১৫ আগস্ট ২০২৬, ২০:৫০

আওয়ামী আমলের নীতিমালাই বহাল, ফেসবুকে মতপ্রকাশ নিয়ে অস্বস্তিতে শিক্ষকরা

ফেসবুকে মত প্রকাশে অস্বস্তিতে শিক্ষকরা  © সংগৃহীত ও সম্পাদিত

ফেসবুকে সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মতপ্রকাশের পরিসর নিয়ে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রণীত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের নির্দেশিকাটিই এখনও বহাল রয়েছে। পরে ২০২৪ সালে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নির্দেশিকাটি হালনাগাদ করেছে। কিন্তু তখন মৌলিক ধারাগুলোতে পরিবর্তন বা পরিমার্জন করা হয়নি। বর্তমানে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসেও একই নির্দেশিকা অপরিবর্তিত রেখে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে ফের কঠোর হওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। ফলে মত প্রকাশ নিয়ে স্কুল-কলেজের শিক্ষকরাও রয়েছেন অস্বস্তিতে। সংশ্লিষ্টদের মতে, পুরোনো নীতিমালার অস্পষ্টতা ও সীমাবদ্ধতা দূর না হওয়ায় আগের সমস্যাগুলোই নতুন করে সামনে আসছে। তাই শিক্ষকদের ব্যক্তিগত মতপ্রকাশের অধিকার ও দায়িত্বশীলতা এই দুটোর মধ্যে ভারসাম্য রেখে নির্দেশিকাটি অবিলম্বে পরিমার্জন করা প্রয়োজন।

যে প্রেক্ষাপটে পুনরায় আলোচনায়
সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার পিটাইটিকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা বিউটি রাণী পাল শাড়ি পরে ‘আজ কেন মন, উদাসী হয়ে’ গানের তালে হাঁটার একটি রিল ভিডিও পোস্ট করেন। পরে আসিফ ইকবাল ইরন নামে এক প্রবাসী তরুণ ‘ফেঞ্চুগঞ্জ প্রতিদিন’ নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকে নেতিবাচক ক্যাপশন দিয়ে ভিডিওটি ফের পোস্ট করেন। সেই ভিডিওটি ভাইরাল হয়ে যায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলে সমালোচনা ও ট্রল। কিন্তু ভিডিওতে অশ্লীলতা না থাকায় বহু মানুষ তার সমর্থনে সংহতিও প্রকাশ করেন। সাধারণ মানুষের পাশাপাশি শিক্ষক সমাজও সংহতি প্রকাশ করতে সেই গানে রিল ভিডিও পোস্ট করা শুরু করেন। এদিকে সমালোচনার চাপ সইতে না পেরে থানায় জিডি (সাধারণ ডায়েরি) করেন ভুক্তভোগী এই শিক্ষক।

এই ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা ও ট্রলের পরপরই মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য ‘সরকারি প্রতিষ্ঠানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নির্দেশিকা, ২০১৯ (পরিমার্জিত সংস্করণ)’ কঠোরভাবে অনুসরণের নির্দেশ দেয়। গত ২৯ জুলাই জারি করা চিঠিতে বলা হয়, নির্দেশিকা লঙ্ঘন আচরণবিধি ভঙ্গের শামিল এবং ক্ষেত্রবিশেষে তা সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী অসদাচরণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

নতুন করে নির্দেশিকা অনুসরণের নির্দেশ দেওয়ার পর শিক্ষকসমাজে এর প্রয়োজনীয়তা, সীমাবদ্ধতা এবং ব্যক্তিগত মতপ্রকাশের পরিসর নিয়ে এই আলোচনা শুরু হয়েছে।

নির্দেশনায় যা আছে
‘সরকারি প্রতিষ্ঠানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নির্দেশিকা, ২০১৯ (পরিমার্জিত সংস্করণ)’ এ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রে বেশ কিছু বিষয় অনুসরণের কথা বলা হয়েছে। নির্দেশিকায় উল্লেখ রয়েছে:  ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট পরিচালনায় দায়িত্বশীল নাগরিকসুলভ আচরণ ও অনুশাসন মেনে চলতে হবে। কনটেন্ট প্রকাশ এবং বন্ধু নির্বাচন বা ফ্রেন্ড সিলেকশনেও সতর্কতা অবলম্বন করতে বলা হয়েছে। এছাড়া অপ্রয়োজনীয় ট্যাগ, রেফারেন্স বা শেয়ার পরিহার করতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার বা নিজস্ব অ্যাকাউন্টে থাকা ক্ষতিকর কনটেন্টের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মচারী ব্যক্তিগতভাবে দায়ী থাকবেন এবং প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

নির্দেশনায় বলা আছে, অ্যাকাউন্টের নিরাপত্তার জন্য শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহার এবং নিয়মিত তা পরিবর্তন করতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত টেক্সট, ছবি, অডিও, ভিডিওসহ সব ধরনের কনটেন্ট সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। বিষয়বস্তুর উপযুক্ততা নিশ্চিত হয়ে কর্তৃপক্ষ প্রকাশের অনুমতি দেবেন।এছাড়াও নিজস্ব পোস্টে প্রকাশিত তথ্য ও উপাত্তের যথার্থতা ও নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করতে হবে। দাপ্তরিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত বা পারিবারিক বিষয়-সংশ্লিষ্ট কোনো কনটেন্ট পোস্ট, আপলোড বা শেয়ার করা যাবে না।

এমনকি সরকার বা রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয় এমন কোনো পোস্ট, মন্তব্য, লাইক বা শেয়ার থেকে বিরত থাকতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ কনটেন্ট সংরক্ষণ (আর্কাইভিং), পুনঃপ্রদর্শন ও শেয়ারও উৎসাহিত করতে হবে।

নির্দেশনায় আরও বলা আছে, প্রতিষ্ঠানের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিয়মিত হালনাগাদ রাখতে হবে এবং যুক্তিসংগত সময়ের মধ্যে সমস্যা, মন্তব্য বা প্রশ্নের জবাব দিতে হবে। নাগরিক সম্পৃক্ততা বাড়াতে জনসাধারণ বা অংশীজনের পোস্ট গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সাড়া নিশ্চিত করতে হবে।

অতীতে ফেসবুকে পোস্ট নিয়ে যত শিক্ষক হয়রানি
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্ট, শেয়ার কিংবা শ্রেণিকক্ষের কথোপকথনের ভিডিও কখনো কখনো একজন শিক্ষকের জন্য তা হয়ে উঠেছে গ্রেপ্তার, মামলা, কারাভোগ কিংবা সামাজিকভাবে হেয় হওয়ার কারণ। গত কয়েক বছরে এমন একাধিক ঘটনায় শিক্ষকরা হয়রানি ও আইনি জটিলতার মুখে পড়েছেন।

প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে ফেসবুকে পোস্ট, কলেজশিক্ষক গ্রেপ্তার
ঘটনাটি ২০২১ সালের ২৪ অক্টোবরের। কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর মহিলা ডিগ্রি কলেজের রসায়ন বিভাগের প্রভাষক মোহাম্মদ রুহুল আমিনকে গ্রেপ্তার করা হয় ফেসবুকে প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে দেওয়া একটি পোস্ট শেয়ার করার অভিযোগে।

হোসেনপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাবেয়া পারভেজ তখন গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, রুহুল আমিন তাঁর ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডি থেকে ১৪ অক্টোবর একটি পোস্ট শেয়ার করেন। সেখানে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে আপত্তিকর বক্তব্য ছিল বলে অভিযোগ করা হয়। বিষয়টি ধর্মীয়ভাবেও স্পর্শকাতর বলে উল্লেখ করেন তিনি। পরে কলেজের অধ্যক্ষের সঙ্গে কথা বলে পুলিশকে বিষয়টি জানানো হয়। ওই ঘটনায় পুলিশ তথ্যপ্রযুক্তি আইনে মামলা করে এবং পরে রুহুল আমিনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

হোসেনপুর থানার তৎকালীন ওসি মোস্তাফিজুর জানিয়েছিলেন, ১৪ অক্টোবর একটি ফেসবুক আইডি থেকে প্রধানমন্ত্রীর ছবি ব্যবহার করে একটি আপত্তিকর পোস্ট করা হয়। রুহুল আমিন সেদিনই পোস্টটি নিজের প্রোফাইলে শেয়ার করেন এবং পরে সেটি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। অভিযোগের ভিত্তিতে মামলা করার পর তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।

ধর্ম অবমাননার অভিযোগে হৃদয় মণ্ডলের কারাভোগ
২০২২ সালের ২০ মার্চ আলোচনায় আসে মুন্সীগঞ্জের শিক্ষক হৃদয় চন্দ্র মণ্ডলের ঘটনা। ওই দিন তিনি দশম শ্রেণির মানবিক বিভাগের বিজ্ঞান ক্লাস নিচ্ছিলেন। এক শিক্ষার্থীর প্রশ্নের জবাবে ধর্ম ও বিজ্ঞানের পার্থক্য নিয়ে আলোচনা করেন তিনি। এক শিক্ষার্থী সেই কথোপকথনের ভিডিও ধারণ করে।

পরে বিষয়টি প্রধান শিক্ষক মো. আলাউদ্দীনের নজরে এলে সেদিনই হৃদয় মণ্ডলকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। এর দুদিন পর, ২২ মার্চ বিদ্যালয়ের অফিস সহকারী মো. আসাদ ধর্ম অবমাননার অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করেন। সেদিনই গ্রেপ্তার হন হৃদয় মণ্ডল। পরে ১৯ দিন কারাভোগের পর ১০ এপ্রিল জামিনে মুক্তি পান তিনি।

ঘটনার পর ১১ এপ্রিল মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) সরকারি হরগঙ্গা কলেজের অধ্যক্ষ আবদুল হাই তালুকদারকে প্রধান করে এক সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে। ২০ এপ্রিল কমিটি প্রতিবেদন জমা দেয়। তদন্তে হৃদয় মণ্ডলের বিরুদ্ধে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে জানানো হয়।

পাঠ্যক্রম নিয়ে সমালোচনার অভিযোগে চার শিক্ষক গ্রেপ্তার
২০২৩ সালের ২৮ নভেম্বর ফেসবুকের বিভিন্ন গ্রুপে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক নিয়ে সমালোচনা এবং মিথ্যা তথ্য প্রচারের অভিযোগে চারজনকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম (দক্ষিণ) বিভাগ।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন আবুল হাসনাত কবির (৫১), গোলাম রাব্বী (৩৭), জাহাঙ্গীর কবির ও কাজী সাইফুল হক। এর আগে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের সহকারী সচিব আলমগীর হোসেন বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা করেন।

তৎকালীন ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (গোয়েন্দা) মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ জানিয়েছিলেন, শিক্ষা বোর্ডের ওয়েবসাইটে প্রবেশ করে অপ্রকাশিত বই প্রকাশসহ বিভিন্ন ধরনের মিথ্যা তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছিল। একই সঙ্গে ফেসবুক আইডি, গ্রুপ ও পেজে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন ছবি ব্যবহার করে সরকারকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলার অপতৎপরতা চালানো হচ্ছিল বলে তিনি দাবি করেন। এসব গ্রুপ ও পেজে চলমান শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে অপপ্রচার এবং শিক্ষানীতিবিরোধী আন্দোলনের বিভিন্ন তথ্য প্রচার করা হচ্ছিল বলেও জানান তিনি।

উপরের  ঘটনাগুলোতে অভিযোগের ধরন ও আইনি প্রেক্ষাপট এক নয়। তবে ব্যক্তিগত ফেসবুক পোস্ট, কোনো পোস্ট শেয়ার করা কিংবা শ্রেণিকক্ষের বক্তব্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর শিক্ষকদের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেপ্তার ও তদন্তের মতো ঘটনা ঘটেছে।

শিক্ষকরা যেসব কারণে উদ্বিগ্ন
সম্প্রতি প্রধান শিক্ষিকা বিউটি রাণী পালের নাচের ভিডিওকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া বিতর্কের পর মাউশি আবারও সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ওই নির্দেশিকা কঠোরভাবে অনুসরণের নির্দেশ দিয়েছে। পাশাপাশি পুরোনো ঘটনাগুলোর আলোকেও নতুন করে প্রশ্ন উঠছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করার এই নির্দেশিকা কি শিক্ষকদের সুরক্ষা দিচ্ছে, নাকি অস্পষ্ট কিছু ধারার কারণে তাঁদের ব্যক্তিগত মতপ্রকাশ আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে?

এ বিষয়ে  সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সব পর্যায়ের শিক্ষকদের  সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নির্দেশিকার কয়েকটি ধারা নিয়েই তাঁদের মধ্যে  উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এরমধ্যে  ‘ক্ষতিকর কনটেন্ট’ ও ‘সরকার বা রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন’—এ ধরনের শব্দের কোনো স্পষ্ট সংজ্ঞা না থাকায় কোন পোস্টকে কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। এমনকি ফ্রেন্ড সিলেকশনেও সতর্কতার নির্দেশনা ব্যক্তিগত পরিসরে হস্তক্ষেপের আশঙ্কা তৈরি করছে বলে মনে করছেন অনেক শিক্ষক।

আরও পড়ুন: শিক্ষকদের ফেসবুক ব্যবহারে নির্দেশনা মাউশির, দেখুন এখানে

নির্দেশিকায় ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টের কনটেন্টের দায় পুরোপুরি সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর ওপর বর্তানো হলেও কোন ধরনের কনটেন্ট শাস্তিযোগ্য হবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই। এছাড়াও কনটেন্ট প্রকাশে উপযুক্ততা নির্ধারণের বিষয়টি কীভাবে হবে, সে সম্পর্কেও নির্দেশিকায় বিস্তারিত ব্যাখ্যা না থাকায় বিভ্রান্তির সুযোগ রয়েছে।

‘ব্যক্তিগত অনুভূতি প্রকাশের সুযোগও কি থাকবে না?’
শিক্ষকদের একটি অংশের মতে, এসব ধারা গঠনমূলক মতামত প্রকাশেও আত্মসংযম বা সংকোচ তৈরি করতে পারে।

প্রাথমিক শিক্ষক দাবি বাস্তবায়ন পরিষদের আহ্বায়ক খায়রুন নাহার লিপি দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, প্রযুক্তির এই যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সৃজনশীলতা প্রকাশের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। সরকারি চাকরিজীবী হিসেবে কিছু আচরণবিধি মানার প্রয়োজনীয়তা থাকলেও ব্যক্তিগত অনুভূতি প্রকাশের সুযোগ সংকুচিত হওয়া উচিত নয়।

তিনি বলেন, ‘নির্দেশনায় ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে ফ্রেন্ড সিলেকশনেও সতর্কতা অবলম্বনের কথা বলা হয়েছে। আমার কাছে বিষয়টি অতিরিক্ত মনে হয়েছে। ব্যক্তিগতভাবে আমি এটিকে একটি কালো আইন বলেই মনে করি।’

এই শিক্ষক নেত্রীর ভাষ্য, নির্দেশিকায় ‘ক্ষতিকর কনটেন্ট’ ও ‘অপব্যবহার’-এর স্পষ্ট সংজ্ঞা না থাকায় যে কোনো পোস্ট সরকারের দৃষ্টিতে ক্ষতিকর হিসেবে ব্যাখ্যা হওয়ার শঙ্কা থেকেই যায়।

বিউটি রাণী পালের ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘সারা দেশের শিক্ষকসমাজ ও সচেতন মানুষ যদি তখন তাঁর পাশে না দাঁড়াতেন, তাহলে তাঁর বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারত। তাই এই ঘটনার পর অনেক শিক্ষকই ফেসবুকে পোস্ট দেওয়া নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন।’

এ প্রসঙ্গে বিউটি রানী পাল দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘তখন এতটা ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম যে থানায় জিডি করতে হয়েছে। যদিও পরে সবার সমর্থন ও আশ্বাসে ভয় কাটাতে পেরেছি। তবে ট্রান্সফার হয়ে চলে যাবো অন্য এলাকায় ‘

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অধিকার নিয়ে মাঠে সরব থাকার পাশাপাশি  ফেসবুকেও নিয়মিত লেখালেখি করেন শিক্ষক নেতা শামসুদ্দিন মাসুদ। তিনি বলেন, ‘এখন ফেসবুকে লিখতে গেলে দুশ্চিন্তা ভর করে। কারণ বিউটি রানীর পক্ষে আমরা যদি সঠিক সময়ে না দাঁড়াতাম তাহলে হয়তো শাস্তি পেয়েও যেতেন তিনি।’

‘নির্দেশিকা আরও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন’
নির্দেশিকার বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. তারিক মনজুর মনে করেন, এটি আরও স্পষ্ট করার পাশাপাশি ব্যাপক প্রচার প্রয়োজন।

তিনি দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, সরকার বা রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়—এমন পোস্ট থেকে বিরত থাকতে বলা হলেও বাস্তবে কোন ধরনের মতামত বা লেখা এ সংজ্ঞার মধ্যে পড়বে, তা সব সময় স্পষ্ট নয়। একইভাবে রাজনৈতিক বক্তব্য, আত্মপ্রচারমূলক পোস্ট বা লিঙ্গবৈষম্যসংক্রান্ত বিতর্কিত বিষয় নিয়েও অনেকের মধ্যে পর্যাপ্ত ধারণা নেই।

তারিক মনজুর বলেন, ব্যক্তিগত ও দাপ্তরিক কাজে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের পার্থক্য বুঝতে হবে এবং উভয় ক্ষেত্রেই দায়িত্বশীল আচরণ জরুরি। তবে সরকারকেও গঠনমূলক সমালোচনাকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংঘবদ্ধভাবে কটূক্তি ও ট্রলের মাধ্যমে ব্যক্তিকে সামাজিক ও পেশাগতভাবে হেয় করার প্রবণতা বেড়েছে। এ ধরনের সাইবার বুলিং ঠেকাতে নির্দেশিকায়ও সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।

‘সবকিছু নির্দেশিকায় বিস্তারিত লেখা বাস্তবসম্মত নয়’

ঢাকা গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) হোমায়রা সাইদ বলেন, নির্দেশনাপত্রটি ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠানো হয়েছে এবং সবাইকে বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে।

তিনি দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘আমার ব্যক্তিগত একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট আছে। তবে স্কুলের কার্যক্রমের জন্য আলাদা একটি ভেরিফায়েড অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ রয়েছে। স্কুলের বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও কার্যক্রমের তথ্য সেখানে প্রকাশ করা হবে। ব্যক্তিগত ফেসবুক অ্যাকাউন্টে এসব বিষয় আপলোড না করাই ভালো।’

তিনি আরও বলেন, ‘নির্দেশিকায় ব্যক্তিগত ফেসবুক ব্যবহারের ক্ষেত্রেও কিছু বিধিনিষেধ রয়েছে। তবে আমি সবসময় সরকারি নিয়মনীতি মেনেই চলার চেষ্টা করি। অন্যরা কীভাবে ফেসবুক ব্যবহার করেন, সে বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারব না। যেহেতু আমরা সরকারি চাকরি করি, তাই সরকারি বিধি-বিধানের মধ্যেই থাকতে হবে। সরকারি নিয়মের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই।’

আরও পড়ুন: ফেসবুকে পোস্ট দেওয়ায় শিক্ষককে শোকজ মাউশির

এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী মনজিল মোরশেদ দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘কোনো একটি ফেসবুক পোস্ট ক্ষতিকর কি না, সেটি সব ক্ষেত্রে সরকার একতরফাভাবে নির্ধারণ করবে—এমনটি নয়। এখন পর্যন্ত শুধু "ক্ষতিকর পোস্ট" করার অভিযোগে কোনো শিক্ষক বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার উদাহরণ নেই। তাই এই মুহূর্তে "ক্ষতিকর" শব্দটির আলাদা সংজ্ঞা দেওয়ার প্রয়োজনীয়তাও নেই।’

তিনি বলেন, ‘শিক্ষকরা নিজ নিজ বিবেচনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করেন। তাই কোনটি সমাজের জন্য ক্ষতিকর আর কোনটি নয়, সেটি তারাও বিচার করতে সক্ষম। সরকার মূলত একটি নির্দেশনা দিয়েছে। কে ঠিক কী লিখতে পারবেন বা পারবেন না, তা বিস্তারিতভাবে নির্দেশিকায় উল্লেখ করা বাস্তবসম্মত নয়।’

‘নৈতিক প্রত্যাশা আর আইনি দায় এক নয়’
জনস্বার্থমূলক মামলা ও নারী-শিশুর অধিকার সুরক্ষায় বিশেষ অবদানের জন্য পরিচিত সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসান এ বিষয়ে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, সরকারি শিক্ষকও প্রথমত একজন নাগরিক। সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তিনি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ভোগ করেন এবং ব্যক্তিগত জীবনে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের অধিকার রাখেন। তাই ব্যক্তিগত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শালীন ও বৈধ কোনো ভিডিও প্রকাশ করলেই তা অসদাচরণ হিসেবে গণ্য হতে পারে না।

তিনি বলেন, প্রশাসনিক নির্দেশিকা প্রয়োগের ক্ষেত্রেও সংবিধান, আইনের শাসন এবং ন্যায়বিচারের নীতি অনুসরণ করতে হবে। কেবল সামাজিক সমালোচনা বা ট্রলের ভিত্তিতে কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ আইনগতভাবে সমর্থনযোগ্য নয়। প্রতিটি ঘটনায় বাস্তব প্রভাব, প্রাসঙ্গিক তথ্য এবং আইনগত ভিত্তি পৃথকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

ইশরাত হাসান আরও বলেন, শিক্ষকরা সমাজের রোল মডেল। তাই তাঁদের কাছ থেকে দায়িত্বশীল আচরণ প্রত্যাশিত। তবে নৈতিক প্রত্যাশা এবং আইনি দায় এক বিষয় নয়। ব্যক্তিগত জীবনের বৈধ ও শালীন কর্মকাণ্ডকে শুধু সামাজিক বিতর্কের কারণে শৃঙ্খলাভঙ্গ হিসেবে বিবেচনা করা হলে তা সাংবিধানিক অধিকার, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর অযৌক্তিক হস্তক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।