২৭ আগস্ট ২০২৬, ২২:২৩

প্রায় ১৫ হাজার গাছের চারা রোপণ করেছেন জোবায়ের অপু

রোপণকৃত গাছের সঙ্গে জোবায়ের আহম্মেদ খান অপু  © সৌজন্যে প্রাপ্ত

ছোটবেলায় বাড়ির আঙিনায় নানাকে গাছের চারা রোপণ করতে দেখে প্রথমে উৎসাহ, এরপর সান্নিধ্যে আসেন আরেক বৃক্ষপ্রেমির। ২০০৮ সাল থেকে শুরু করেন বৃক্ষ রোপণের নিরন্তর অভিযান। যেখানেই যান, সঙ্গে নিয়ে যান গাছের চারা। নিজে রোপণ করেন, উপহার দেন—আর ধরিত্রীকে সাজিয়ে তোলেন সবুজ সামিয়ানায়।

গল্পটি টাঙ্গাইলের ঘাটাইলের ছেলে জোবায়ের আহম্মেদ খান অপুর। পেশায় একজন সরকারি কর্মচারী, চাকরি করেন আইন মন্ত্রণালয়ে। থাকেন ঢাকায়। তবে ছুটির দিন হলেই গাছের চারা নিয়ে তা রোপণের জন্য বেরিয়ে পড়েন দিক থেকে দিগন্তরে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, রাস্তার ধারে, পার্ক কিংবা আত্মীয়ের বাড়ির আঙিনা—যেখানে জায়গা পান সেখানেই তিনি গাছের চারা রোপণ করেন। এ পর্যন্ত তিনি রোপণ করেছেন প্রায় ১৫ হাজার বিভিন্ন প্রজাতির গাছের চারা।

জোবায়ের আহম্মেদ খান অপু ঘাটাইলের মৃত মোখলেছুর রহমান খান ও মোছা. জুয়েনা বেগম দম্পতির ছেলে। তিনি পাঁচ সন্তানের মধ্যে দ্বিতীয়। সুনামগঞ্জ জেলার ধর্মপাশা উপজেলার ১ নং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক ও জনতা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিকের পর উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করেছেন টাঙ্গাইলের সরকারি ঘাটাইল ব্রাহ্মণশাসন কলেজ থেকে। এরপর সরকারি সা’দত বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে থেকে হিসাববিজ্ঞানে স্নাতক (সম্মান) ও মাস্টার্স পাস করেছেন এই বৃক্ষপ্রেমি। ছাত্রজীবন থেকেই জড়িত ছিলেন বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী, মানবাধিকার ও সামাজিক সংগঠনের সাথে। এরপর সাংবাদিকতাও করেছেন বেশ কিছুদিন।

যেভাবে বৃক্ষপ্রেমে
জোবায়ের অপু দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে জানান, ছোট বেলায় নানা আব্দুল হামিদ পুরকায়স্থকে বাড়ির আঙিনায় বিভিন্ন প্রজাতির গাছের চারা রোপণ করতে দেখেই গাছের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয় তার। এরপর উচ্চ মাধ্যমিকে পড়ার সময় পরিচয় হয় চাষা আব্দুল আজিজ কম্পানির সঙ্গে। প্রতি পহেলা বৈশাখে আব্দুল আজিজ নিজ বাড়ি গারোবাজারে আয়োজন করে বিনামূল্যে গাছ বিতরণ করতেন। সেখানে যত মানুষই আসতেন, সবাইকে একটি করে চারা দিতেন তিনি। এই দৃশ্যই বৃক্ষরোপণে আরও উৎসাহিত করে তোলে অপুকে।

ঢাকার ৩০০ ফিটে জোবায়ের অপুর রোপণ করা গাছ

তিনি আরও জানান, ২০০৮ সালে অনার্সের শিক্ষার্থী থাকাকালে কলেজে স্বেচ্ছায় রক্তদানকারী সংগঠন বাঁধনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। ওই সময় সংগঠনটির রক্তদাতাদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের একটি করে গাছের চারা উপহার দিয়েছিলেন তিনি। এই চারা সংগ্রহ করেছিলেন চাষা আব্দুল আজিজের কাছ থেকে।

আরও পড়ুন: প্রেসক্রিপশন লিখতে সময় লাগবে মাত্র ৩০ সেকেন্ড, এআইভিত্তিক চেম্বার অপারেটিং সিস্টেম তৈরি করলেন মেডিকেল শিক্ষার্থী

সেই চারা বিতরণ থেকে শুরু হয় জোবায়ের অপুর সবুজায়নের এই অভিযান। তিনি বলেন, ‘এরপর নিজেই গাছের চারা রোপণ কার্যক্রম শুরু করি। উদ্যোগের শুরু টাঙ্গাইলের সরকারি সা’দত বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ ও সন্তোষে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে কয়েকটি ফলদ গাছের চারা রোপণের মধ্য দিয়ে। যা এখনো চলমান রয়েছে।’

জোবায়েরের অপু জনান, হাতে কিছু টাকা থাকলেই তা দিয়েই তিনি বিভিন্ন জায়গা থেকে চারা সংগ্রহ করেন। আর ছুটির দিন হলেই ক্রয়কৃত গাছের চারা হাতে নিয়ে বেরিয়ে পরেন তা রোপণের জন্য।

আমি যখন প্রথম শ্বশুরবাড়িতে গেলাম, দেখলাম যে শ্বশুরের ফাঁকা জায়গা অনেক আছে। সেখানে গাছ লাগানো শুরু করলাম। ওই দিনই আমি প্রথম লিচু গাছ রোপণ করেছিলাম। আমার টার্গেটটা ছিল এরকম—আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম যেন কোনো ধরণের কীটনাশকমুক্ত ফল খায়। আমি যতবারই যাই, সেটা শীতের সিজন হলেও আমি গাছ লাগাই— জোবায়ের আহম্মেদ খান অপু

গাছের চারা কেনার জন্য নিজের আয়ের একটি অংশ খরচ হয় অপুর। নিজেও চারা উৎপাদন করেন। এ কাজে পরিবারের সদস্যরাও তাকে উৎসাহ দেন। তার ছোট তিন ভাইয়ের মধ্যে ফোজায়েল আহাম্মেদ খান একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ‘স্টুডিও ঢাকা’র  প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, তোফায়েল আহমেদ খান মাল্টিমুড গ্রুপের সহকরী ম্যানেজার এবং মাহদী হাসান খান এসিআইয়ের সহকারী ম্যানেজার—তারাও নিয়মিতভাবে জোবায়ের অপুকে গাছ রোপণের কাজে আর্থিক সহায়তা করেন। এ ছাড়া সহায়তা পান বন্ধুদের কাছ থেকেও।

ভাইদের সহযোগিতার বিষয়ে জোবায়ের অপু বলেন, ওরা আমাকে ভীষণভাবে হেল্প করে। আমার কাছেই ওদের ব্যাংকের কার্ড দিয়ে রেখেছে। আমি বড়, এজন্য যদি টাকা চাই তাইলে লজ্জা বোধ করে। তাই বলছিল যে, ‘দাদা যখন লাগে তুমি উঠি খরচ করো।’ কোনোদিন জানতে চায়নি যে আমি কোথায় খরচ করলাম। প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে তারা আমাকে যথেষ্ট সহযোগিতা করে।

জোবায়ের অপু এ পর্যন্ত প্রায় ১৫ হাজার গাছ রোপণ করেছেন

জোবায়ের অপুর বৃক্ষ রোপণের এই ঘটনা কোনো একক স্থানের নয়। নয় কোনো একক ধরনের গাছও। ফলদ, বনজ, ঔষধী কিংবা শোভাবর্ধনকারী—সব ধরনের গাছই তিনি রোপণ করেন।

জানা গেছে, রাজধানী ঢাকা, নিজ জেলা টাঙ্গাইলসহ দেশের যে প্রান্তেই তিনি গিয়েছেন, সেখানেই বয়ে নিয়ে গেছেন এই শখ। এর মধ্যে নিজ জন্মস্থান ঘাটাইল উপজেলার পঞ্চাশটির অধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন মসজিদ-মন্দিরে গাছের চারা রোপন করেছেন তিনি।

তার বৃক্ষ রোপণে এই নিরন্তর পথচলার সাক্ষ্য দিলেন ঘাটাইল উপজেলা সদরের উইজডম ভ্যালি স্কুলের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ কামাল হোসেন। তিনি বলেন, জোবায়ের অপু বাড়ি আসলেই স্কুলে রোপণের জন্য বিভিন্ন প্রজাতির গাছ নিয়ে আসেন। ইতিমধ্যে আমাদের বিদ্যালয়ে নাগলিঙ্গম, কনকচাঁপা, উদাল, পলাশসহ বিভিন্ন দুর্লভ প্রজাতির গাছ লাগিয়েছেন। গাছগুলো এখন বড় হয়েছে। শিক্ষার্থীরা এসব গাছের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।

তিনি বলেন, গত মাসেও অপু আমাদের বিদ্যালয়ের মাধ্যমিক শাখায় রোপণের জন্য বেশ কিছু গাছ সংগ্রহ করে দিয়ে গেছেন।

এ ছাড়া গাজীপুর, রংপুর, ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকা, দিনাজপুর, সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলার বিভিন্ন উপজেলায় সড়ক, মহাসড়ক, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও রেললাইনের পাশে তালবীজসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছের চারা রোপণ করেছেন। ঢাকার দৃষ্টিনন্দন ৩০০ ফিট সড়কের পাশে শিমুল, জারুল, নিম, হরিতকী, বহেরা, আম, জাম, কাঁঠাল, ডেউয়া, স্বর্ণচাঁপা, কদম, আমড়া, আমলকি, ছাতিম, কানাইডিঙ্গা, অর্জুনসহ বিভিন্ন জাতের দেড় হাজারের বেশি গাছের চারা রোপণ করেছেন।

যেখানেই যান, গাছের চারা সঙ্গে নিয়ে যান জোবায়ের অপু

জোবায়ের অপু ২০১৬ সালে দিনাজপুরে বিয়ে করেন। এর পর থেকেই ঢাকা-দিনাজপুর মহাসড়কের রামডুবি এবং দশমাইল ভূষিরবন্দর এলাকার রাস্তার দুইপাশে ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে গাছের চারা রোপণ করা শুরু হয়। এখনও শ্বশুরবাড়িতে যাওয়া-আসার সময় তার এই কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

তিনি জানান, দিনাজপুর-রংপুর মহাসড়কের রামডুবি এলাকায় সড়কের দুই পাশে দুই শতাধিক পলাশ, কাঞ্চন, শিমুল ও ছাতিমের চারা লাগিয়েছেন। রামডুবি-বীরগাঁও আঞ্চলিক সড়কের দুই পাশে লাগিয়েছেন দুই শতাধিক আমগাছ। চিরিরবন্দর উপজেলার বিভিন্ন সড়কের পাশে রোপণ করেছেন আরও তিন শতাধিক ফল ও ফুলের গাছ।

ওরা আমাকে ভীষণভাবে হেল্প করে। আমার কাছেই ওদের ব্যাংকের কার্ড দিয়ে রেখেছে। আমি বড়, এজন্য যদি টাকা চাই তাইলে লজ্জা বোধ করে। তাই বলছিল যে, ‘দাদা যখন লাগে তুমি উঠি খরচ করো।’ কোনোদিন জানতে চায়নি যে আমি কোথায় খরচ করলাম। প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে তারা আমাকে যথেষ্ট সহযোগিতা করে— জোবায়ের আহম্মেদ খান অপু

মামাবাড়ি সুনামগঞ্জে হওয়ার সুবাদে ছোটবেলা থেকেই সিলেট ও সুনামগঞ্জ অঞ্চলে যাতায়াত রয়েছে অপুর। কয়েক বছরে তিনি সিলেটের শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতাল, আদালত চত্বর, আলিয়া মাদ্রাসা ও দলদলি চা-বাগান এলাকায় পাঁচ শতাধিক গাছের চারা রোপণ করেছেন। ছাতক উপশহর এলাকায় লাগিয়েছেন দুই শতাধিক শিমুলের চারা। গাছ চারা লাগানোর পাশাপাশি জয়দেবপুর-টাঙ্গাইল রেলপথের পাশে গত ছয় বছরে প্রায় ছয় হাজার তালের বীজ রোপণ করেছেন। ওইসব তাল বীজ থেকে রেলপথের বিভিন্ন জায়গায় এখন তালগাছের চারা গজিয়ে দৃশমান হয়েছে। গত ২৬ জুন বাবার প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী উপলেক্ষে মধুপুর পীরগাঁছা বর্মণ পাড়ায় চল্লিশটি পরিবারের বাড়িতে আশিটি ফলের গাছও লাগান তিনি।

আরও পড়ুন: রাজধানীতে সরকারি পিআইসিইউ মাত্র ৪৩, হাসপাতালে হাসপাতালে ঘুরে ঝরছে শিশুর প্রাণ

জোবায়ের আহম্মেদ খান অপু দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, আমি যখন প্রথম শ্বশুরবাড়িতে গেলাম, দেখলাম যে শ্বশুরের ফাঁকা জায়গা অনেক আছে। সেখানে গাছ লাগানো শুরু করলাম। ওই দিনই আমি প্রথম লিচু গাছ রোপণ করেছিলাম। আমার টার্গেটটা ছিল এরকম—আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম যেন কোনো ধরণের কীটনাশকমুক্ত ফল খায়। আমি যতবারই যাই, সেটা শীতের সিজন হলেও আমি গাছ লাগাই।

জোবায়ের অপু বাড়ি আসলেই স্কুলে রোপণের জন্য বিভিন্ন প্রজাতির গাছ নিয়ে আসেন। ইতিমধ্যে আমাদের বিদ্যালয়ে নাগলিঙ্গম, কনকচাঁপা, উদাল, পলাশসহ বিভিন্ন দুর্লভ প্রজাতির গাছ লাগিয়েছেন। গাছগুলো এখন বড় হয়েছে। শিক্ষার্থীরা এসব গাছের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে— মোহাম্মদ কামাল হোসেন, প্রধান শিক্ষক, উইজডম ভ্যালি স্কুল, ঘাটাইল, টাঙ্গাইল

তবে শুধু বৃক্ষরোপণেই দায়িত্ব শেষ নয়, এরপর প্রয়োজন আছে পরিচর্যার। এজন্য জোবায়ের অপু লক্ষ্য রাখেন চারাটি যেন পরিচর্যার উপযোগী কোথাও রোপণ করা হয়। তিনি বলেন, এটার যত্ন নিতে পারবে, এরকম লোক আগে দেখি। রাস্তার ধারেই লাগালাম, কিন্তু এর পাশে একটা দোকান আছে, চায়ের দোকান আছে বা পাশে হয়তোবা একটা ডিসপেনসারি—এখানে গাছ হলে উনি এটা পরিচর্যা করবেন। বিষয়টার ওরকম না যে ফাঁকা মাঠে গেলাম আর রোপণ করে দিলাম, চলে আসলাম।

কথাপ্রসঙ্গে নিজের স্বপ্নের কথা জানালেন জোবায়ের অপু। বললেন, আমার একটা চাওয়া হলো যে সরকার যদি প্রত্যেক উপজেলায় একটা উদ্যান করে দিতে পারে, ওই উদ্যানের ভিতরে বাংলাদেশের যত প্রকার বৃক্ষ আছে ওইখানে থাকবে। তাইলে মানুষ এই গাছগুলো চিনবে। এ ছাড়া প্রত্যেক জেলাতেই তো কলেজ আছে, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ আছে—তাদেরও বৃক্ষ পরিচিতির একটা বিষয় আছে। এই উদ্যান ওখানে বোটানিক্যাল গার্ডেন হিসাবে কাজ করত।