নক্ষত্রের মাঝের শূন্যস্থানে চিনির সন্ধান পেলেন বিজ্ঞানীরা
মহাকাশে নতুন এক ধরনের চিনির সন্ধান পেয়েছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। পৃথিবীতে রাস্পবেরি ও সেলফ-ট্যানিং লোশনে ব্যবহৃত এরিথ্রুলোজ নামের এই চিনি পাওয়া গেছে নক্ষত্রগুলোর মধ্যবর্তী বিশাল শূন্যস্থানে থাকা গ্যাস ও ধূলিকণার মেঘে। বিজ্ঞানীদের ধারণা, এই আবিষ্কার মহাবিশ্বে প্রাণের উৎপত্তি নিয়ে গবেষণায় নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে।
আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্প্যানিশ গবেষকরা আকাশগঙ্গা ছায়াপথের কেন্দ্রের কাছাকাছি একটি বিশাল গ্যাস মেঘ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে এই চিনির অস্তিত্ব শনাক্ত করেছেন। তারা স্পেনের দুটি ডিশ আকৃতির রেডিও টেলিস্কোপ ব্যবহার করেন এবং টেলিস্কোপ থেকে পাওয়া সংকেত পরীক্ষাগারে সংরক্ষিত নমুনার সঙ্গে মিলিয়ে দেখেন।
গবেষকরা জানান, এরিথ্রুলোজ পাওয়া গেছে আন্তঃনাক্ষত্রিক মাধ্যমে। অর্থাৎ নক্ষত্রগুলোর মাঝখানে ছড়িয়ে থাকা গ্যাস ও ধূলিকণার পাতলা মেঘের মধ্যে এই চিনির উপস্থিতি রয়েছে। এটি এখন পর্যন্ত মহাকাশে শনাক্ত হওয়া অন্যতম জটিল চিনির অণু।
চিনি শুধু খাবারের স্বাদ বাড়ানোর উপাদান নয়, জীববিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বিভিন্ন ধরনের চিনি জীবকোষকে শক্তি দেয় এবং ডিএনএ তৈরির মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়। তাই মহাকাশে কীভাবে এসব জৈব অণু তৈরি হয়, তা জানতে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করছেন বিজ্ঞানীরা।
গবেষণার ফলাফল সোমবার (১৩ জুলাই) নেচার অ্যাস্ট্রোনমি জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। বিজ্ঞানীরা এর আগে আকাশগঙ্গা ছায়াপথের কেন্দ্রের কাছে চিনির মতো কিছু জৈব অণুর সন্ধান পেয়েছিলেন। এছাড়া নাসার ওসাইরিস-রেক্স মহাকাশযানের মাধ্যমে গ্রহাণু বেনু থেকে আনা নমুনাতেও ডিএনএর গুরুত্বপূর্ণ উপাদানসহ বিভিন্ন ধরনের চিনি পাওয়া গেছে।
তবে সর্বশেষ আবিষ্কৃত এরিথ্রুলোজ সরাসরি জীবনের জন্য অপরিহার্য নয়। কিন্তু এটি এমন কিছু জৈব যৌগে রূপান্তরিত হতে পারে, যেগুলো পৃথিবীতে প্রাণের সূচনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল বলে বিজ্ঞানীদের ধারণা।
অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতিঃপদার্থবিদ এরিকা হ্যামডেন বলেন, নতুন এই আবিষ্কার ছায়াপথে ছড়িয়ে থাকা রাসায়নিক উপাদানের একটি চমৎকার উদাহরণ। তার মতে, এটি দেখায় যে মহাকাশে প্রাণের জন্য প্রয়োজনীয় উপাদানগুলো কতটা বিস্তৃতভাবে ছড়িয়ে থাকতে পারে।
আরও পড়ুন : শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে কর্মসূচি ঘোষণা
এই গবেষণার মূল লক্ষ্য হলো পৃথিবীতে প্রাণের সূচনা কীভাবে হয়েছিল, তা বোঝা। বিজ্ঞানীরা জানতে চান জীবনের প্রয়োজনীয় উপাদানগুলো কি ধূমকেতু বা গ্রহাণুর মাধ্যমে পৃথিবীতে এসেছিল, নাকি সৌরজগত তৈরির আগেই মহাকাশে এসব উপাদান উপস্থিত ছিল।
স্পেনের সেন্টার ফর অ্যাস্ট্রোবায়োলজির জ্যোতিঃপদার্থবিদ ও গবেষণার অন্যতম লেখক ইজাসকুন জিমেনেজ-সেরা বলেন, ‘একটি নির্দিষ্ট স্থানে এই ধরনের চিনির সন্ধান পাওয়া থেকে ধারণা করা যায়, ছায়াপথের অন্য অঞ্চলগুলোতেও এমন গুরুত্বপূর্ণ উপাদান লুকিয়ে থাকতে পারে। প্রাণের উৎপত্তির জন্য প্রয়োজনীয় উপাদানগুলো ছায়াপথের অন্যান্য অংশেও থাকতে পারে, যা মহাবিশ্বের অন্য কোথাও প্রাণের বিকাশের সম্ভাবনার বিষয়টি সামনে আনে।’
বিজ্ঞানীরা এখন মহাকাশের আরও বিভিন্ন অঞ্চলে এ ধরনের চিনির সন্ধান এবং এগুলো কীভাবে পরিবর্তিত হয়ে আরও জটিল জৈব অণু তৈরি করে, তা নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যেতে চান। তথ্যসূত্র: এপি।