যৌন হয়রানির তদন্ত চলমান, বহিষ্কার হয়েছিলেন গবেষণায় জালিয়াতির দায়ে
গবেষণাপত্রে জালিয়াতির দায়ে সাময়িক বরখাস্ত এবং একাধিকবার যৌন নির্যাতনের অভিযোগে অভিযুক্ত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আমির হোসেন ভূঁইয়াকে জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবিপ্রবি) নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।
এতে বলা হয়, রাষ্ট্রপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলরের অনুমোদনক্রমে ‘জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০১৭’-এর ১০(১) ধারা অনুযায়ী তাকে উপাচার্য পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। যোগদানের তারিখ থেকে আগামী চার বছর তিনি এ দায়িত্ব পালন করবেন। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে তাকে সার্বক্ষণিক ক্যাম্পাসে অবস্থান করতে হবে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
জানা গেছে, ড. আমির হোসেন ভূঁইয়া জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক। সম্প্রতি তিনি জাবি জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের ক্রীড়া ও সংস্কৃতি সম্পাদক পদেও নির্বাচিত হন।
এদিকে ড. মোহাম্মদ আমির হোসেন ভূঁইয়ার এ নিয়োগ ঘিরে নতুন করে সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। এর আগে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের একাধিক অভিযোগের মুখে পড়েন তিনি। ২০২৪ সালেও বিভাগীয় সভাপতির কাছে তার বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দেন শিক্ষার্থীরা। সেখানে ছাত্রীদের যৌন হয়রানি, বডি শেমিং, মানসিক নির্যাতন, অশালীন মন্তব্য, ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে কটূক্তি এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ আনা হয়। এ ছাড়া গবেষণাপত্রে জালিয়াতির অভিযোগে ২০১৯ সালের ৩ আগস্ট অনুষ্ঠিত সিন্ডিকেট সভায় অধ্যাপক মোহাম্মদ আমির হোসেন ভূঁইয়াকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল।
আরও পড়ুন: ধারেকাছেও নেই দুজন, শিক্ষায়-গবেষণায় ৭ জনই পিছিয়ে বিদায়ীদের চেয়ে
২০২৪ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর বিভাগের ৪৭তম আবর্তনের শিক্ষার্থীরা বিভাগীয় সভাপতির কাছে দেওয়া অভিযোগে উল্লেখ করেন, অধ্যাপক আমির হোসেন ক্লাসে শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে আলোচনা করতেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের ওপর নজরদারি চালাতেন এবং নারী শিক্ষার্থীদের নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করতেন। এছাড়া শিক্ষার্থীদের হেনস্তা, ফলাফলে বৈষম্য সৃষ্টি, গবেষণায় নিরুৎসাহিত করা এবং সহকর্মী শিক্ষকদের সম্পর্কেও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করার অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় ওই সময় বিভাগে তালাও দেন শিক্ষার্থীরা।
এসব অভিযোগের পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পাঁচ সদস্যের একটি প্রাথমিক তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্ত কমিটিকে ১৫ কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলেও দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তদন্ত কার্যক্রম শেষ হয়নি।
খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, অধ্যাপক আমির হোসেনের বিরুদ্ধে যৌন হেনস্তার অভিযোগ নতুন নয়। ২০০৬ সালেও তার বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ উত্থাপন করেন শিক্ষার্থীরা। ওই বছরের ১০ জুলাই এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করে বলেন, তৎকালীন প্রভাষক আমির হোসেন ভুঁইয়ার অসৌজন্যমূলক আচরণে নারী শিক্ষার্থীরা অস্বস্তি বোধ করেন। এর ফলে তাদের ক্লাসে উপস্থিতির হারও কমে গেছে।
আরও পড়ুন: লুটপাটের মহোৎসব সিদ্ধেশ্বরী বিদ্যালয়ে, অর্ধ শতাধিক শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম, লোপাট ১৪ কোটি টাকা
ওই প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে শিক্ষার্থীরা জানিয়েছিলেন, সে বছর সুন্দরবনে শিক্ষাসফরে থাকাকালীন ওই শিক্ষক ছাত্রীদের রুমে উঁকিঝুঁকি মারতেন। এ ছাড়া একাডেমিক বা পড়াশোনার সহযোগিতার নাম করে তিনি ছাত্রীদের নিজের রুমে ডেকে নিয়ে কুপ্রস্তাব দিতেন। শিক্ষার্থীরা তার একটি বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলেন, তিনি প্রায়ই ক্লাসে নিজের বিয়ে না করার কারণ হিসেবে বলতেন— আমি একটি মৌমাছি এবং ফুল থেকে ফুলে মধু খুঁজে বেড়াই। আর এই কারণেই আমি এখনও অবিবাহিত।
তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে বিলম্ব হচ্ছে, কারণ একই সময়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিভিন্ন কমিটি কাজ করছে। বিশেষ করে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানসহ অন্যান্য ইস্যুতে সংশ্লিষ্ট কমিটিগুলোর ব্যস্ততার কারণে এ প্রক্রিয়া কিছুটা ধীর হয়েছে— ড. এ বি এম আজিজুর রহমান, জাবির স্ট্রাকচারাল কমিটির সদস্যসচিব ও বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার
শিক্ষার্থীদের যৌন নিপীড়নে অভিযোগের তদন্ত প্রতিবেদনের বিষয়ে তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. আইরিন আক্তার বলেন, পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি তদন্ত শেষে আমরা প্রতিবেদন জমা দিয়েছি। পরবর্তী সিদ্ধান্ত বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নেবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার ড. এ বি এম আজিজুর রহমান বলেন, আরও তিনটি সভা শেষে সুপারিশ সিন্ডিকেটে পাঠানো হবে, এরপর সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে চূড়ান্ত ফল নির্ধারিত হবে।
গবেষণা জালিয়াতির বিষয়ে জানা গেছে, সমুদ্রের লোনা পানি প্রবেশের প্রভাব নিয়ে ২০১২ সালে একটি গবেষণা করে পরমাণু শক্তি গবেষণা ইনস্টিটিউট। ২০১৭ সালে ওই গবেষণার তথ্য-উপাত্ত নিয়ে নতুন একটি গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশ করেন পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের ৩৮তম ব্যাচের শিক্ষার্থী এসএম দিদারুল ইসলাম। এতে সহ-গবেষক হিসেবে আমির হোসেন, দিদারুলের স্ত্রী ভূতাত্ত্বিক বিজ্ঞান বিভাগের ৪০তম ব্যাচের শিক্ষার্থী তানজিনা রুমী এবং পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের ৪০তম ব্যাচের শিক্ষার্থী গাউসুল আজমের নাম রয়েছে। তখনই তাদের বিরুদ্ধে উপাচার্য বরাবর লিখিত অভিযোগ দেন পরমাণু শক্তি গবেষণা ইনস্টিটিউটের মুখ্য ভূতত্ত্ববিদ তপন কুমার মজুমদার।
অভিযোগ আমলে নিয়ে ওই বছর চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্তে জালিয়াতির প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ায় সিন্ডিকেট তাকে সাময়িক বরখাস্ত এবং একটি স্ট্রাকচার কমিটি গঠন করে। তবে স্ট্রাকচার কমিটির চূড়ান্ত প্রতিবেদন এখনও পাওয়া যায়নি।
আরও পড়ুন: শিক্ষামন্ত্রী মিলনের বিতর্কিত সাবেক সেই এপিএসের ডিপিই পরিচালকের নিয়োগ বাতিল
এ বিষয়ে জাবির স্ট্রাকচারাল কমিটির সদস্যসচিব ও বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার ড. এ বি এম আজিজুর রহমান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে বিলম্ব হচ্ছে, কারণ একই সময়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিভিন্ন কমিটি কাজ করছে। বিশেষ করে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানসহ অন্যান্য ইস্যুতে সংশ্লিষ্ট কমিটিগুলোর ব্যস্ততার কারণে এ প্রক্রিয়া কিছুটা ধীর হয়েছে। তিনি আরও বলেন, অন্তত আরও তিনটি সভা শেষে সুপারিশ সিন্ডিকেটে পাঠানো হবে, এরপর সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে চূড়ান্ত ফলাফল নির্ধারিত হবে।