০৫ জুন ২০২৬, ২১:৫৮

আদালতের আদেশকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সক্রিয় ‘ফ্রি ফায়ার’, প্রকাশ্যে বসছে বড় বড় আসরও

দেশে প্রকাশ্যেই চলছে ফ্রি ফায়ার গেমের বড় বড় আসর  © টিডিসি সম্পাদিত

তরুণ ও কিশোরদের মারাত্মক আসক্তি, নৈতিক ও সামাজিক অবক্ষয়, অবৈধ আর্থিক লেনদেন ও অর্থ পাচার এবং মানসিক ও সাংস্কৃতিক বিপর্যয়ের কারণ দেখিয়ে বাংলাদেশে নিষিদ্ধ করা হয় অনলাইন গেম ‘ফ্রি ফায়ার’। অথচ চলতি বছরের ২৪ এপ্রিল অনুষ্ঠিত হয়ে গেছে ‘ফ্রি ফায়ার বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ সিজন ২’- এর আসর। আবার এ মাসের ৬ তারিখেই দেশে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল ‘ফ্রি ফায়ার ওয়ার্ল্ড সিরিজ বাংলাদেশ ২০২৬ স্প্রিং’-এর গ্র্যান্ড ফাইনাল। তাদের নিজস্ব ফেসবুক পেজে রীতিমতো প্রচারও করেছিল আয়োজক কর্তৃপক্ষ।

তথ্য বলছে, মানবাধিকার সংগঠন ল অ্যান্ড লাইফ ফাউন্ডেশনের পক্ষে সুপ্রিম কোর্টের দুই আইনজীবীর করা রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে ২০২১ সালের ১৬ আগস্ট বাংলাদেশের হাইকোর্ট ফ্রি ফায়ার গেমটি নিষিদ্ধ করার নির্দেশ দেয়। হাইকোর্টের নির্দেশনার পর একই বছরের ২৫ আগস্ট বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) দেশের সব মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট গেটওয়ে থেকে গেমটি ব্লক করার আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে।

তবে উচ্চ আদালতের স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা ও বিটিআরসির নির্দশনা তোয়াক্কা না করেই বাংলাদেশে উৎসবের আমেজে চলছে নিষিদ্ধ এই অনলাইন গেমটির কার্যক্রম। নৃশংসতা ছড়ানো এবং কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির দায়ে অভিযুক্ত হওয়ার কারণে নিষেধাজ্ঞাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে রাজধানীর বুকে বড় ধরনের ইভেন্ট আয়োজনের তোড়জোড় চলছে। অবশ্য সমালোচনার পর কনভেনশন সেন্টার কর্তৃপক্ষ আয়োজকদের বুকিং বাতিল করে। এতে বাতিল হয় তাদের আসন্ন ইভেন্টটি।

আইসিসিবির নবরাত্রি হলে গ্রান্ড ফাইনালের প্রস্তুতি

অনুসন্ধানে জানা গেছে, আগামীকাল ৬ জুন রাজধানীর ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটি বসুন্ধরার নবরাত্রি হল ৪-এ ফ্রি ফায়ার তাদের ‘অফিসিয়াল ইভেন্ট’ আয়োজনের ঘোষণা দিয়েছিল। গত ২৬ মে গেমটির অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে ঢাকঢোল পিটিয়ে এই ঘোষণা দেওয়া হয়। একটি নিষিদ্ধ গেম কীভাবে প্রশাসনের নাকের ডগায় বসে এমন প্রকাশ্য ইভেন্ট আয়োজন করতে পারে, তা নিয়ে জনমনে এবং সচেতন অভিভাবক মহলে তীব্র ক্ষোভ ও বিস্ময়ের সৃষ্টি হয়। তারা বলছেন, গত বছর এই রকম ইভেন্ট আয়োজনের শেষ পর্যায়ে প্রসাশনের হস্তক্ষেপে বন্ধ করা হলেও আবারো সক্রিয় হয়েছে তারা।

কাগজে-কলমে নিষিদ্ধ, বাস্তবে সক্রিয়
নৃশংসতা ও ভ্যাট-ট্যাক্স ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগে ২০২১ সালে সুপ্রিম কোর্টের রিট পিটিশন (৫৮৮৩/২০২১) অনুযায়ী গেমটি বাংলাদেশে নিষিদ্ধ করা হয়। আদালতে রিট পিটিশন এবং শুনানির সময় গেমটি বন্ধ করার পক্ষে প্রধানত ৪টি বড় কারণ ও যুক্তি দেখানো হয়েছিল। সেগুলো হলো— তরুণ ও কিশোরদের মারাত্মক আসক্তি, নৈতিক ও সামাজিক অবক্ষয়, অবৈধ আর্থিক লেনদেন ও অর্থ পাচার, মানসিক ও সাংস্কৃতিক বিপর্যয়। সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ফ্রি ফায়ার কর্তৃপক্ষের আবেদন আদালত খারিজ করে দেওয়ায় এই নিষেধাজ্ঞা এখনো বহাল রয়েছে। কিন্তু ‘অদৃশ্য শক্তির’ জোরে বাংলাদেশে তাদের কার্যক্রম শুধু চালু নয়, বরং আরও বিস্তৃত করার কার্যক্রম চলমান।

এটি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের জন্ম দেয়। যদি কোনো অ্যাপ, গেম বা সেবা সরকারিভাবে নিষিদ্ধ হয়ে থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া কীভাবে তার নামে প্রকাশ্য অনুষ্ঠান আয়োজন করা হচ্ছে? আইন ও নীতিমালার প্রতি সম্মান নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোরও দায়িত্ব। কোনো নিষিদ্ধ প্ল্যাটফর্ম বা গেমের কার্যক্রম যদি বাস্তবে চলমান থাকে, তাহলে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থার পর্যালোচনা প্রয়োজন— তানভীর হাসান জোহা, সাইবার অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর
 

হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি ও অর্থপাচার
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো গেমটির মাধ্যমে দেশের বিপুল পরিমাণ অর্থ বাইরে চলে যাওয়া। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফ্রি ফায়ারে ‘ডায়মন্ড’ বা ইন-গেম কারেন্সি কেনার নামে প্রতি মাসে বাংলাদেশ থেকে শত শত কোটি টাকা পাচার হয়ে যাচ্ছে। যেহেতু গেমটি নিষিদ্ধ, তাই এর কোনো বৈধ পেমেন্ট গেটওয়ে বা অফিসিয়াল ভ্যাট নিবন্ধন নেই। ফলে সরকার এক টাকাও রাজস্ব পাচ্ছে না। অথচ ব্যবহারকারীদের পকেট থেকে ঠিকই টাকা চলে যাচ্ছে গেমটির বিদেশি ডেভেলপারদের পকেটে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর্মকর্তাদের মতে, বছরে প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সরকার।

গ্রান্ড ফাইনালের আগে গত কয়েকদিন থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ফ্রি ফায়ার গেমের আসর বসেছে


অভিযোগ রয়েছে, ফ্রি ফায়ারের কিছু কর্মকর্তা খোদ বাংলাদেশে অবস্থান করে অবৈধভাবে এই বিশাল নেটওয়ার্ক পরিচালনা করছেন। তারা না দিচ্ছেন ইনকাম ট্যাক্স, না দিচ্ছেন ভ্যাট। অথচ এনবিআর যখন অনলাইন গেমকে ট্যাক্সের আওতায় এনে বিপুল রাজস্ব আয়ের পরিকল্পনা করছে, তখন এই নিষিদ্ধ প্ল্যাটফর্মটি অবৈধ পথে অর্থ হাতিয়ে নিয়ে সরকারের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।

ধ্বংস হচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম
শীর্ষ গবেষণা সাময়িকী সেজ জার্নালসের (Sage Journals) জানুয়ারি-২০২৬ সংখ্যায় প্রকাশিত এক গবেষণাপ্রবন্ধের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৭০ লক্ষ সক্রিয় ফ্রি ফায়ার গেমার রয়েছে। যাদের অধিকাংশই শিশু-কিশোর ও তরুণ। শিক্ষাবিদ ও সমাজবিজ্ঞানীরা একে ‘ডিজিটাল মাদক’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। এর প্রভাবে একদিকে কিশোররা যেমন সহিংসতায় জড়াচ্ছে, অন্যদিকে তাদের অভিভাবকের কষ্টার্জিত টাকা পাচার হয়ে যাচ্ছে বিদেশে। অধিকাংশ শিশু-কিশোরদের স্বাভাবিক বিকাশ ব্যাহত হচ্ছে।

তরুণদের অবিভাবক ও সচেতন ব্যক্তিদের দাবি, আদালত ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধা থাকলে কোনো নিষিদ্ধ প্রতিষ্ঠান এভাবে প্রকাশ্যে অনুষ্ঠান করতে পারে না। এতে প্রশাসনের অবহেলা অবশ্যই রয়েছে। যদি গেমটি পরিচালনা করতেই হয়, তবে তাকে অবশ্যই দেশের প্রচলিত আইন মেনে, যথাযথ ভ্যাট-ট্যাক্স প্রদান করে এবং ক্ষতিকারক দিকগুলো পরিহার করে নীতিমালার আওতায় আসতে হবে। তার আগে এমন ‘অবৈধ’ ইভেন্ট বন্ধ করার জন্য প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপ কামনা করছেন তারা।

গ্রান্ড ফাইনাল উপলক্ষে সারাদেশ থেকে উৎসবস্থলে ছুটে আসেন গেমাররা

এবারের আসরে অংশগ্রহণকারী দলের একজন সদস্য সিয়াম আহমেদ। তিনি বলেন, আমাদের দেশে নিষিদ্ধ হলেও আমরা ভিপিএন ব্যবহার করে খেলার সুযোগ পেয়ে থাকি। অনেক সময় প্রয়োজনীয় ভার্চুয়াল সরঞ্জাম কিনতে গিয়ে প্রতারণারও শিকার হতে হয়। প্রয়োজনীয় আইন প্রয়োগ সাপেক্ষে এই গেমের নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে পরিমিত ব্যবহারের সুযোগ করে দেওয়া উচিত।

উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে এই ইভেন্ট আয়োজন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের জন্ম দেয় বলে মনে করেন সাইবার অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা। দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে তিনি বলেন, প্রথমত, যদি কোনো অ্যাপ, গেম বা সেবা সরকারিভাবে নিষিদ্ধ হয়ে থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া কীভাবে তার নামে প্রকাশ্য অনুষ্ঠান আয়োজন করা হচ্ছে? দ্বিতীয়ত, অনুষ্ঠান আয়োজক, ভেন্যু কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক সংস্থাগুলো কি বিষয়টি যাচাই করেছে? তৃতীয়ত, আইন ও নীতিমালার প্রতি সম্মান নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোরও দায়িত্ব। কোনো নিষিদ্ধ প্ল্যাটফর্ম বা গেমের কার্যক্রম যদি বাস্তবে চলমান থাকে, তাহলে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থার পর্যালোচনা প্রয়োজন।

আরও পড়ুন: বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় ইতিহাস গড়লেন বাংলাদেশের ৬ শিক্ষার্থী

তিনি আরও বলেন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি দ্রুত যাচাই করবে এবং যদি কোনো আইন বা সরকারি সিদ্ধান্তের ব্যত্যয় ঘটে থাকে, তাহলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। একইসঙ্গে যদি তথ্যটি ভুল বা বিভ্রান্তিকর হয়ে থাকে, তবে সে বিষয়েও স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া উচিত।

জানতে চাইলে ডিএমপির খিলক্ষেত থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সোহরাব আল হোসাইন বলেন, ইতোমধ্যে কনভেনশন সেন্টার কর্তৃপক্ষ তাদের বুকিং বাতিল করেছে। তাদের ইভেন্টও বাতিল হয়েছে। পরবর্তীতে প্রচলিত আইন অনুসারে এ বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

আরও পড়ুন: মেয়েদের ছবি ও নাম দিয়ে ফেসবুকে ভুয়া আইডি থাকলে করণীয় কী, প্রতিকার পাবেন কোথায়?

সার্বিক বিষয়ে জানতে বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশনের (বিটিআরসি) কমিশনার (ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড অপারেশন্স বিভাগ) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইকবাল আহমেদ, চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. এমদাদ উল বারী ও কমিশন সচিব মোহাম্মদ আনোয়ার হোসাইনের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি।