০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৫১

পে-স্কেলের অর্থ জোগাড়ে ৫ পরিকল্পনা সরকারের

৯ম জাতীয় পে-স্কেল  © টিডিসি সম্পাদিত

প্রস্তাবিত ৯ম জাতীয় পে-স্কেল অনুমোদন করেছে সরকার। আগামী রবিবার নতুন বেতনকাঠামো-সংক্রান্ত আদেশ জারি করা হবে বলে জানিয়েছেন অর্থসচিব ড. খায়েরুজ্জামান মজুমদার। তবে পে-স্কেল বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান করতে উন্নয়ন ব্যয় ও অগ্রাধিকার প্রকল্প পুনর্বিন্যাস, কম অগ্রাধিকার প্রকল্পের বরাদ্দ স্থগিত, প্রশাসনিক ব্যয়ে কৃচ্ছসাধন, রাজস্ব আয় বৃদ্ধি ও কর খাত সংস্কার এবং ব্যয়ে দক্ষতা বৃদ্ধি ও অপচয় কমানোর পাঁচটি পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার।

নতুন পে স্কেলের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ মধ্যমেয়াদি বাজেট পরিকল্পনায় (এমটিবিএফ) বিবেচনায় রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রিপরিষদের সচিব নাসিমুল গনি। অর্থাৎ সরকারের কাছে এটি হঠাৎ তৈরি হওয়া কোনো ব্যয় নয়। সরকার প্রতিবছর শুধু এক বছরের বাজেট করে না; আগামী কয়েক বছর কী পরিমাণ আয় হতে পারে, কত ব্যয় হবে এবং কোন খাতে কত টাকা লাগতে পারে তারও একটি আগাম হিসাব তৈরি করে। নতুন পে স্কেলের সম্ভাব্য ব্যয়ও সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিবেচনায় ছিল।

উন্নয়ন ব্যয় ও অগ্রাধিকারের প্রকল্প
সরকারের প্রথম নজর উন্নয়ন বাজেট বা এডিপির দিকে। চলতি অর্থবছরে এডিপির আকার তিন লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে এক হাজারের বেশি প্রকল্প এখনো চূড়ান্ত অনুমোদন পায়নি। অনেক প্রকল্পের কাজও শুরু হয়নি।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, সব প্রকল্প একই গুরুত্বের নয়। কোনো প্রকল্প জাতীয় অর্থনীতির জন্য জরুরি, আবার কোনো প্রকল্প কয়েক মাস বা এক বছর পিছিয়ে গেলেও বড় ক্ষতি হবে না। ফলে কম অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত প্রকল্পগুলো পুনর্বিবেচনা করা হতে পারে।

আরও পড়ুন: নবম পে স্কেলের গেজেট জারির সময় জানাল অর্থসচিব

কম অগ্রাধিকার প্রকল্পের বরাদ্দ স্থগিত
কোনো ভবন নির্মাণ প্রকল্প আগামী বছরেও শুরু করা সম্ভব হলে আপাতত সেই অর্থ অন্য খাতে ব্যবহার করা যেতে পারে। একইভাবে ধীরগতির প্রকল্পে অর্থ ছাড়ের সময়ও পিছিয়ে দেওয়া সম্ভব।

প্রশাসনিক ব্যয়ে কৃচ্ছসাধন
বিদেশ সফর, প্রশিক্ষণ কর্মসূচি, সেমিনার, পরামর্শক নিয়োগ, ভবন সংস্কার, আসবাব ও সরঞ্জাম কেনার মতো ব্যয়ের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা হতে পারে।

অর্থ বিভাগের একজন কর্মকর্তা বলেন, অনেক সময় একই ধরনের কাজের জন্য একাধিক সংস্থা আলাদা প্রকল্প নেয় বা আলাদা পরামর্শক নিয়োগ করে। এসব ক্ষেত্রে সমন্বয় করা গেলে উল্লেখযোগ্য অর্থ সাশ্রয় সম্ভব।

তবে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মূল বরাদ্দ কমানোর বিষয়ে সরকার সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা কিংবা দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য দেওয়া সহায়তার মূল বরাদ্দ কমানোর পরিকল্পনা নেই। বরং এসব কর্মসূচির প্রশাসনিক ব্যয় কমিয়ে সাশ্রয়ের সুযোগ খোঁজা হবে।

রাজস্ব আয় বৃদ্ধি ও কর খাত সংস্কার
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, ‘নতুন জাতীয় পে স্কেল বাস্তবায়ন কোনো ব্যয়বহুল সিদ্ধান্ত নয়; এটি মূল্যস্ফীতির বাস্তবতায় সরকারি কর্মচারীদের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষার একটি প্রয়োজনীয় উদ্যোগ। ২০১৫ সালের পর থেকে জীবনযাত্রার ব্যয় দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। এই অতিরিক্ত ব্যয়ের অর্থায়নের জন্য সরকার মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামো অনুযায়ী রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর কৌশল নিয়েছে। 

তিনি আরও বলেন, এরই মধ্যে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসসহ রাজস্ব প্রশাসনের বিভিন্ন ইউনিটে রেকর্ড পরিমাণ রাজস্ব আদায়ের ইতিবাচক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। করের আওতা সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি রোধ, ডিজিটাল রাজস্ব ব্যবস্থাপনা এবং ঝুঁকিভিত্তিক অডিটের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান করা সম্ভব। রাজস্ব সংস্কার ও পে স্কেল বাস্তবায়ন একসঙ্গে এগোলে অর্থনীতির অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও সামগ্রিক স্থিতিশীলতা আরো শক্তিশালী হবে।’

ব্যয়ে দক্ষতা বৃদ্ধি, অপচয় কমানো
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের (পিইবি) চেয়ারম্যান মাশরুর রিয়াজ বলেন, নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ কোথা থেকে আসবে, সে বিষয়ে সরকারের এখনো সুস্পষ্ট ও টেকসই অর্থায়ন পরিকল্পনা দৃশ্যমান নয়। বছরে অতিরিক্ত যে ব্যয়ের দায় তৈরি হচ্ছে, তা চলতি অর্থবছরের জাতীয় বাজেটের প্রায় ১০ শতাংশের সমান। ফলে শুধু ঋণনির্ভর না হয়ে রাজস্ব আহরণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে সরকারি ব্যয়ে অপচয় ও অদক্ষতা কমিয়ে সেই অর্থ উৎপাদনশীল ও টেকসই উন্নয়ন কার্যক্রমে বিনিয়োগ করতে হবে। পে স্কেলটি যদি ধাপে ধাপে তিন বছরে বাস্তবায়ন করা হয়, তাহলে সরকারের ওপর আর্থিক চাপ কিছুটা সহনীয় পর্যায়ে রাখা সম্ভব হবে।

আরও পড়ুন: ১১ বছর পর পে স্কেল, দুই বছরে ৩ ধাপে বাস্তবায়ন, মিশ্র প্রতিক্রিয়ায় সরকারি চাকরিজীবীরা

তিনি আরও বলেন, স্বল্প মেয়াদে ব্যয় সমন্বয় করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব। কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে স্থায়ী সমাধান একটাই সরকারকে আরো বেশি রাজস্ব আয় করতে হবে। করজাল সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি কমানো, কর প্রশাসন আধুনিক করা এবং অর্থনীতির আনুষ্ঠানিক খাত বড় করার মাধ্যমে রাজস্ব বাড়াতে না পারলে আগামী বছরগুলোতে নতুন পে স্কেলের ব্যয় বাজেটের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে।

চলতি বাজেটে নতুন পে স্কেলের আংশিক বাস্তবায়নের জন্য প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে। তবে পুরো পে স্কেল বাস্তবায়নে এর চেয়ে অনেক বেশি অর্থ প্রয়োজন হবে।

এর আগে, সোমবার বিকেলে সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে নতুন বেতনস্কেল অনুমোদন দেওয়া হয়। একই সঙ্গে নতুন বেতনস্কেলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সশস্ত্র বাহিনীর জন্য যৌথবাহিনী নির্দেশাবলী ২০২৬-ও অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এসব ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর হবে।