২৪ জুলাই ২০২৬, ১৬:১৫

‘আমি দুঃখিত, কিন্তু আমি কথা বলতে পারছি না’: ভারতের ককরোচ পার্টির নায়ক সোনম ওয়াংচুক

ভারতের ককরোচ পার্টির নায়ক সোনম ওয়াংচুক  © সংগৃহীত

ভারতের দিল্লিতে সরকারবিরোধী বিক্ষোভের অন্যতম মুখ জলবায়ু কর্মী ও প্রকৌশলী সোনম ওয়াংচুক অনশনের ১৯তম দিনে শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছেন। দীর্ঘদিন খাবার গ্রহণ না করায় তার শরীর ভেঙে পড়েছে। চিকিৎসকদের নজরদারিতে থাকা ওয়াংচুক জানিয়েছেন, তিনি এখন বেশি কথা বলার অবস্থায় নেই।

দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনশনের ১৮তম দিনের সন্ধ্যায় ওয়াংচুককে মঞ্চে অত্যন্ত দুর্বল অবস্থায় দেখা যায়। পাশে বসা একজন ফিজিওথেরাপিস্ট তার ব্যথাযুক্ত অস্থিসন্ধিতে মালিশ করছিলেন। বালিশ ও কোলবালিশে হেলান দিয়ে তিনি ফিসফিস করে বলেন, ‘আমি দুঃখিত, কিন্তু আমি কথা বলতে পারছি না।’

বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) অনশনের ১৯তম দিনে একটি ভারতীয় আদালত কর্তৃপক্ষকে ওয়াংচুকের শারীরিক অবস্থার ওপর নজর রাখার নির্দেশ দিয়েছে।

দীর্ঘ অনশনের কারণে ওয়াংচুকের ওজন প্রায় ৯ কেজি কমে গেছে। চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘ সময় খাবার না খেলে শরীর তীব্র অনাহারের অবস্থায় চলে যায়। তখন শরীরের চর্বি ও পেশি ভাঙতে শুরু করে, যার ফলে চরম দুর্বলতা, মস্তিষ্কের কার্যকারিতা কমে যাওয়া এবং ইলেক্ট্রোলাইটের ভারসাম্যহীনতা দেখা দিতে পারে।

শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে অনশন
লাদাখের পরিবেশ ও জলবায়ু আন্দোলনের জন্য পরিচিত ওয়াংচুক বর্তমানে দিল্লির যন্তর মন্তরে অবস্থান করছেন। প্রচণ্ড গরম ও আর্দ্রতার মধ্যেও তিনি অনশন চালিয়ে যাচ্ছেন। ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) নামে পরিচিত একটি আন্দোলনের প্রধান মুখ হয়ে উঠেছেন তিনি। আন্দোলনকারীদের দাবি, ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার এবং শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ।

এই আন্দোলনের পেছনে রয়েছে মেডিকেল কলেজে ভর্তির জন্য দেশব্যাপী গুরুত্বপূর্ণ একটি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা। মে মাসের শুরুতে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে পরীক্ষাটি বাতিল করা হলে প্রায় ২০ লাখ শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ঘটনায় হতাশ হয়ে প্রায় এক ডজন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

আরও পড়ুন : নতুন ফোন হাতে পেয়েই যে কাজগুলো করবেন

তেলাপোকা মন্তব্য থেকে আন্দোলনের শুরু
৩০ বছর বয়সী অভিজিৎ দীপ ১৬ মে ককরোচ জনতা পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন। ভারতের প্রধান বিচারপতি কিছু বেকার যুবককে তেলাপোকা হিসেবে উল্লেখ করার পর তিনি সেই শব্দটিকেই আন্দোলনের পরিচয় হিসেবে গ্রহণ করেন এবং অন্যদেরও এতে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানান।

পরবর্তীতে শিক্ষা ব্যবস্থা ও তরুণদের কর্মসংস্থান সংকট নিয়ে আন্দোলনটি দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ৬ জুন থেকে সিজেপি ও এর সমর্থকেরা দিল্লির যন্তর মন্তরে অবস্থান করছেন। সারা ভারত থেকে শিক্ষার্থী, অভিভাবক, প্রবীণ নাগরিক, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকর্মী, শিক্ষাবিদসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এই আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন।

আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, ভারতের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে। অনেক শিক্ষার্থীকে দিনে ১০ থেকে ১৪ ঘণ্টা পড়াশোনা করতে হচ্ছে, অথচ মাত্র তিন ঘণ্টার একটি পরীক্ষাই তাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করছে।

সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ না হওয়ায় ক্ষোভ
বিক্ষোভকারীদের দাবি, নরেন্দ্র মোদি সরকারের পক্ষ থেকে এখনো তাদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করা হয়নি।

সিজেপির জাতীয় মুখপাত্র আশুতোষ রাঙ্কা বলেন, ‘ওরা আমাদের সঙ্গে কথা বলবে না কেন? ওরা কি জানে না যে ওরা এই দেশের সেবক এবং জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য?’

বিরোধী দলের তরুণ নেতা অনীশ গাওয়ান্দিও সরকারের নীরবতার সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘মন্ত্রীরা যন্তর মন্তর থেকে ১০০ মিটার দূরে বসে এই কণ্ঠস্বরগুলোকে উপেক্ষা করছেন। একটি কার্যকর গণতন্ত্রে সরকার তার জনগণ ও তাদের আকাঙ্ক্ষার কথা শোনে।’

আগেও গ্রেপ্তার হয়েছিলেন ওয়াংচুক
সরকারের কাছে ওয়াংচুক অপরিচিত নন। গত বছর সরকারবিরোধী বিক্ষোভে উসকানি দেওয়ার অভিযোগে তাকে লাদাখে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। প্রায় ১৭০ দিন কারাবন্দি থাকার পর সরকার অভিযোগ প্রত্যাহার করে তাকে মুক্তি দেয়।

সরকারের অবস্থানে হতাশ হয়ে ২৮ জুন ওয়াংচুক যন্তর মন্তরের বিক্ষোভে যোগ দেন এবং অনির্দিষ্টকালের জন্য অনশন শুরু করেন। তার অনুপ্রেরণায় আরও কয়েকজন বিক্ষোভকারী অনশনে যোগ দিয়েছেন। তাদের মধ্যে একজনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

শারীরিক অবস্থা নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
বর্তমানে ওয়াংচুকের শারীরিক অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি সহায়তা ছাড়া প্রায় ৩০ মিটার দূরের শৌচাগারেও যেতে পারছেন না। শক্তি বাঁচাতে তিনি খুব কম কথা বলছেন। সরকারের পাঠানো দুই চিকিৎসক এবং স্বেচ্ছাসেবী চিকিৎসকেরা নিয়মিত তার হৃদ্‌যন্ত্র, কিডনি ও যকৃতের কার্যক্রম পরীক্ষা করছেন।

আরও পড়ুন : ১২ প্রতিষ্ঠানে নতুন চেয়ারম্যান দিল সরকার

স্বেচ্ছাসেবী চিকিৎসক নিতিন দিঘে জানান, ওয়াংচুক অনশনের সময় একটির বেশি পাখা ব্যবহার করতে রাজি হননি। তার যুক্তি ছিল, ‘অন্য সবাইও গরমে কষ্ট পাচ্ছে।’

অনশন ভাঙার আহ্বান
সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন মহল থেকে ওয়াংচুককে অনশন ভাঙার আহ্বান জানানো হয়েছে। কংগ্রেস নেতা শশী থারুর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘জাতির বিবেককে জাগিয়ে তোলার জন্য ওয়াংচুক ইতোমধ্যেই যথেষ্ট করেছেন।’

এদিকে, ১ হাজার ৮০০-এর বেশি বিশিষ্ট ব্যক্তি একটি চিঠিতে ওয়াংচুককে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তারা বলেন, এই আন্দোলন একটি দীর্ঘ পথের লড়াই, তাই তার শক্তি ও নেতৃত্ব প্রয়োজন।

চিকিৎসাজনিত কারণে ওয়াংচুকের অবস্থা গুরুতর হলে সরকার তাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে। বুধবার রাতেও যন্তর মন্তরে তাকে দেখতে মানুষের ভিড় ছিল। শারীরিক দুর্বলতার কারণে বেশি কথা বলতে না পারলেও তিনি সমর্থকদের সোমবারের সমাবেশে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান। তথ্যসূত্র: দ্য গার্ডিয়ান।