছিল—ভাইরাসটি জেনেটিকালি এতটাই পরিবর্তিত হয়ে গেছে কি না, যার ফলে ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা কমে গেছে। তবে এই গবেষণা সেই ধারণাকে সমর্থন করে না। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১৫ মার্চ থেকে ২৫ জুলাইয়ের মধ্যে ১ লক্ষ ২২ হাজার ৭৬৩ জন সন্দেহভাজন হাম রোগী এবং ১৫ হাজার ২৭২ জন ল্যাবরেটরিতে নিশ্চিত হওয়া হাম রোগী শনাক্ত হয়েছেন। এই একই সময়ে হামজনিত কারণে ৭২১ জন সন্দেহভাজন এবং ৯৫ জন নিশ্চিত মৃত্যুর ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে।
গবেষণা সূত্রে জানা গেছে, গবেষকরা বয়স এবং টিকা নেওয়ার তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ৩৪১ জন শিশুকে চারটি দলে ভাগ করেন। এর মধ্যে ৯ মাসের কম বয়সী (নিয়মিত টিকা দেওয়ার বয়সের চেয়ে ছোট) ১৪৬ জন শিশুর মধ্যে ১৪২ জন পজিটিভ শনাক্ত হয়, যা ৯৭ শতাংশ।
টিকা দেওয়ার বয়স হওয়া সত্ত্বেও কোনো ডোজ না পাওয়া ১২৬ জন শিশুর মধ্যে ১২২ জন বা ৯৭ শতাংশের শরীরে হাম নিশ্চিত হয়। এক ডোজ টিকা পাওয়া ৪৮ জন শিশুর মধ্যে ৪৪ জন (৯২ শতাংশ) এবং দুটি সুপারিশকৃত ডোজই পাওয়া ২১ জন শিশুর মধ্যে ১৬ জন (৭৬ শতাংশ) পজিটিভ পাওয়া যায়। তবে এর অর্থ এই নয় যে পূর্ণাঙ্গ টিকা পাওয়া মোট শিশুদের ৭৬ শতাংশই হামে আক্রান্ত হচ্ছে। হাসপাতালের এই গবেষণায় কেবল হামের সন্দেহ নিয়ে ভর্তি হওয়া যে ২১ জন পূর্ণাঙ্গ টিকা পাওয়া শিশু অন্তর্ভুক্ত ছিল, এই শতাংশ কেবল তাদেরকেই নির্দেশ করে।
আরও পড়ুন: হামে মৃত শিশুদের ৭১ শতাংশেরই মেলেনি আইসিইউ, হাসপাতালে হাসপাতালে ঘুরেছে ৮২ শতাংশ
টিকার সুরক্ষা না থাকা শিশুদের আক্রান্তের হার যেখানে ৯৭ শতাংশ ছিল, সেখান থেকে কমতে কমতে দুই ডোজ নেওয়া শিশুদের ক্ষেত্রে তা ৭৬ শতাংশে নেমে আসা প্রমাণ করে যে টিকা রোগ প্রতিরোধে সুরক্ষা দিচ্ছে। তবে প্রাদুর্ভাবের সময় ভ্যাকসিন কতটা কার্যকরভাবে কাজ করছে তা নির্ধারণ করতে সুস্থ বা অনাক্রান্ত শিশুদের অন্তর্ভুক্ত করে আরও বিস্তৃত গবেষণার প্রয়োজন।
আইসিডিডিআর,বির সংক্রামক রোগ বিভাগের ভাইরোলজি ল্যাবরেটরির সহযোগী বিজ্ঞানী ডা. নূরজাহান মালিহা বলেন, প্রাদুর্ভাবের বিশাল আকারের কারণে ভ্যাকসিন এখনো কাজ করছে কি না তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। তবে আমাদের গবেষণায় ভাইরাসটি ভ্যাকসিনের সুরক্ষাকে ফাঁকি দিয়েছে—এমন কোনো প্রমাণ মেলেনি। আমরা দুই ডোজ পাওয়া শিশুদের মধ্যে আক্রান্তের হার কম দেখেছি; যদিও এই হাসপাতালভিত্তিক পরীক্ষা থেকে পুরো জনসংখ্যার স্তরে ভ্যাকসিনের কার্যকারিতার সঠিক পরিমাপ করা সম্ভব নয়।
গবেষকরা বলছেন, পূর্ণাঙ্গ টিকা নেওয়ার পরও ১৬ জন শিশুর হামে আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি নিয়ে আরও অনুসন্ধানের প্রয়োজন রয়েছে। সম্ভাব্য কারণগুলোর মধ্যে হতে পারে—টিকা নেওয়ার পরও কিছু শিশুর শরীরে পর্যাপ্ত প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি না হওয়া, সময়ের সাথে সাথে অ্যান্টিবডির সুরক্ষা কমে যাওয়া, পুষ্টিহীনতা অথবা অন্যান্য ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যগত উপাদান। এই গবেষণাটি মূল কারণ নির্ধারণ করার উদ্দেশ্যে ডিজাইন করা হয়নি।
আইসিডিডিআর,বি ফিলোজেনেটিক অ্যানালিসিস পরিচালনা করেছে, যার মাধ্যমে ভাইরাসের জিনোম সিকোয়েন্স তুলনা করে এদের পারস্পরিক সম্পর্ক এবং কীভাবে ছড়িয়ে পড়ছে তা বোঝা যায়। এতে মোট ৫৫টি হোল-জিনোম সিকোয়েন্স বিশ্লেষণ করা হয়; যার মধ্যে ১৮টি আইসিডিডিআর,বি এবং ৩৭টি সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) সম্পন্ন করেছে।
আরও পড়ুন: হামে মৃত্যুঝুঁকি বাড়াচ্ছে নিউমোনিয়া, অ্যান্টিবায়োটিক কাজ না করায় চিকিৎসা ‘ব্যাহত’
বিশ্লেষণে দেখা যায়, সমস্ত ভাইরাসই বি৩ সাবক্লেডের অন্তর্ভুক্ত এবং এগুলো অন্য দেশে পাওয়া বি৩ ভাইরাসের সাথেই সাদৃশ্যপূর্ণ। গবেষকরা ভাইরাসের ‘এইচ’ প্রোটিন এপিটোপের অঞ্চলে চারটি পরিবর্তন বা মিউটেশন চিহ্নিত করেছেন, যা অ্যান্টিবডি শনাক্ত করে থাকে। এইচ প্রোটিন ভাইরাসকে মানবকোষে প্রবেশ করতে সাহায্য করে এবং ভ্যাকসিনের মাধ্যমে তৈরি অ্যান্টিবডির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। এই মিউটেশনগুলোর কিছু আগে অন্যান্য দেশে ছড়ানো হামের ভাইরাসেও পাওয়া গিয়েছিল। এদের উপস্থিতি এটা বোঝায় না যে ভাইরাসটি ভ্যাকসিনের প্রতি প্রতিরোধী হয়ে উঠেছে। হাম এখনো একটি একক সেরোটাইপ এবং ভ্যাকসিনের কারণে সৃষ্ট অ্যান্টিবডি ভাইরাসের বেশ কয়েকটি স্থান শনাক্ত করতে পারে। মিউটেশনগুলোর অ্যান্টিবডির সুরক্ষায় দৃশ্যমান কোনো প্রভাব রয়েছে কি না, তা জানতে আরও ল্যাবরেটরি পরীক্ষার প্রয়োজন।
গবেষণায় নবজাতক ও ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে একটি ঝুঁকিপূর্ণ সময়ের বিষয় প্রকাশ পেয়েছে। বাংলাদেশে হাম-রুবেলা (এমআর) টিকার প্রথম ডোজ ৯ মাসে এবং দ্বিতীয় ডোজ ১৫ মাসে দেওয়া হয়। প্রথম ডোজ পাওয়ার আগে শিশুরা আংশিকভাবে তাদের মায়ের কাছ থেকে পাওয়া অ্যান্টিবডি এবং ব্যাপক টিকাদানের মাধ্যমে সমাজে তৈরি হওয়া সমষ্টিগত সুরক্ষার (কমিউনিটি প্রটেকশন) ওপর নির্ভর করে।
আইসিডিডিআর,বির পূর্বের একটি জন্ম কোহর্টের ১৬ জোড়া মা-শিশুর সংরক্ষিত নমুনার প্রাথমিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, জীবনের প্রথম কয়েক মাসের মধ্যে মায়ের থেকে পাওয়া হামের অ্যান্টিবডি দ্রুত কমে যায়। মূল্যায়িত ছোট এই দলটির ৩ থেকে ৮ মাস বয়সী শিশুদের মধ্যে সুরক্ষাকারী কোনো অ্যান্টিবডি পাওয়া যায়নি। যেহেতু এই বিশ্লেষণে মাত্র ১৬ জন শিশু অন্তর্ভুক্ত ছিল, তাই বড় জন্ম কোহর্ট থেকে নমুনা নিয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।
আইসিডিডিআর,বির সংক্রামক রোগ বিভাগের জ্যেষ্ঠ পরিচালক ডা. মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, হাম প্রতিরোধে এবং জটিল রোগের ঝুঁকি কমাতে টিকাদানই সবচেয়ে কার্যকর উপায়। একই সাথে, আমাদের বুঝতে হবে কেন জাতীয়ভাবে টিকাদানের হার তুলনামূলকভাবে বেশি থাকা সত্ত্বেও এই প্রাদুর্ভাব এত বড় আকার ধারণ করল।
ভাইরোলজি ল্যাবরেটরির সহকারী বিজ্ঞানী ডা. কামরুন নাহার যোগ করেন, আমাদের বের করতে হবে কেন শিশুরা টিকা নেওয়া থেকে বাদ পড়ছে এবং জাতীয়ভাবে ঘোষিত কভারেজের আড়ালে কোনো কোনো গোষ্ঠীর মধ্যে বড় ধরনের ইমিউনিটি বা প্রতিরোধ ক্ষমতার ঘাটতি লুকিয়ে আছে কি না। এসব গবেষণার তথ্য বাংলাদেশকে টিকাদান কৌশল পুনর্নির্ধারণ করতে এবং ভবিষ্যতের প্রাদুর্ভাব থেকে শিশুদের আরও ভালোভাবে রক্ষা করতে সাহায্য করবে।
আরও পড়ুন: হামে নিশ্চিত ও সন্দেহজনক আক্রান্ত-মৃত্যুর পার্থক্য কী?
আইসিডিডিআর,বির নির্বাহী পরিচালক ডা. তাহমিদ আহমেদ বলেন, এই প্রাথমিক ফলাফলগুলো কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে, তবে আরও কত কিছু যে আমাদের জানা বাকি তা-ও তুলে ধরেছে। কেন কিছু টিকাপ্রাপ্ত শিশু আক্রান্ত হলো, মারাত্মক রোগ ও মৃত্যুর পেছনে কী কী কারণ রয়েছে, পুষ্টিহীনতা কীভাবে সুরক্ষায় প্রভাব ফেলে এবং মায়েরা দেওয়া অ্যান্টিবডি শিশুরা কখন হারিয়ে ফেলে—তা নিয়ে আইসিডিডিআর,বি আরও বিস্তৃত গবেষণা জোরদার করছে।
আইসিডিডিআর,বি জানিয়েছে, বর্তমান প্রাদুর্ভাব মোকাবেলায় আইসিডিডিআর,বির গবেষকরা চারটি প্রধান বিভাগীয় হাসপাতালে একটি ক্লিনিক্যাল কোহর্ট শুরু করেছেন। পাশাপাশি ল্যাবরেটরি ও জিনোমিক নজরদারি, একটি সম্প্রসারিত জন্ম-কোহর্ট রোগ প্রতিরোধবিদ্যা (ইমিউনোলজি) গবেষণা, হামের স্ট্যান্ডার্ড চিকিৎসার সাথে জিংকের পাইলট স্টাডি এবং শিশুরা কেন টিকা মিস করছে তার কারণ অনুসন্ধানে মাঠপর্যায়ের গবেষণা শুরু করেছেন।
গবেষকরা বিশেষভাবে জোর দিয়ে বলেছেন যে, অভিভাবকদের সন্তানদের টিকাদানে দেরি করা বা বিরত থাকা একদমই উচিত নয়। উপযুক্ত বয়স অনুযায়ী শিশুদের হাম-রুবেলা ভ্যাকসিনের সবকটি ডোজ নেওয়া নিশ্চিত করতে হবে এবং প্রাদুর্ভাবের সময়ে অভিভাবকদের সরকারের টিকাদান সংক্রান্ত নির্দেশনা মেনে চলতে অনুরোধ করা হচ্ছে।