২৭ ঘণ্টা ধরে মর্গে লাশ আটকে ‘ঘুষ’ চাইছেন পুলিশ কর্মকর্তা!
চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত মো. রাসেল (৩৬)-এর মরদেহ প্রায় ২৭ ঘণ্টা ধরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (চমেক) মর্গে আটকে রেখে ‘ঘুষ’ চাওয়ার অভিযোগ উঠেছে কর্ণফুলী থানার এক পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।
পরিবারের দাবি, বিনা পোস্টমর্টেমে লাশ হস্তান্তরের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট ওই কর্মকর্তা নানা অজুহাতে গড়িমসি করেন এবং আর্থিক সুবিধা দাবি করেন। যদিও অভিযুক্ত এসআই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
পুলিশ ও পারিবারিক সূত্র জানায়, শুক্রবার (২০ ফেব্রুয়ারি) দুপুর ১২টা ১০ মিনিটের দিকে কর্ণফুলীর ২ নম্বর বড়উঠান শাহমীরপুর ফকিন্নীরহাট বাজারের দক্ষিণ পাশে পিএবি সড়ক হাইওয়েতে রাস্তা পার হওয়ার সময় অজ্ঞাত একটি গাড়ির ধাক্কায় গুরুতর আহত হন রাসেল।
স্থানীয়রা তাকে দ্রুত চমেক হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক দুপুর ১টা ৪৯ মিনিটে মৃত ঘোষণা করেন। মৃত্যুসনদে উল্লেখ করা হয়—‘Brought in Dead (Head Injury RTA)’।
নিহত রাসেল পটিয়ার ঠাকুরবাড়ি এলাকার আবুল কালামের ছেলে। তিনি এক বছর আগে বিয়ে করেন; তার স্ত্রী বর্তমানে সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা। কর্ণফুলীর বড়উঠান এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতেন তিনি। ঘটনার পর কর্ণফুলী থানার একটি টিম লাশের সুরতহাল করে মর্গে পাঠায়।
আরও পড়ুন : এক মণ দুধ দিয়ে গোসল করে জুয়া ছাড়ার ঘোষণা যুবকের
পরিবার জানায়, তারা কোনো মামলা করতে চান না এবং লিখিতভাবে বিনা পোস্টমর্টেমে লাশ হস্তান্তরের আবেদন করেন। পরিবারের সদস্য ও এক আত্মীয় ও অবসরপ্রাপ্ত নৌবাহিনীর কর্মকর্তা থানায় গিয়ে ওসির সঙ্গে কথা বলেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, ওসি মো. শাহীনূর আলম ও অপারেশন অফিসার এসআই নুরুল ইসলাম মৌখিকভাবে নির্দেশ দেন, পরিবারের আপত্তি না থাকলে প্রয়োজনীয় স্বাক্ষর নিয়ে লাশ হস্তান্তর করা যেতে পারে।
তবে পরিবারের অভিযোগ, দায়িত্বপ্রাপ্ত এসআই (সাব ইন্সপেক্টর) মো. মিজানুর রহমান পোস্টমর্টেম ছাড়া লাশ দিতে অস্বীকৃতি জানান। নিহতের সাবেক স্ত্রী থাকতে পারে—এমন যুক্তি তুলে ধরে তিনি সময়ক্ষেপণ করেন।
পরিবারের দাবি, প্রথমে ৫০ হাজার, পরে ১০ হাজার টাকা দাবি করা হয়। টাকা না দেওয়ায় লাশ আটকে রাখা হয়। শেষ পর্যন্ত পোস্টমর্টেম করতে গিয়ে মর্গ-সংক্রান্ত আনুষঙ্গিক খরচ বাবদ আরও ৮ টাকা গুনতে হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন স্বজনরা।
আরও পড়ুন : কুষ্টিয়ায় ট্রাক-অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষ, নিহত ৫
নিহতের আত্মীয় মোহাম্মদ হেলাল বলেন, ‘ওসি ও অপারেশন অফিসার লাশ দিতে বলার পরও এসআই দেননি। আচরণ ছিল অপেশাদার। অযৌক্তিকভাবে টাকা দাবি করা হয়েছে।’
নিহতের বাবা আবুল কালাম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘ছেলের লাশ নিয়ে আমরা প্রায় ২৭ ঘণ্টা ধরে দৌড়ঝাঁপ করেছি।’
অভিযোগ অস্বীকার করে এসআই মিজানুর রহমান বলেন, ‘ওসি স্যার আমাকে সরাসরি লাশ দিতে বলেননি। বলেছেন, সম্ভাব্য দুই স্ত্রী থাকলে তাদের এনে স্বাক্ষর নিতে। যেহেতু তা হয়নি, তাই আইনগত প্রক্রিয়ায় পোস্টমর্টেম করা হয়েছে।’
অপারেশন অফিসার এসআই নুরুল ইসলাম বলেন, ‘পরিবার মামলা করবে না, জানালে আমরা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে লাশ হস্তান্তরের কথা বলেছি। কেন দেওয়া হয়নি, তা খতিয়ে দেখবে ওসি।’
ওসি শাহীনূর আলমও বলেন, ‘পরিবারের আপত্তি না থাকলে দ্রুত লাশ দেওয়ার নির্দেশ ছিল। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখব।’
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু হলে সাধারণত Code of Criminal Procedure-এর ১৭৪ ধারায় অপমৃত্যু মামলা রুজু হয়। সন্দেহজনক কিছু না থাকলে, এবং পরিবার লিখিতভাবে আপত্তি জানালে, তদন্ত কর্মকর্তার বিবেচনায় বিনা পোস্টমর্টেমে লাশ হস্তান্তরের সুযোগ রয়েছে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পুলিশের ওপর নির্ভরশীল।